রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: দীর্ঘ ২৫ বছরেও বিচার পেলেন না বেনাচাপড়া হত্যাকাণ্ডে নিহতদের পরিবার। ৩৪ বছরের নিরবচ্ছিন্ন বাম শাসনের অবসান ঘটাতে এই ঘটনাকে বড় ইস্যু বানিয়েছিল তৃণমূল। ক্ষমতায় এসে টানা ১৫ বছর শাসন করেছে তারা। নিহতদের পরিবারের লোকেরা আশায় ছিলেন এবার হয়তো বিচার মিলবে। কিন্তু, সেই আশা পূরণ হয়নি। তৃণমূল জমানারও অবসান হয়েছে। বিচার না পেয়ে এখন হতাশ নিহতদের পরিবার। মঙ্গলবার, ২৫ বছরে পা দিল পশ্চিম মেদিনীপুরের উত্তাল সময়ের হাড়হিম করা এই ঘটনা। এদিন হারানো স্বজনদের স্মৃতি তর্পণে আগাছা ভর্তি বেদিতে মালা দিয়ে স্বান্তনা খুঁজলেন শ্যামল আচার্যরা। পাশে নেই কোনো রাজনৈতিক দলই।
বাম জমানায় কেশপুর আর সন্ত্রাস সমার্থক ছিল। সিপিএম নেতাদের ভয়ে বহু পরিবার ঘরছাড়া ছিলেন। কেশপুর ব্লকের শীর্ষা সহ দু’টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা গড়বেতা পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেন্দ্রটি তৎকালীন সিপিএম নেতা সুশান্ত ঘোষের গড় হিসেবে পরিচিত ছিল। তৃণমূলের সঙ্গে কেউ যুক্ত হলেই হুমকির মুখে পড়তে হতো। ২০০২ সালে প্রশাসনের উদ্যোগে ঘরছাড়া তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা বাড়ি ফিরতে শুরু করেছিলেন। নিহত পরিবারের সদস্যদের দাবি, সেই সময় আমনপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পিয়াশালা এলাকায় গোবিন্দ মাঝির বাড়িতে কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছিলেন। খবর পৌঁছে যায় সিপিএম নেতৃত্বের কাছে। তারপরেই বাড়ি ঘিরে হামলা। দিনটি ছিল ২২ সেপ্টেম্বর। হার্মাদদের এলোপাথাড়ি গুলিতে ৯ জন তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু হয়। অভিযোগ, তাঁদের মধ্যে ৭ জনের দেহ সরিয়ে নিয়ে গিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। দেহ বস্তায় ভরে তার মধ্যে নুন দেওয়া হয়েছিল বলেও পরিবারের সদস্যদের দাবি। দীর্ঘদিন ধরে সাতজনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। বাকি দু’জনের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। নিখোঁজদের পরিবারের তরফে অভিযোগ জানানো হলেও কাজের কাজ হয়নি। তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে প্রশাসনের ভূমিকা।
রাজ্যে পরিবর্তন আসে ২০১১ সালে। বেনাচাপড়া হত্যাকাণ্ডের ফাইল খোলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। স্থানীয় তৃণমূল কর্মী শ্যামল আচার্য তাঁর বাবা অজয় আচার্য সহ নিখোঁজদের সন্ধান পেতে পুলিশের দ্বারস্থ হন। প্রথমে রাজ্য পুলিশ এবং পরে সিআইডি তদন্তে নামে। ২০১১ সালের ৫ জুন বেনাচাপড়া এলাকায় মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হয় বেশকিছু হাড়গোড়। সামনে আসে সুশান্ত ঘোষের নাম। ওই বছর ১১ আগস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনি জামিন পেয়ে যান। ২০২০ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরে তাঁর প্রবেশের উপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও উঠে যায়। মামলায় চার্জশিট জমা পড়ে। আইনি প্রক্রিয়া চললেও পরিবারের বিচার পাওয়ার অপেক্ষার অবসান হয়নি।
শ্যামলবাবু ফোনে বলছিলেন, ‘আজও সে দিনের ঘটনা চোখের সামনে ভাসে। বাবার কথা খুব মনে পড়ে। আজ শহীদ বেদিতে মাল্যদান করেছি। আমাদের একটাই প্রশ্ন—প্রকৃত দোষীরা কবে শাস্তি পাবে? তৎকালীন দাপুটে তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিভিন্নভাবে সহযোগিতাও করেছিলেন। দীর্ঘদিন ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। এখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী। আশাকরি, উনি এবার পাশে থাকবেন।’ মমতাপন্থী তৃণমূল নেতা মহম্মদ রফিক বলেন, ‘আমরা বরাবরই শহিদ পরিবারগুলির পাশে রয়েছি।’
কি বলছেন মূল অভিযুক্ত সুশান্ত ঘোষ? এদিন তিনি বলছিলেন, ‘কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনার ১৫ বছর হল। ২০০২ সালেও অভিযোগ হয়েছিল। সেই অভিযোগে আমার নাম ছিল না। ২০১০ সালে মেদিনীপুর আদালত অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস করে। ২০১১ সালে নতুন করে কেস করা হয়। এখনও চার্জফ্রেম গঠন হয়নি। যারা রাজনীতি করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল, আজ সেই দলটাই মুছে গিয়েছে।’