Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / এই মুহূর্তে

প্রহসনের নির্বাচন কাম্য নয়

মহারাষ্ট্র এবং দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটপণ্ডিতদের কেউই বিজেপিকে নিয়ে কোনোভাবেই আশাবাদী ছিলেন না।

প্রহসনের নির্বাচন কাম্য নয়
  • ১৭ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মহারাষ্ট্র এবং দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটপণ্ডিতদের কেউই বিজেপিকে নিয়ে কোনোভাবেই আশাবাদী ছিলেন না। পূর্ববর্তী লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল, কেন্দ্র-বিরোধী একের পর এক আন্দোলনের ঢেউ এবং বিজেপি-এনডিএ’র ক্ষয়িষ্ণু সংগঠন ছিল এই নেতিবাচক অনুমানের নেপথ্যে। কিন্তু ওই দুই নির্বাচনী ফলাফলে উল্টে গেল যাবতীয় অনুমান! তা সম্ভব হল কীভাবে? গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিরোধীরা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সন্দেহের তির আবর্তিত হচ্ছে দুটি রহস্যকে কেন্দ্র করে। সেটা হল—সংশ্লিষ্ট স্থানে ভোটার সংখ্যা এক ধাক্কায় অস্বাভাবিক বেড়ে গেল কোন জাদুতে? এছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর প্রদত্ত ভোটের যে হার জানানো হয়েছিল, সেটাই মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে উল্লম্ফন দিল কেন? দিল্লির ভোটের রেজাল্ট প্রকাশের অব্যবহিত পরেই সামনে এসেছে ডুপ্লিকেট ভোটার কার্ডের মাদারি কা খেল! গেরুয়া শিবিরের জন্য পশ্চিমবঙ্গ হল বরাবরের ‘টাফ’ ময়দান। এই ময়দানে একটিবার জয় হাসিল করাই মোদি-শাহদের স্বপ্ন। সেই চেষ্টা তাঁরা করছেন একদশক ধরেই। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি থেকে যোগী আদিত্যনাথ পর্যন্ত তাবড় গেরুয়া নেতৃত্ব ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’ করেছেন কলকাতায়। কিন্তু চলিত বাংলায় যাকে বলে ‘খাপ খোলা’ সেটা আর হয়ে ওঠেনি। এমনকী ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনেও মোদিবাবুদের প্রতি যার পর নাই বিমুখ হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার ভোটাররা। 

Advertisement

পরবর্তী রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আর একবছরও বাকি নেই। তাই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে ২০২৬-এর ভোটে ‘শেষ কামড়’ দেওয়ার জন্যই মরিয়া হবে বিজেপি। কিন্তু বঙ্গবিজয়ের জন্য যে ধরনের মজবুত সংগঠন জরুরি, এখানে বিজেপির শক্তি তার ধারেকাছেও নয়। বিজেপি এখানে বিরোধী শক্তি হলেও কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে তাদের টানা তিন দফার সরকার চলছে। তাই কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলার মানুষের বহুবিধ কল্যাণ করার বিস্তর সুযোগ তাদের হাতে ছিল। বাংলার মানুষেরও সেই প্রত্যাশা ছিল মোদিজির কাছে। মোদি সরকারের বাংলার প্রতি বিন্দুমাত্র দরদ থাকলে তাকে হাতিয়ার করেই বঙ্গ বিজেপি বাংলার মানুষের মন জয় করতে পারত। বাংলার উন্নয়ন নিয়ে রাজ্য এবং কেন্দ্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে, এটাই তো কাম্য। কিন্তু দিনের শেষে বাংলার মানুষ বিজেপিকে পেল একেবারে বিপরীত ভূমিকায়। কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাকে লাগাতার বঞ্চনা করে চলেছে। অন্যদিকে বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব তা দেখে হাততালি দিচ্ছেন এবং বাংলার মানুষের যন্ত্রণা বৃদ্ধির জন্যও জোগাচ্ছেন নির্মম ইন্ধন। ওইসঙ্গে জারি রয়েছে রকমারি বিভাজনের রাজনীতি। তাই রহস্য দানা বেঁধেছিল, তাহলে কোন অস্ত্রে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘায়েল করার খোয়াব দেখে বিজেপি? এই সন্দেহ পেকে উঠতেই সামনে এল, ডুপ্লিকেট ভোটার কার্ড কাণ্ড। দেখা যাচ্ছে, বাংলার বহু এপিক নম্বরের ডুপ্লিকেট কার্ড রয়েছে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা প্রভৃতি ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্যে! কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের নামেও জাল এপিক আবিষ্কৃত হয়েছে এরাজ্যের একাধিক জেলায়। অর্থাৎ এখানে নানা দিক থেকে জাল ভোটার অনুপ্রবেশ করাবার আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেই রাজ্যের শাসক দলের সন্দেহ। 
এসব কাণ্ড ফাঁস হতেই বিরোধীদের সুরে সরাসরি ইসিআইয়ের দিকে তোপ দাগলেন প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা। এই অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলেও মানেন তিনি। তিনি এই ঘটনার পরিষ্কার জবাবও চান। এই সমস্যার সমাধানে আধার-ভোটার লিঙ্কেরও পক্ষে লাভাসা। তিনি আরও বলেন, ‘দেশের ভোটার সংখ্যা ৯৮ কোটি। যাবতীয় অস্বচ্ছতা কাটিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কীভাবে সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত করা সম্ভব, তা ঠিক করতে হবে কমিশনকেই।’ বিষয়টি শুধু প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের ব্যাপার নয়। প্রতিটি সচেতন দায়িত্বশীল নাগরিকেরও প্রশ্ন, ভোটার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে কোন জাদুতে? ইভিএমের অপব্যবহার নিয়েও চিন্তিত তাঁরা। এই সংক্রান্ত প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত পর্যালোচনা এবং সেইমতো পদক্ষেপ জরুরি। এসব কোনও রাজনৈতিক আকচাআকচির বিষয় নয়। গণতন্ত্রের মান রক্ষার স্বার্থেই এটা জরুরি। যেমন তেমন ভাবে ভোট করাটাই গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য নয়। মানুষের জন্য মানুষের স্বার্থে মানুষের তৈরি সরকারই গণতন্ত্রের উপহার। স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্বাচন ছাড়া তা পাওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনে অস্বচ্ছতা আর প্রহসন সমার্থক। নির্বাচনী প্রহসন বন্ধ না-হলে ভারতীয় গণতন্ত্র ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’র ঊর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থ হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ