


প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: লোধা-শবর সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবতা ‘কিতুঙ’ আর জগন্নাথ দেবের বিগ্রহের সাদৃশ্য নিয়ে নানা লোকশ্রুতি প্রচলিত আছে। দুই বিগ্রহই অঙ্গহীন। সেই বিশ্বাসের কাহিনি নিয়ে আজও পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে অভিনীত হয় ‘ললিতা পালা’। সে পালায় অবশ্য দেবতার নাম ‘নীলমাধব’। তবে লোধা-শবর সম্প্রদায়ের একাংশের বিশ্বাস, তাঁদের নীলমাধব বা কিতুঙই ওড়িশার জগন্নাথ দেব।
শবর সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, অরণ্য ঘেরা নীল পাহাড়ের গুহায় শবররাজ পুজো করতেন নীলমাধবের। তাঁর কন্যা ললিতা। ওদিকে বিষ্ণুর উপাসক মালবরাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন এক সন্ন্যাসীর থেকে জানতে পারেন, বিষ্ণুর নীলমাধব রূপের কথা। তিনি অনুচর বিদ্যাপতিকে সেই বিগ্ৰহের খোঁজে পাঠান। রাজ অনুচর বিদ্যাপতি বহু বধর ধরে পাহাড়, অরণ্য চষে ফেলেন নীলমাধবের সন্ধানে। একবার শ্বাপদসঙ্কুল জঙ্গলে তিনি পথ হারিয়ে বিপদে পড়েন। তখন শবর রাজকন্যা ললিতা হিংস্র জন্তদের হাত থেকে বিদ্যাপতিকে রক্ষা করেন। বিদ্যাপতি আশ্রয় পান শবর রাজগৃহে। ক্রমে ললিতার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে পড়েন বিদ্যাপতি। শবর রাজকন্যা ও ব্রাহ্মণ বিদ্যাপতির বিয়ে হয়। শবর রাজত্বে সুখে শান্তিতেই তাঁদের দাম্পত্য জীবন কাটছিল। যদিও নীলমাধবের খোঁজ বিদ্যাপতি থামাননি। শেষে জানতে পারেন, শবররাজা গভীর অরণ্যে এক গুহায় নীলমাধবের পুজো করেন। তার খবর কেউ জানে না। লুকিয়ে শবররাজের পিছু নিয়ে গিরিগুহায় নীলমাধবের খোঁজ পান বিদ্যাপতি। সেই খবর পৌঁছে যায় ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে। মালব রাজার সৈন্যরা হানা দেয় শবর রাজত্বে। তাদের উদ্দেশ্য দেববিগ্ৰহ নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সৈন্যরা পৌঁছনোর আগেই সেই গুহা থেকে নীলমাধব চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে যান। পুরাণে উল্লেখ আছে, বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতার কাঠের স্তম্ভ ভেঙে বেরিয়েছিলেন। নৃসিংহ স্ত্রোত্র পাঠ করে জগন্নাথ দেব দারুব্রহ্ম রূপেও পূজিত হন। তিনি দধিবামন নামেও পরিচিত। রথযাত্রার সময়েও জগন্নাথকে বামন রূপে পূজা করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে তুলসীদাস পুরীতে এসে জগন্নাথকে রঘুনাথ (রাম) রূপে পুজো করেছিলেন। চৈতন্যদেব মহাপ্রভু জগন্নাথকে মাধবরূপে পুজো করেছিলেন। গবেষকদের কাছে আজও আলোচ্য বিষয়, শবর জাতির দেবতা কিতুঙই কি নানা ধর্মীয় বিশ্বাসের মিলিত রূপ হিসেবে জগন্নাথ দেব হয়ে উঠেছেন। গবেষক মধূপ দে বলেন, সূদূর অতীতে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিলিত রূপেরই কথা বলে ললিতা পালা। ওড়িশার শবর সম্প্রদায় এখনও অঙ্গহীন কিতুঙ দেবতাকে স্মরণ করেন। জঙ্গলমহলে ললিতা পালা অভিনীত হয়। ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজার ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। এটি একটি লোককাহিনি। তবে লোককাহিনিরও কিছু ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকে। এ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। গোপীবল্লভপুর এলাকার বাসিন্দা অনিমেষ সিংহ বলেন, গোপীবল্লভপুরে রথযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসবেন। দড়িতে হাত দিয়ে রথ টানবেন। শবর সম্প্রদায়ের মানুষরাও স্মরণ করবেন তাদের অন্তর্হিত হয়ে যাওয়া নীলমাধবকে।