অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: থিম মানে অনেকটা ‘অধরা মাধুরী ধরেছি ছন্দোবন্ধনে’। থিমের অতিমানবীয় উড়ান ছুঁয়ে ফেলতে পারে কল্পনার অন্তিম চরণ। থিমই পারে, বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করাতে। অতীতকে আধুনিক ধারায় সাজিয়ে বাড়ির আঙিনায় এনে ফেলতে পারে থিম। ভিনগ্রহীদের সঙ্গে হাজির করে দিতে পারে পৌরাণিক দুর্গাকে। মণ্ডপসজ্জার মৌলিক উন্মাদনায় ঘরের উমাকে রাজরাজেশ্বরী করে দিতে পারে। যদি মনে হয় এসব নিখাদ কথকতা, তবে সত্যের সন্ধানে যেতে হবে উত্তরপাড়ায়। প্রতিমার অবয়ব থেকে মণ্ডপের গড়নে চোখ রাখলেই থিমের জাদু কোন মায়া ছড়াতে পারে, চাক্ষুষ করা যাবে। সাধারণ কিভাবে অসামান্য হয়ে উঠতে পারে, তারই প্রতিযোগিতা এবার উত্তরপাড়ার অলি-গলি থেকে রাজপথে।
উত্তরপাড়ার ভদ্রকালী বলাকায় পুজো শুরু হয়েছিল শতবর্ষ আগে। রাজা-জমিদারদের প্রভাবে আচ্ছন্ন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা সেই পুজো এবার ১১২বছরে পা রেখেছে। গগনচুম্বী সেই ঐতিহ্যের কারণেই কি না কে জানে, ভদ্রকালী বলাকা এবার গগনবিহারে নিয়ে যেতে উদ্যোগ নিয়েছে দর্শকদের। উদ্যোক্তাদের ভাষায়, ‘মহাকাশে মহাবোধন। থিমপুজো মানে বিপুল স্বাধীনতার হাতছানি, তার সুচারু প্রয়োগ এই মণ্ডপে দেখা যাবে। দেবীকে এখানে ভিনগ্রহী বা এলিয়েনদের সঙ্গে দেখতে পাবেন দর্শকরা। এমনিতে মৃন্ময়ী দেবী সপরিবারে মণ্ডপে হাজির থাকবেন। কিন্তু অবস্থান হবে মহাশূন্যে। এলিয়েনরাই যে শুধু দেবীর পাশে শোভা পাবে, তা নয়। থাকবে নভোচারীরাও। থাকবে গ্রহনক্ষত্র মিলিয়ে এক আকাশকুসুম কল্পনার বাস্তব চিত্র। চাঁদের মাটিতে মানুষের পদচারণাও প্রত্যক্ষ করা যাবে।’ যান্ত্রিক কৌশলে গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণায়মান চেহারাও দেখাতে কোমর কষছেন উদ্যোক্তারা। উদ্যোক্তা সৌমেন ঘোষ বলছেন, ‘মণ্ডপে এলে দর্শকদের ভাবতে হবে, কী ছেড়ে কী দেখি। পুরো মণ্ডপসজ্জা থিমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে গড়ে তোলা হচ্ছে। আর থাকবে বিশেষ আলোর ঝলক।’
উত্তরপাড়ায় যেমন কল্পনার বিপুল উড়ান আছে, তেমনই আছে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ ভাব জাগানোর অবকাশ। ভদ্রকালীর চূড়ান্ত কাল্পনিক জগৎ থেকে বেরিয়ে গ্রিন গার্ডেনে এলে দেখা যাবে অতীতের মনোহরণ ছবি। এক কাল্পনিক রাজপ্রাসাদ এখানে দর্শকদের জন্য মোরাম বিছিয়ে অপেক্ষা করবে। ঝাড়বাতির রোশনাই চোখ ধাঁধিয়ে অভ্যর্থনা জানাবে। সাবেক রাজপরিবারের পুজোর চেকনাই পরতে পরতে প্রজাপতির মতো পাখা মেলে ধরবে। সাবেক রাজবাড়ির পুজোর আদল গড়া হলেও দেবীর গড়ন কিছুটা আধুনিক। তবে পুরোদস্তুর সাবেকিয়ানা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না। তাই বাঙালির উমা, বাঙালিরই পুজো মরশুমের প্রথাগত সাজে সাজবেন। লাল পাড় সাদা শাড়ি। পুজো উদ্যোক্তা দীপ্তদীপ ঘোষ বলেন, ‘সাবেক জৌলুস, আধুনিক মায়ার এক বিরল মেলবন্ধন আমাদের মণ্ডপে দেখা যাবে। সঙ্গে থাকবে আলোর বিশেষ আকর্ষণ।’ থিমের বর্ণময়তা কীভাবে ভেঙে দিতে পারে যাবতীয় সীমারেখা, উত্তরপাড়া যেন তারই উত্তর সাজিয়ে বসেছে এবার। ইতিমধ্যে আলোর ঝলক রাতের আকাশকে উদ্ভাসিত করতে শুরু করেছে। ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাঙালির মহোৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে। উত্তরপাড়া ভদ্রকালী বলাকার মাতৃপ্রতিমা। নিজস্ব চিত্র



