


উত্তরে স্পেন আর দক্ষিণে মরক্কো। মাঝে জিব্রাল্টার প্রণালী। দুই দেশের নিকটতম বিন্দুর দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। একটা সেতু নির্মাণ হলেই জুড়ে যাবে ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশ। কিন্তু কেন সেতু তৈরি সম্ভব নয়, জানালেন অনির্বাণ রক্ষিত
একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী আরও আধুনিক ও উন্নত হয়েছে। মহাকাশ ভ্রমণ থেকে শুরু করে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন বিজ্ঞানীরা। প্রযুক্তির এত আধুনিকতা সত্ত্বেও জিব্রাল্টার প্রণালীকে আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে কোনও সেতু দিয়ে সংযুক্ত করা যায়নি। একটি অংশে ইউরোপ ও আফ্রিকার মাঝখানের দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। আর একটু খুলে বললে, ইউরোপের শেষ বিন্দুতে রয়েছে স্পেন এবং আফ্রিকার শুরুতে রয়েছে মরক্কো। মাঝখানে রয়েছে দীর্ঘ ১৪ কিলোমিটারের জিব্রাল্টার প্রণালী। এই জলপথেই সংযুক্ত করেছে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর। কিন্তু দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এই প্রণালীর উপর কোনও সেতু নির্মাণ হয়নি। সেতু নির্মাণ হলে অনায়াসেই জুড়ে যেত এই দু’টি মহাদেশ। তাই ব্রিজ না থাকার বিষয়টি অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগলেও এটাই বাস্তব। ছোট্ট বন্ধুরা প্রথমেই তোমাদের জানতে হবে, জিব্রাল্টার প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রণালী পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত জলপথ। প্রতিদিন হাজার হাজার জাহাজ এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে। প্রায় ৫ লক্ষ টন অপরিশোধিত তেল পরিবহণ করা হয় এই রাস্তা ধরে। এইসবের পেছনের কারণটা খুব সোজা। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার এটাই একমাত্র প্রাকৃতিক পথ। এই প্রণালী যদি না থাকত, তবে ইউরোপের দেশগুলোকে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হতো। এতে সময় এবং খরচ—দুটোই বেড়ে যেত। অল্প দূরত্বের এই ব্যবধানে সেতু না বানানোর অন্যতম কারণ হল জলের গভীরতা। এটাই হল সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানভেদে এই প্রণালী ৩০০ থেকে ৯০০ মিটার পর্যন্ত গভীর। এত গভীরে গিয়ে পিলার স্থাপন করা বর্তমান প্রযুক্তিতে কঠিন ও ব্যয়বহুল একটি কাজ। দ্বিতীয় কারণ হল, এই এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন। আসলে এলাকাটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। জিব্রাল্টার প্রণালী এমন এক জায়গায় অবস্থিত, যেখানে দু’টি বিশাল টেকটোনিক প্লেট—ইউরেশিয়ান প্লেট ও আফ্রিকান প্লেট—একসঙ্গে মিশেছে। এই দু’টি প্লেট পরস্পরকে ধাক্কা দিচ্ছে নিয়মিত। ফলে এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ। অর্থাৎ, এখানে সেতু নির্মাণ করলে সামান্য ভূমিকম্পেই তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। তৃতীয় কারণ, প্রচণ্ড স্রোত এবং বাতাস। যেহেতু আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগর এখানে একসঙ্গে মিশেছে, তাই জলের নীচে প্রচণ্ড শক্তিশালী স্রোত তৈরি হয়। একদিকে আটলান্টিকের ঠান্ডা জল ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে, আবার ভূমধ্যসাগরের উষ্ণ জল বেরিয়ে যায় আটলান্টিকের দিকে। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের কারণে সেতুর পিলারগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। যা থেকে সেতু ভেঙে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকবে।
এই অঞ্চলে যে সেতু তৈরির উদ্যোগ একেবারেই নেওয়া হয়নি, তা বলা ভুল। একাধিকবার সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও তা এইসব কারণগুলির জন্য বাতিল করতে হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশ জলের নীচ দিয়ে টানেল তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে সেই উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা সময়ই বলবে।