সম্প্রীতির শপথের উৎসব
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রং বদলে যাচ্ছে আকাশের। কখনো নীলের উজ্জ্বলতা, কখনো-বা খেয়ালি মেঘ এমনকি বৃষ্টির ছায়া। শরতের চেনা আকাশ যেন প্রকৃতির নিজস্ব লুকোচুরি খেলায় ভীষণ মেতেছে। অথচ সেই অনিশ্চিত আবহাওয়াকে তুচ্ছ করে পথে নেমেছে উৎসবপ্রিয় মানুষের ঢল। কোথাও প্যান্ডেলের সামনে দীর্ঘ সারি, কোথাও আলোর মায়াবি বিন্যাসে মুগ্ধ দর্শনার্থীদের ভিড়, কোথাও ঢাকের বাদ্যে উচ্ছ্বসিত জনতা। আজ মহাসপ্তমী। বাঙালির শ্রেষ্ঠ সামাজিক উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে কলকাতা থেকে জেলা, শহর থেকে গ্রাম—সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ যেন এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বারোয়ারি পুজোর বিপুল আয়োজনের পাশাপাশি পারিবারিক পুজোর ঐতিহ্যও আপন মহিমায় উজ্জ্বল। পুজোর আনন্দে মিশেছে আবেগ, স্মৃতি, শিল্পবোধ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সংযোগ। দুর্গাপুজো নিছক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়। বাঙালির সামাজিক জীবনে এই উৎসবের ব্যাপ্তি অনেক বড়ো। মণ্ডপের শিল্পকর্ম, প্রতিমার নির্মাণশৈলী, আলোকসজ্জা, ঢাকের আওয়াজ, নতুন পোশাকের আনন্দ কিংবা পাড়ার আড্ডা—সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিসর। এখানে ধর্মবিশ্বাসের পাশাপাশি জায়গা করে নেয় শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক আদানপ্রদান। পুজো অসংখ্য মানুষের জীবিকারও সন্ধান দিয়ে চলেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৃৎশিল্পী, আলোকশিল্পী, কারিগর, হকার, পরিবহণকর্মী থেকে শুরু করে বিচিত্র পেশার মানুষ এই দিনগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। অর্থাৎ উৎসবের আনন্দ আর জীবিকা হাত ধরাধরি করে থাকে এই সময়। সেই আনন্দ যেন সবার কাছে পৌঁছায়, তার দায়িত্ব সমাজেরই।

Advertisement

এই উৎসবের সবচেয়ে বড়ো শক্তি তার সর্বজনীনতা। ধর্মীয় পরিচয়, ভাষার ভিন্নতা, সামাজিক অবস্থানের ব্যবধান কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পার্থক্য—পুজোর আনন্দে, বহু ক্ষেত্রেই সেগুলি অতিক্রম করে পরস্পরের কাছে চলে আসে মানুষ। একজন প্রতিমা দেখতে আসেন শিল্পের টানে, অন্যজন পারিবারিক ঐতিহ্যের আকর্ষণে, কেউ-বা কেবল উৎসবের ভিড়ে মানুষের মুখ দেখতে। এই বৈচিত্রই বাংলার সামাজিক সংস্কৃতির প্রাণ। তাই দুর্গাপুজোর প্রকৃত সার্থকতা শুধু কতগুলি মণ্ডপ তৈরি হল, কতটা আলো জ্বলল কিংবা কত মানুষ ঠাকুর দেখলেন, তার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উৎসব কতটা মানুষের, কতটা উদার এবং কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্নগুলি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জনসমাগম যত বাড়ে, দায়িত্বও বেড়ে যায় তত। বৃষ্টি, যানজট, ভিড়ের চাপ, অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়া দর্শনার্থীদের কাছে দ্রুত সাহায্য পৌঁছে দেওয়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাই সতর্কতা ও প্রস্তুতি। এজন্য প্রশাসন, পুলিশ, পুজোর উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষকে পরস্পরের সহযোগী হতে হবে। আনন্দে গা ভাসিয়েও নিয়ম মেনে চলা, জরুরি পথ খোলা রাখা, শিশু ও প্রবীণদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া এবং গুজব এড়িয়ে চলা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, আনন্দের মুহূর্তে অসতর্কতার সামান্য ফাঁকও বড়ো বিপদের কারণ হতে পারে। উৎসবের সাফল্য তাই শেষপর্যন্ত নির্ভর করে সকলের সম্মিলিত সচেতনতার উপর।
এই প্রেক্ষিতেই পড়শি বাংলাদেশের দিকেও তাকানো জরুরি। ভৌগোলিক সীমান্ত দুই বাংলাকে আলাদা করলেও ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং বহু ঐতিহাসিক স্মৃতি তাদের গভীরভাবে যুক্ত রেখেছে। বাংলাদেশেও দুর্গাপুজো বহু মানুষের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ওপার বাংলায় সনাতনী হিন্দুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তাঁরাও যাতে নির্ভয়ে, সমমর্যাদায় এবং নির্বিঘ্নে পুজো উদ্‌যাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। নিরাপত্তা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্প্রীতি কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি কারও অনুগ্রহ নয়, এগুলি নাগরিক অধিকারের অপরিহার্য শর্ত। পশ্চিমবঙ্গের উৎসবমুখর পরিবেশও তখনই অর্থবহ হবে, যখন সীমান্তের ওপারেও মানুষের ধর্মাচরণের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সমান গুরুত্ব পাবে। উৎসবের আলো মণ্ডপের চৌহদ্দিতে আটকে থাকা যথেষ্ট নয়, তা মানুষের মনেও পৌঁছে যাওয়া জরুরি। বিদ্বেষের অন্ধকার, বিভাজনের রাজনীতি এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সম্প্রীতিই হোক আমাদের সবচেয়ে বড়ো প্রতিরোধ। মহাসপ্তমীর এই শুভক্ষণে কামনা, মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি পেরিয়ে আনন্দের স্রোত বইতে থাকুক উভয় বাংলার পথে পথে, সারা দুনিয়ায় যেখানে যত বাঙালি ও উৎসবপ্রিয় মানুষ আছেন তাঁদের মনজুড়ে। এপারে কলকাতা থেকে সুন্দরবন, পাহাড় থেকে সমতল, সৈকতনগরী—সর্বত্রই পুজো কাটুক শান্তিতে, নিরাপদে, সৌহার্দে। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহি, পাবনা, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, সিলেটসহ সমগ্র বাংলাদেশও একই দৃষ্টান্ত রক্ষায় সফল হোক। প্রতিমার সামনে প্রার্থনার পাশাপাশি মানুষের প্রতি মানুষের দায় স্বীকার করাই হোক এই উৎসবের শ্রেষ্ঠ অঞ্জলি।