সুমন মুখোপাধ্যায়, সিউড়ি: বিজয়া দশমীর পর একাদশী তিথিতে সম্প্রীতির লাঠিমেলায় ভিড় জমান দুবরাজপুরের কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দারা। বর্গী হামলা থেকে বাঁচতে বাড়ি বাড়ি লাঠি রাখার রেওয়াজ শুরু হয়। দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমীর পরই একাদশী তিথিতে সেই লাঠি এখন সম্প্রীতির লাঠি মেলায় পরিণত হয়েছে। লাঠি নিয়ে যেখানে লাঠা-লাঠি শুরু হয়, ঠিক তার উলটো ছবি দেখা যায় দুবরাজপুরের এই কৃষ্ণনগর গ্রামে। মুসলিম সম্প্রদায়ের লাঠি ঠাঁই পায় হিন্দুদের বাড়িতে।
গ্রামবাসীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্গী হামলা থেকে বাঁচতে বীরভূমের কৃষ্ণনগর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে একসময় বাড়ি বাড়ি লাঠি রাখার রেওয়াজ শুরু হয়। শতাব্দীপ্রাচীন সেই রীতি ঘিরেই আজও দুবরাজপুর ব্লকের কৃষ্ণনগর গ্রামে বিজয়া দশমীর পর বসে ঐতিহ্যবাহী লাঠির মেলা। এই মেলা মূলত দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে হয়। তবে লাঠি কেনাবেচাই এই মেলার ঐতিহ্য। যেখানে লাঠি নিয়ে আসেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন। দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে আনেন হিন্দুরা। উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন যেখানে লাঠি কেনেন। মেলা শুরু হয় দুপুর থেকে, চলে রাত্রি পর্যন্ত। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রচুর পুলিশ মোতায়ন করা হয়।
দুবরাজপুর ব্লকের কৃষ্ণনগর গ্রামের একদিনের এই সম্প্রীতির মেলা ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। হিন্দুরা প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনের জন্য হাজির হন কৃষ্ণনগর মেলা প্রাঙ্গণে। মুসলিমরা বিভিন্নরকমের লাঠি নিয়ে হাজির হন এই মেলায়। দুবরাজপুরের যশপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের লাহাগ্রাম, যশপুর, পছিয়াড়া, কান্তোড়, সালুঞ্চি সহ বিভিন্ন গ্রাম এলাকার প্রায় ১০-১২টি দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের জন্য জমায়েত হয় কৃষ্ণনগর মেলা প্রাঙ্গণে। এই বিজয়া দশমী উপলক্ষে সম্প্রীতির মেলায় মানুষের ভিড় উপচে পড়ে। শতাব্দীপ্রাচীন এই লাঠিমেলা বা সম্প্রীতির মেলা পরিচালনা করে যশপুর গ্রাম পঞ্চায়েত।
জানা যায়, কৃষ্ণনগরের এই লাঠির মেলার উৎপত্তি বর্গী হাঙ্গামার উপদ্রব থেকে বাঁচতেই। সেইসময় আত্মরক্ষার জন্য বাড়ি বাড়ি লাঠি রাখার রেওয়াজ ছিল। এই মেলা শুধু লাঠির মেলা নয়, সম্প্রীতির মেলা। যা আজও শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। বর্তমানে সেভাবে লাঠির প্রচলন না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতির মেলা দেখতে এবং লাঠি কিনতে আজও দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটে আসেন। গ্রামের প্রৌঢ়া ক্ষমা চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবছর এই মেলা আয়োজিত হয়। আমাদের বয়স হয়েছে। আগে এই মেলায় দূরদূরান্ত থেকে গ্রামবাসীরা আসতেন। তবে সময়ের সঙ্গে ওই মেলার জৌলুস কমেছে। তবে আজও এলাকার মানুষ এই মেলায় ভিড় জমান। আশা করছি এবছর তার অন্যথা হবে না। বিভিন্ন জায়গা থেকে লাঠি নিয়ে মারামারির খবর আসে। কিন্তু আমাদের এখানে লাঠি মিলিয়ে দেয় হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজনকে। এই মেলা আমাদের এলাকার একটি ঐতিহ্য। যা আজও অব্যাহত রয়েছে।



