


নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝালদা: মণীশের চিতার থেকে জ্বলে উঠল প্রতিবাদের আগুন। দল, মত, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবার দাবি একটাই— জঙ্গিদের উপযুক্ত শাস্তি চাই। যাঁরা মণীশের দেহ রক্তাক্ত করেছে, কাশ্মীরকে রক্তাক্ত করেছে, তাঁদের একজনকেও যেন ছাড়া না হয়।
মঙ্গলবার কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিদের গুলিতে নিহত হয়েছেন পুরুলিয়ার ঝালদার বাসিন্দা মণীশরঞ্জন মিশ্র। মণীশ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইবি-র সেকশন অফিসার ছিলেন। স্ত্রী, ১৩ বছরের ছেলে ও সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে ভূস্বর্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার কখন দেহ এসে পৌঁছবে, রাতভর তারই অপেক্ষায় ছিল গোটা শহর। বৃহস্পতিবার মণীশের কফিনবন্দি দেহ ঝালদার পৌঁছনোর অনেক আগে পুরাতন বাঘমুন্ডি রোডের দু’ ধারে রোদের মধ্যেই বসে ছিলেন বহু মানুষ। ঘরের ছেলেকে চিরবিদায় জানাতে ভেঙে পড়েছিল গোটা শহর। ঝালদা নাগরিক মঞ্চের ডাকা বনধে সাধারণ মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এদিন শহরজুড়ে জাতীয় পতাকা হাতে বাইক মিছিলও করে যুবকরা। প্রত্যেকের মুখেই ছিল পাকিস্তান বিরোধী শ্লোগান। প্রত্যেকেই মণীশ হত্যার বিচার চান।
বৃহস্পতিবার মণীশের দেহ বাড়িতে পৌঁছনোর আগেই হাজির হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার, পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাত, তৃণমূল বিধায়ক সুশান্ত মাহাত। এসেছিলেন জেলার পুলিস সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, ঝালদার এসডিও রাখি বিশ্বাস সহ পুলিস ও প্রশাসনের পদস্থ কর্তারা। ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাত থেকে শুরু করে সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার দুপুর তখন ১২টা ৪০ মিনিট। অ্যাম্বুল্যান্সে করে নিয়ে আসা হল মণীশের কফিনবন্দি নিথর দেহ। কফিন কাঁধে তুলে নিলেন জেলার পুলিস সুপার সহ অন্যান্য পুলিসকর্তারা। তারপর সেই কফিন রাখা হল মণীশের বাড়ির একচিলতে উঠোনে। সেখানেইএকে একে ফুলের মালা দিয়ে মণীশকে শ্রদ্ধা জানালেন নেতা, মন্ত্রী থেকে পরিজনেরা। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের লোকজন।
দুপুর দুটো ১৫ মিনিট। লম্বা জাতীয় পতাকায় ঢেকেছে গোটা রাস্তা। বাড়ি থেকে শেষকৃত্যের জন্য বের হল জাতীয় পতাকায় মোড়া মণীশে দেহ। শুরু হল মিছিল। কেউ দৌড়লেন শবমিছিলের পিছনে। রাজনৈতিক বিরোধিতা ভুলে মিছিলে হাঁটলেন সব দলের নেতারাই। রাস্তার দু’ ধারে সার বেঁধে থাকা মানুষ চোখের জল মুছছেন। শহর পরিক্রমা করে বিকেলে শ্মশানে যখন দেহ পৌঁছল, সেখানে তখন জনারণ্য। শ্মশানেই ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে রাজ্যের তরফে শ্রদ্ধা জানানো হয় মণীশকে। তারপর দেহ তোলা হয় চিতায়।
মণীশের দুই ভাই বিনীত, রাহুল, ছোটবেলার বন্ধু মনোজকুমার রুন্টা, অমিত মানসিনকা, তাঁর বাবার ছাত্র বিজয় ভগৎরা বলেন, ‘মণীশ তো চলে গেল। কিন্তু ধর্মের নামে ভূস্বর্গে যাঁরা হত্যালীলা চালিয়েছে, তাদের উপযুক্ত শাস্তি চাই।’ একই কথা বলছেন ঝালদার মানুষও।