


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি ও মালদহ: প্রায় ছ’মাস দেশান্তর। দীর্ঘ টানাপোড়েন, মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করে শুক্রবার দেশে ফিরলেন বাংলাদেশে পুশব্যাক হওয়া সন্তানসম্ভবা সোনালি বিবি ও তাঁর আট বছরের সন্তান সাবির। এদিন সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ মালদহের মহদিপুর সীমান্তে তাঁদের দু’জনকে বিএসএফের হাতে তুলে দেয় বিজিবি। সেখানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দু’জনকে নিয়ে যাওয়া হয় মালদহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সন্ধ্যাতেই মহদিপুরে পৌঁছে যান জেলা পরিষদের সভাধিপতি লিপিকা ঘোষ বর্মন, ইংলিশবাজার থানার আইসি সহ মালদহ জেলা পুলিশের ডিএসপি পদমর্যাদার এক আধিকারিক।
মোট ছ’জনকে পাঠানোর কথা থাকলেও এদিন মাত্র দু’জনকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন লিপিকা। সভাধিপতির দাবি, ডেপুটি হাই কমিশনারের কাছে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও সদুত্তর দিতে পারেননি।
বীরভূমের প্রত্যন্ত জনপদ পাইকরের দর্জিপাড়া থেকে সোনালিরা দিল্লি পাড়ি দিয়ে ভাংরি কেনাবেচা করে কোনওভাবে পেট চালাচ্ছিলেন। বাংলাদেশি সন্দেহে গত ১৮ জুন সোনালি, তাঁর স্বামী দানিশ শেখ ও আট বছরের সন্তান ছাড়াও সুইটি বিবি ও তাঁর দুই সন্তানকে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ তাঁদের হেনস্তা করার অভিযোগও ওঠে সেই সময়। তবে, সেসব অস্বীকার করে ২৬ জুন ‘পুশব্যাক’ করে দেওয়া হয়েছিল সোনালিদের। পরে এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছিল মোদি সরকার। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, সোনালির বাবা বীরভূমের বাসিন্দা ভাদু শেখের ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই, তাহলে তাঁর সন্তান কীভাবে বাংলাদেশি হন।
গত জুনে সোনালিদের যখন ‘পুশব্যাক’ করা হয়, তখন তিনি আড়াই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অসম সীমান্তের কুড়িগ্রাম থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল সোনালিদের। গভীর রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় জঙ্গলের মধ্যে। পরবর্তী দু’মাস শুধু পালিয়ে বেড়ানো। ধরা পড়ার ভয়ে এদিক ওদিক লুকিয়ে থাকা। বাংলাদেশে ভিক্ষা করে চেয়েচিন্তে খাওয়াদাওয়া করতে হত সোনালিদের। সবদিন তিনবেলা খাবারও জুটত না। একবার ভারতে ঢোকার চেষ্টাও করেছিলেন সোনালিরা। জুটেছিল বেধড়ক মার। গত ২০ আগস্ট সোনালিরা ধরা পড়েন বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানার পুলিশের হাতে। সেখান থেকে জেলে।
সোনালিকে আইনি সহায়তা করতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন তাঁদের প্রতিবেশী যুবক মফিজুল ইসলাম। শুক্রবার সোনালি যখন বাংলাদেশ থেকে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সেই সময় গ্রামের বাড়িতে তাঁর মাকে সঙ্গে নিয়ে ভিডিও কলে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন তিনি। মেয়েকে দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি জ্যোৎস্না বিবি। কয়েক মিনিট শুধু কেঁদেই চলেন। সোনালি জানান, যে কোনও মুহূর্তে ভূমিষ্ঠ হতে পারে তাঁর সন্তান। তিনি চান, সন্তান পৃথিবীর আলো দেখুক ভারতেই।
মফিজুল বলছিলেন, ১ ডিসেম্বর সোনালি সহ ছ’জন জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ডাক্তার দেখাই। একাধিক পরীক্ষা করার পর তিনি বলেন, সোনালির ইউরিনে ইনফেকশন হয়েছে। শরীরে রক্তের ঘাটতির সঙ্গে রয়েছে অপুষ্টিও। মফিজুলের অভিযোগ, সব বন্দোবস্ত করে এলেও বাংলাদেশের জেলে দু’বেলা ভালো খাবার দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর জামিন মেলে গত ১ ডিসেম্বর।