তন্ময় সাহা, কলকাতা: উত্তর কলকাতা মানে ব্রিটিশ আমলের একের পর এক দালান কোঠা। খিলান, বারান্দা, রোয়াক। কয়েকটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। কয়েকটি কালের নিয়মে ভগ্নপ্রায়। তাদের গায়ে ঝুলছে পুরসভার ‘বিপজ্জনক বাড়ি’ লেখা বোর্ড। সেই বাড়িগুলির আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের বাস। গলি-তস্য গলির জটিল আবর্তে দু’টি পাশাপাশি বসবাস করে। আর আছে তারের জঙ্গল। একইসঙ্গে সগর্বে মাথা তুলেছে হাল আমলের ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটবাড়ি। সবমিলিয়ে শহরের আধুনিক ও প্রাচীনতার বিশাল কোলাজ। তবে সেই ছবিতে যেন কোথাও যেন ছন্দের অভাব। কোথাও যেন অপরিকল্পনা দানা বেধেছে। শহর পুরনোকে ভেঙে গড়ছে নতুন হয়ে, কিন্তু তা অপরিকল্পিত। এই ভাবনাটাই এবার পুজো মণ্ডপে তুলে ধরছে উত্তর কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পুজো হাতিবাগান সর্বজনীন। এবছর তাদের থিম ‘ছন্দছাড়া ছন্নছাড়া’। শিল্পী রবীন রায় জানিয়েছেন, কাঠ, প্লাইউড সহ বিভিন্ন জিনিস দিয়ে পুজো মণ্ডপ সাজিয়ে তোলা হচ্ছে, তেমনই পাড়ার বেশ কয়েকটি বাড়িও মণ্ডপের অংশ। সবমিলিয়ে উৎসবের শহরে তিলোত্তমাকে নতুনভাবে দেখানোর ভাবনা ভেবেছেন হাতিবাগান সর্বজনীনের কর্মকর্তারা।
হাতিবাগান থেকে কিছুটা দূরে লালাবাগান। সেখানকার নবাঙ্কুর সংঘের এবারের থিম ‘শিকড়’। উত্তর কলকাতার বিখ্যাত হরিদাস সাহার হাটকে (লোকমুখে হরিসার হাট) কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে তাঁদের মণ্ডপ। শিল্পী সুশোভন রায়ের কথায়, ১৯৪১ সালের কলকাতা থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়েছে হরি দাস সাহা হাট। সময়ের নিয়মে অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু এই হাট আজও বহু মানুষের জীবিকা, পরিশ্রম ও স্বপ্নকে সযত্নে লালন করে চলেছে। থিমে ‘শিকড়’ বলতে শুধু একটি পুরনো বাজারকে বোঝানো হবে না, বোঝানো হবে সেই মানুষগুলিকে, যাঁদের ঘাম ও পরিশ্রমের উপর দাঁড়িয়ে একটি বাজার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে আছে। একজন ব্যবসায়ী তাঁর দোকান বা পসরা নিয়ে শুরু করেন, পরের প্রজন্ম সেটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। আজকের এই কলকাতার শিকড় খোঁজারই চেষ্টা করেছি এই থিমের মধ্য দিয়ে। সবমিলিয়ে পুরনো কলকাতার পরিবেশ, ১৯৪১ সালের বাজার, কাপড়ের গাঁটরি, ব্যবসায়ী, ক্রেতা, রাতের ব্যস্ততা, সবই ফুটিয়ে তুলছি আমরা।
কলকাতা কল্লোলিনী। চারিদিকে হাজারো শব্দ। ব্যস্ততা। কর্মচঞ্চলতা। এ সব থেকে বেরিয়ে বনলতা সেনের মতো কয়েক মুহূর্ত শান্তিতে কাটানোর সুযোগ করে দেবে চোরবাগান সর্বজনীন। এবছর তাদের থিম ‘অ-রব’। যার অর্থ, নৈঃশব্দ। মণ্ডপের ভিতরে ঢুকলে দেখা মিলবে বৃত্তাকার পথের। লোহার জালে বন্দি সেই পথ পেরিয়ে পৌঁছতে হবে দুর্গার কাছে। সে অনুভব প্রশান্তির, আধ্যাত্মিকতার মতো অনেকটা। যা শব্দাতীত। শিল্পী সুশান্ত শিবানী পালের ভাবনায় তৈরি দেবী প্রতিমা অনুপম। অস্ত্রের বদলে উমার হাতে রয়েছে শুধু পদ্ম। যা আধ্যাত্মিক উত্তরণের প্রতীক হিসাবে রাখা হয়েছে।



