শোভন চন্দ, কলকাতা: গয়না পরানো থেকে রংয়ের শেষ আঁচড়। ব্যস্ত পটুয়া। ঢাকি, পুরোহিত, পুজোর জোগাড়, মিষ্টি-ফলের অর্ডার। রীতিমতো ফর্দ ধরে জেরা করে চলেছেন পটলডাঙার বসুমল্লিক বাড়ির প্রবীণ সদস্য। দালানের সিঁড়িতে ভোররাতের শিশিরের জল তখনও লেগে। দূর থেকে ভেসে আসছে শিউলির গন্ধ। এদিক-ওদিক লুকোচুরি খেলছে খুদে সদস্যরা। আর এই হইচই জানান দিচ্ছে, বছর পেরিয়ে আবার বাপের বাড়ি ফিরেছেন উমা। ১৯৬ বছরে তাই বসুমল্লিক পরিবারে সাজো সাজো রব।
১৪৯৩-১৫১৯ সাল। তৎকালীন সময়ে বাংলার অন্যতম সমাজ সংস্কারক গোপীনাথ বসু ছিলেন গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের উজির। সুলতানি দরবার থেকে গোপীনাথ ‘মালিক’ উপাধি লাভ করলেন। কালক্রমে মালিক হল মল্লিক। পরে পরিবারের পদবি দাঁড়ায় বসুমল্লিক। ধীরে ধীরে বাংলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে পরিবার। তাদেরই এক বংশধর হুগলির পাণ্ডুয়ার কাছে কাঁটাগড় গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ১৭৯৪ সালে এই পরিবারের সদস্য রামকুমার বসুমল্লিকের সঙ্গে পটলডাঙার কৃষ্ণরাম আইচের কন্যা শঙ্করীর বিয়ে হয়। তাঁদের পুত্র রাধানাথই পটলডাঙা বসুমল্লিক পরিবারের প্রাণপুরুষ। তিনি ১৮৩১ সালে দুর্গাপুজো শুরু করেন। এছাড়া আরও দুই শরিক মায়ের আরাধনা করেন। তবে বহু ঘটনার সাক্ষী থেকেছে পটলডাঙার বসুমল্লিক বাড়ির মূল পুজো। ১৯০৫ সালের ২৭ অক্টোবর এই বাড়ির ঠাকুর দালানে ছাত্রসভায় বক্তৃতা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিকও ছিলেন এই পরিবারের সন্তান।
কলকাতার বনেদি বাড়িগুলির মধ্যে এটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। পাঁচ খিলান ও দুই দালান বিশিষ্ট ঠাকুরদালানটির স্তম্ভের উপরে বিষ্ণুর দশ অবতারের মূর্তি মুগ্ধ করে। প্রতিমা একচালার। ডাকের সাজে সেজে ওঠেন দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। তাঁদের বেনারসি সিল্কের শাড়ি ও ধুতি পরানো হয়। এখানে সিংহের মুখ ড্রাগনাকৃতির। মহালয়ার পরের দিন শুরু হয় বোধন। তবে কলা বউ স্নানের রীতি একেবারে ভিন্ন। বসুমল্লিক পরিবারের কলা বউ একাধিক তীর্থস্থান থেকে আনা পুণ্যজলে স্নান করেন। পরিবারের তরফে শ্রীকান্ত বসুমল্লিক বলেন, এটাই দীর্ঘদিনের রীতি। সারা বছর ধরে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্র থেকে জল সংগ্রহ করেন। তা দিয়েই কলা বউকে স্নান করানো হয়। পুজোয় দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। পরিবর্তে গোটা ফল, আনাজ, চাল ও মিষ্টি দেওয়া হয়। নিয়ম মেনে সন্ধিপুজোর পাশাপাশি মহানবমীতে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। দশমীর দিন বরণের পর নিরঞ্জনের পালা। বিজয়ার আলো নিভে আসা সন্ধ্যায় শূন্য দালানে আবারও পরের বছরের অপেক্ষায় থাকেন বসুমল্লিকরা। ফাইল চিত্র



