


নিজস্ব প্রতিনিধি, শিলিগুড়ি ও সংবাদদাতা, দার্জিলিং: মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন মহাকাব্য গিলগামেশ ও বাইবেলের কাহিনী অনুযায়ী ঈশ্বর নোয়া নামের এক নীতিবান মানুষকে এক বিশাল নৌকা তৈরি করতে বলেন। কারণ পৃথিবীতে মহাপ্লাবন আসন্ন। নোয়া তাঁর পরিবার এবং প্রতিটি প্রাণীর এক জোড়া করে নৌকায় তুলে নেন। মহাপ্লাবনের পর যখন জল নেমে যায়, তখন নৌকায় থাকা প্রাণীদের দ্বারা জীবজগৎ রক্ষা পায়। এ যেন ‘নোয়ার নৌকা’রই গল্প। বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী সংরক্ষণে এমনই পদক্ষেপ করেছে দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু জুওলজিক্যাল পার্ক। ভারতের প্রথম জৈব বা জেনেটিক ব্যাঙ্ক এখানেই তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। হিমাঙ্কের অনেক নীচের তাপমাত্রায় এখানে সংরক্ষিত হচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর আরএনএ, ডিএনএ, টিস্যু কোষ এবং গ্যামেট।
পদ্মজা নাইডু জুওলজিক্যাল পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হায়দরাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (সিসিএমবি) এবিষয়ে তাদেরকে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। এই জেনেটিক ব্যাঙ্ক তৈরির মূল উদ্দেশ্য হল কোনও অঞ্চলে নির্দিষ্ট প্রজাতির বন্যপ্রাণীর সংখ্যা হ্রাস পেলে বা তারা হারিয়ে যেতে বসলেও তাদের জিনগত নকশা (জেনেটিক কোড) অক্ষত থাকবে। তা থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। কার্যত তারা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। এটা আধুনিক জীববিজ্ঞানের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। পদ্মজা নাইডু জুওলজিক্যাল পার্কের ডিরেক্টর বাসবরাজ হোলেয়াচি বলেন, বর্তমানে আমাদের চিড়িয়াখানায় বন্দি প্রাণী এবং কিছু মৃত প্রাণীদের দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে একটি ল্যাবরেটরি বানিয়েছি। সেখানে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এগুলি তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ল্যাবরেটরিতে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়েছে। সাধারণত ডিএনএ সংরক্ষণের জন্য মাইনাস ২০ ডিগ্রি তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। টিস্যু কোষ এবং গ্যামেট মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। সংগৃহীত নমুনাগুলি এই প্রক্রিয়ায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করা যাবে।
ডিরেক্টর আরও বলেন, আমরা হায়দরাবাদের সিসিএমবি থেকে ল্যাবরেটরির জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছি এবং সেখান থেকে আমাদের কিছু লোককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভারতে এধরনের কাজ প্রথম। জু অথরিটি অব ইন্ডিয়া কিছু চিড়িয়াখানার সঙ্গে পরামর্শ করে একটি দল গঠন করে। যেখানে দার্জিলিং থেকে প্রথমে এই ল্যাবরেটরি স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু জুওলজিক্যাল পার্ক আগে থেকেই রেড পান্ডা, তুষার চিতা এবং তিব্বতি নেকড়েদের সংরক্ষণ ও প্রজনন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে পার্ক কর্তৃপক্ষ সফল। বর্তমানে মারখোর, তাকিন, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার সহ নানা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণের কাজও হাতে নিয়েছে। জেনেটিক ব্যাঙ্ক স্থাপন পার্কের মকুটে আর একটি পালক যোগ করল।