নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ঝলমলে আলোর মাঝে হাসছেন বেলুন-খেলনাওয়ালা। বিক্রি ভালো বলে ফুচকাওয়ালাও খুশি। ঠাকুর দেখার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া মাস্ট! তাই মণ্ডপের বাইরের রাস্তায় দিনভর খাবারের স্টলগুলিও ‘উজ্জ্বল’! এক মণ্ডপ থেকে আর এক মণ্ডপে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ হাতে তুলে নেওয়া ভেঁপু। রাতভর প্যাঁ পোঁ। মুঠোফোনে ছবি তুলতে তুলতে পুজোর মুডে বাঙালি। সবমিলিয়ে পঞ্চমীতে শহর-শহরতলির জনতার ঢল দেখে মনে হল, কলকাতা যেন ‘ওয়াকিং স্ট্রিট’! আর রাস্তায় পাবলিক সামলাতে কালঘাম ছুটল কলকাতা পুলিশের ভলান্টিয়ারদের।
বাগবাজার, কুমোরটুলি পার্ক, হাতিবাগান সর্বজনীন, কাশী বোস লেন, সিকদার বাগান, হাতিবাগান নবীন পল্লি, কিংবা তেলেঙ্গাবাগান, টালা প্রত্যয়ের মণ্ডপে তিল ধারণের জায়গা নেই। সন্ধ্যা বাড়তেই দক্ষিণ কলকাতার মণ্ডপগুলিতেও চেনা ভিড়। চেতলা অগ্রণী, আলিপুর সর্বজনীন, সুরুচি সংঘ পাক মেরে ত্রিধারা, সিংহী পার্ক, বালিগঞ্জ কালচারাল, একডালিয়া—সর্বত্র একছবি। বিধান সরণি থেকে নিউ আলিপুর, সব পুজোমুখী রাস্তার দখল নিয়েছে ভিড়। বহু রাস্তায় গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রিত। বিকাল থেকে অটো বন্ধ। ভরসা কিছুটা বাস, আর দুটো পা। তাই গাড়ির জন্য যত না যানজট, তার থেকে অনেক বেশি কালো মাথার জন্য। খেই হারিয়ে বাসও চলছে থমকে থমকে। কারণ, সিগন্যাল খুললেও রাস্তার মাঝ বরাবর জনস্রোত।
সঙ্গে দেদার কেনাকাটা। শেষ লগ্নের। কারণ, শুক্রবারই যে ষষ্ঠী! গড়িয়াহাট, নিউ মার্কেট কিংবা হাতিবাগান—ছবি একটাই। ফুচকা, চিকেন পকোড়া বা কাবাব খেতে খেতে প্রশ্ন উড়ে আসছে, ‘লেবুতলা পার্ক নাকি পাথুরিয়াঘাটা’? কেউ আবার বলে উঠল, ‘সাউথে রাতে ভিড় বেড়ে যাবে। চল আগে একডালিয়া-চেতলা অগ্রণী, ত্রিধারার দিকটা ঘুরে আসি। পরে উত্তরে ঢুকব।’
রাত যত বেড়েছে, পুজোর আমেজ ততই রঙিন হয়েছে। অনেকেই বলছেন, আলিপুর সর্বজনীনে ‘রামায়ণ’-এর কাজ দেখে মুগ্ধ। হাতিবাগান সর্বজনীনে কলকাতার অবয়বের ‘বিবর্তন’ জাস্ট অনবদ্য। কাশী বোস লেনের থিমও ফাটাফাটি। বাগবাজার সর্বজনীনে এসে গড়িয়ার সঞ্চিতা, মনোজিৎরা বলছেন, ‘বাগবাজার আর একডালিয়ার ঠাকুর না দেখলে পুজোটাই বৃথা!’ দমদম থেকে চেতলা অগ্রণীতে এসেছিলেন কলেজ ছাত্রী পৌষালি, স্বর্ণালীরা। বললেন, ‘এরপর আলিপুর সর্বজনীন। তারপর ত্রিধারা, দেশপ্রিয় পার্ক, একডালিয়া দেখে ট্রেনে সোজা শিয়ালদহ। লেবুতলা পার্ক দেখে ভোরে বাড়ি ফিরব।’ সোনারপুরের বাসিন্দা ঐন্দ্রীলার আবার সারারাত ঘোরার প্ল্যান। ছাতাও রয়েছে সঙ্গে। তাই বৃষ্টি হলেও পরোয়া নেই। ওয়েদার হালকা ঠান্ডা। তাই, হেঁটে ঠাকুর দেখতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না।
প্যান্ডেলের গান-মানুষের কথা-ভেঁপুর শব্দ... ‘ওয়াকিং সিটি’ রাতভর মুখর। নিরাপত্তার কড়াকড়ি রাস্তায় রাস্তায়। পুলিশের লাগাতার ঘোষণা—‘ডান দিক দিয়ে যান,’ ‘বাঁদিক ধরে এগন’। গোটা কলকাতা যেন কার্নিভাল চত্বর! নতুন জামা, চুড়িদার, পাটভাঙা শাড়ি-প্যান্টের রোশনাই। নতুন জুতোয় পায়ে ফোস্কা। ক্লান্ত শরীরেও মন খুশি... আট থেকে আশির। গোল করে কাল-পরশুর ‘কর্মসূচি’ নিয়ে আলোচনায় তরুণ-তরুণীরা। তখন মাইকে, ‘যারা পাচ্ছে ছুটি, আসছে ছুটে... বৃষ্টি হলেও রঙিন ছাতায় ম্যাডক্স মাতায়... হই হই করব বলে...দুগ্গা ঠাকুর আসছে বলে..।’



