


সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: বড় হলঘরে থরে থরে সাজানো নোট। পাশে পড়ে নোট গোনার মেশিন। ঠিক যেন টাঁকশাল। একদিকে ৫০০ টাকার, অন্য প্রান্তে ডাঁই করে রাখা ২০০ ও ১০০ টাকার বান্ডিল। কিন্তু সবই জাল নোট। আর সেই ‘নোট’ কতটা উন্নতমানের, সেটাই বারবার ক্যামেরার সামনে দেখানো হচ্ছে। অর্থাৎ, জাল নোটের বিজ্ঞাপন। এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞাপনী ভিডিওতে মোবাইল নম্বর দিয়ে কারবারিদের প্রকাশ্য ঘোষণা, ফোন করলেই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে যাবে জাল নোটের বান্ডিল! জাল নোটের এহেন খুল্লামখুল্লা কারবারে রীতিমতো চোখ কপালে উঠেছে গোয়েন্দাদের। কারণ ওই পোস্টেই জানানো হয়েছে, এক লক্ষ টাকা দিলে তিন লক্ষ টাকার জাল নোট পাওয়া যাবে। আর কোয়ালিটির সঙ্গে সমঝোতা করলে এক লক্ষ টাকায় মিলবে সাড়ে তিন লক্ষ টাকার জাল নোট।
তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, বিশাল প্যাটেল নাম রেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত কারবারিরা নিজেদের ফোন নম্বর বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে না। তারা অন্যের নথি দিয়ে সিমকার্ড তোলে। তাই গোয়েন্দাদের অনুমান, এই অ্যাকাউন্টটিও বেনামে খোলা হয়েছে। আর তা থেকেই জাল নোটের এই ধরনের বিজ্ঞাপন। এই অ্যাকাউন্টের ফলোয়ারের সংখ্যাও বেশ ভালোই। ওই অ্যাকাউন্টটির লোকেশন ট্র্যাক করে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ভিডিওগুলি গুজরাত থেকে পোস্ট করা হচ্ছে। সেখানেই কোথাও ওই নোটগুলি মজুত করে রাখা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ভিডিওতে পোস্ট করা জাল নোটগুলি উন্নতমানের। এধরনের নোট সাধারণত পাকিস্তানেই তৈরি হয়। কারবারিদের ভাষায়, ‘সুপারফাইন’ নোট। এক আধিকারিক বলেন, বাংলাদেশেও জাল নোট তৈরি হয়। তবে সেগুলির মান এতটা উন্নত হয় না। জাল নোটের মান মূলত নির্ভর করে কাগজের উপর। ওই বিজ্ঞাপনে যে ধরনের নোট দেখানো হচ্ছে, সেই কাগজ দিয়ে পাকিস্তানের কারবারিরা জাল নোট তৈরি করে। তবে তারা আসল নোটের দু’টি বৈশিষ্ট্য নকল করতে পারে না। পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এদেশে জাল নোট ঢোকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। অপারেশন সিন্দুরের পর তারা আরও মরিয়া। যুদ্ধে লেজেগোবরে হয়ে এখন তাদের টার্গেট ভারতের অর্থনীতিতে ধাক্কা দেওয়া।
এই পরিস্থিতিতে বিশাল প্যাটেলের অ্যাকাউন্টটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। জানা গিয়েছে, বেশিরভাগ কারবার গুজরাতেই হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করলে কারবারিরা এই নোটের সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, এর আগে অনলাইনে অস্ত্র কারবারের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জাল নোটের কারবার চালানোর খবর গোয়েন্দাদের কাছে ছিল না। তাই পাচার বন্ধ করতে বিভিন্ন করিডরে নজরদারি শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। বাদ যায়নি এরাজ্যও। বিশেষ করে মালদহের বৈষ্ণবনগর এলাকায় গোয়েন্দারা ওঁত পেতে রয়েছেন। তাঁদের চোখে ধুলো দিতে কারবারিরা নেপাল হয়ে জাল নোট ঢোকাচ্ছে বলে খবর। এই ‘ইনপুট’ আসার পর ওই এলাকাতেও বেড়েছে নিরাপত্তার কড়াকড়ি। কিন্তু বিজ্ঞাপন দিয়ে জাল নোটের কারবার! এমন দুঃসাহস দেখে তাজ্জব দুঁদে গোয়েন্দারাও।