


রবীন রায়, আলিপুরদুয়ার: সমতলে ও ভুটান পাহাড়ে অতি বৃষ্টির জেরে বিপর্যস্ত অবস্থা জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের। তোর্সা, হলং, শিসামারা ও বুড়ি তোর্সার জলে ২১৬.৫১ বর্গকিমি আয়তনের জলদাপাড়ার বন্যপ্রাণীদের তৃণভূমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। তোর্সার জলের স্রোতে গন্ডার, বাইসন, চিতাবাঘ ও হরিণ ভেসে গিয়েছে। এরমধ্যে দু’টি গন্ডার নদী থেকে কোনওভাবে ডাঙায় উঠে প্রাণ বাঁচিয়েছে। এই প্লাবনের কারণে জাতীয় উদ্যানে হাতি ও জিপসি সাফারি আপাতত বন্ধ রেখেছে বনদপ্তর। এদিকে, গোরুমারা উদ্যানের দু’টি গন্ডার জলঢাকা নদীতে ভেসে গিয়েছিল। তার মধ্যে একটি গন্ডারের মৃত্যু হয়েছে। জলদাপাড়ার বন্যপ্রাণীদের এই দুর্দশায় উদ্বিগ্ন রাজ্যের বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদাও।
রবিবার কলকাতা থেকে টেলিফোনে বনমন্ত্রী বলেন, তোর্সার জলস্ফীতির জেরে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের বন্যপ্রাণীদের দুর্দশায় আমরা উদ্বিগ্ন। গোটা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। জলদাপাড়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও দফায় দফায় কথা হচ্ছে। প্রয়োজনে দপ্তরের শীর্ষ কর্তাদের জলদাপাড়ায় পাঠানো হবে।
জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের ভিতরে দিয়ে গিয়েছে তোর্সা, বুড়ি তোর্সা, শিসামারা ও হলং নদী। এই নদীগুলিই সারা বছর ধরে বন্যপ্রাণীদের জলের চাহিদা মেটায়। গত ২৪ ঘণ্টায় সমতলে ও ভুটান পাহাড়ে একটানা ভারী বৃষ্টি হওয়ায় নদীগুলির জলস্ফীতিতে জলদাপাড়ার সাতটি রেঞ্জ এলাকা প্লাবিত হয়। জলের তলায় চলে যায় বন্যপ্রাণীদের তৃণভূমি।
জলদাপাড়া বন বিভাগের ডিএফও প্রবীন কাসোয়ান বলেন, ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা তোর্সার জলের প্রবল স্রোতে জাতীয় উদ্যানের হরিণ, বাইসন, গন্ডার ও চিতাবাঘ ভেসে যেতে পারে। পুরো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা সজাগ আছি। উত্তরবঙ্গের মুখ্য বনপাল (বন্যপ্রাণ) ভাস্কর জেবি বলেন, গোরুমারার দু’টি গন্ডার জলঢাকা নদীতে ভেসে গিয়েছিল। এরমধ্যে একটির মৃত্যু হয়েছে। জলদাপাড়ায় চারটি গন্ডার ভেসে গিয়েছে। তারমধ্যে দু’টি উদ্ধার হয়েছে। আর কোনও বন্যপ্রাণী ভেসে গিয়েছে কি না আমরা খোঁজ নিচ্ছি। অনেক জল, ফলে বনকর্মীদের পৌঁছতে সমস্যা হচ্ছে।
রবিবার সকাল থেকে আলিপুরদুয়ার-ফালাকাটা ১৭-ডি সড়কে শিলতোর্সা সেতু থেকে স্থানীয়রা জলে খাবি খাওয়া বন্যপ্রাণীদের ভেসে যাওয়ার দৃশ্য মোবাইলে ক্যামেরা বন্দি করেন। এই অবস্থা দেখেও অসহায় স্থানীয় বাসিন্দা ও বনকর্মীদের কিছুই করার ছিল না। তোর্সার ভয়াল স্রোত দেখে কেউ আর নদীতে নামার ঝুঁকি নেননি।
এরমধ্যে দু’টি গন্ডার নদী সাঁতরে আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের সিমলাবাড়ি ও সুরিপাড়া গ্রামে ডাঙায় উঠে আসতে সক্ষম হয়। জলদাপাড়ার সহকারী বন্যপ্রাণী সংরক্ষক নবিকান্ত ঝা বলেন, জল থাকায় গন্ডার দু’টিকে জঙ্গলে ফেরাতে সমস্যা হচ্ছে। তাই দু’টি গ্রামের বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে।
গোটা জঙ্গল প্লাবিত হওয়ায় জলদাপাড়ায় জিপসি ও হাতি সাফারি আপাতত বন্ধ রেখেছে বনদপ্তর। রবিবার দুপুরে মাদারিহাট থেকে জলদাপাড়া ট্যুরিস্ট লজে যাওয়ার রাস্তায় হলং নদীর উপর কাঠের সেতুটি জলের তোড়ে ভেঙে যায়। সরকারি ওই লজে যাওয়ার সেটিই একমাত্র রাস্তা। ফলে বিচ্ছিন্ন লজে আটকে পড়েন ২৫ জন পর্যটক। পরে কুনকি হাতির পিঠে চাপিয়ে কয়েকজন পর্যটককে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে, লজের ম্যানেজার নিরঞ্জন সাহা বলেন, আটকে পড়লেও পর্যটকদের খাবার-জলের অসুবিধা নেই। এদিকে, প্রবল জলোচ্ছ্বাসে শিসামারা নদীর বাঁধ ভেঙে গিয়ে প্লাবিত হয়েছে শালকুমার-১, ২ ও পূর্ব কাঁঠালবাড়ি তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা। জাতীয় উদ্যানের শিসামারার জঙ্গলে ১৮টির মতো বেসরকারি রিসর্ট আছে। শিসামারার ভয়ংকর প্লাবনে পুজোয় বেড়াতে আসা রিসর্টগুলিতে ১২৮ জন পর্যটক আটকে পড়েছেন বলে জানান জলদাপাড়া রিসর্ট ওনারর্স অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ দেবাশিস রাউথ।