সংবাদদাতা, জঙ্গিপুর: স্যালাইন দেওয়ার পরেই একে একে রোগীদের শরীরে দেখা দিল তীব্র পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। শুরু হল ঝটপটানি, বুক ধড়ফড় এবং প্রবল শ্বাসকষ্ট। বুধবার রাতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতাল চত্বর। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রোগীরা ও তাঁদের আত্মীয়রা। অভিযোগ, চিকিৎসকদের বারবার ডেকেও সাড়া মেলেনি। উল্টে তাঁরা রোগীর আত্মীয়দের উল্টোপাল্টা কথা বলেন। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও, হাসপাতালের এই গাফিলতিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনার স্মৃতি উস্কে দিয়ে ফের একবার সরকারি হাসপাতালের স্যালাইন ও ওষুধের গুণমান নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।
এ প্রসঙ্গে জানতে সিএমওএইচ সন্দীপ সান্যালকে ফোন করা তিনি ফোন ধরেননি। এসিএমওএইচ তারিফ হোসেন বলেন, মহকুমা হাসপাতাল আমার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তাই এবিষয়ে কিছু বলতে পারব না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাতে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্তত ৩০ জন রোগীর স্যালাইন চলাকালীন হঠাৎই শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। রোগীদের আত্মীয়দের দাবি, স্যালাইনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ইনজেকশন প্রয়োগ করার পর থেকেই রোগীরা মারাত্মকভাবে ছটফট করতে শুরু করেন। তীব্র শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি অনেকেরই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে এবং বুক ধড়ফড়ানি শুরু হয়। উত্তেজিত পরিজনদের অভিযোগ, রোগীদের এই অবস্থার কথা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জানানো হলেও প্রথমে তাঁরা বিষয়টিকে আমল দিতে চাননি। উল্টে রোগীর আত্মীয়দের তাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ। যদিও ক্ষোভ বাড়তে থাকায় চিকিৎসকরা রোগীদের পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ দেন। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রসঙ্গে হাসপাতাল সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
তবে হাসপাতালের এক জেনারেল ফিজিশিয়ান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর দাবি, স্যালাইনের কোনো সমস্যার কারণেই রোগীদের শরীরে এই ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। রোগীদের শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়েছিল। তবে বর্তমানে তাঁরা সকলেই স্থিতিশীল এবং সুস্থ রয়েছেন। বেশ কয়েকজন রোগীকে ইতিমধ্যে হাসপাতাল থেকে ছুটিও দেওয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে, আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ওই ব্যাচের সমস্ত স্যালাইন দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং রোগীদের বিকল্প স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার রাতের এই ঘটনা স্বাস্থ্যদপ্তরের কপালের ভাঁজ চওড়া করেছে। কারণ, সরকারি হাসপাতালের স্যালাইন বা ওষুধের মান নিয়ে এমন বিতর্ক এই প্রথম নয়। গত বছরের শুরুতেই মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একই দিনে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর পাঁচ প্রসূতি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে মামনি রুইদাস (২২) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু পর্যন্ত হয়। বাকিদের ভেন্টিলেশন ও আইসিইউ-তে রেখে কোনোমতে প্রাণে বাঁচানো গিয়েছিল।
সেই সময়েও কাঠগড়ায় ছিল হাসপাতালের স্যালাইন। ঘটনার জল গড়ায় ড্রাগ কন্ট্রোল বিভাগ পর্যন্ত। মেদিনীপুরের সেই ঘটনার পর এবার জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালের এই ঘটনা নতুন করে ওষুধের গুণমান নির্ধারণকারী পরিকাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। প্রশ্ন উঠছে, বারবার কেন সরকারি হাসপাতালের ওষুধ বা স্যালাইনে রোগীদের জীবন সংকটে হবে? রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তর এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ করে, এখন সেটাই দেখার।