


নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদ জেলাজুড়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এবং নাবালিকা প্রসূতি রুখতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। মুর্শিদাবাদ জেলার ২৬টি ব্লকেই বাল্যবিবাহ ও নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা যথেষ্ট বেশি। পঞ্চম জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদ জেলায় বাল্যবিবাহের হার ৫৫ শতাংশের বেশি। নাবালিকা প্রসূতির হার ২০.৬ শতাংশের বেশি। কারোনা পরবর্তী সময়ে এটা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
তার প্রমাণ মিলেছে কন্যাশ্রী প্রকল্পের আবেদনে। জানা গিয়েছে, গত বছরের তুলনায় সরকারি প্রকল্প কন্যাশ্রী-১ ও কন্যাশ্রী-২ মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার ছাত্রী বিভিন্ন কারণে তাদের নাম পোর্টালে নথিভুক্ত করেনি। সরকার সাহায্য দিচ্ছে অথচ নবালিকারা আবেদন করছে না, এই পরিসংখ্যান দেখে জেলা প্রশাসন সার্ভে শুরু করে। দেখা যায়, অধিকাংশ বাল্য বিবাহের শিকার। জেলার স্বাস্থ্যদপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, গড়ে কিশোরী বয়সে মাতৃত্বের হার ২৯ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশ। যা যথেষ্ট উদ্বেগের।
জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, কন্যাশ্রী নন রিনিউয়ালের বিষয়ে সমীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, আবেদন না করা প্রায় ৬০ শতাংশ মেয়েরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সেই জন্য জেলা প্রশাসন এই বিষয়টাকে মাথায় রেখে গত ৪ জুন পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে বহরমপুর ও হরিহরপাড়াকে বেছে নেয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই দু’টি ব্লককে বাল্যবিবাহ মুক্ত এবং স্কুল ড্রপ আউট মুক্ত হিসেবে ঘোষণা করবে। প্রশাসনের প্রায় ১২টি দপ্তর এই উদ্যোগে শামিল হয়। যেখানে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছে জেলা পুলিস, জেলা শিশু সুরক্ষা দপ্তর, কন্যাশ্রী সেল, স্বাস্থ্যদপ্তর, শিক্ষাদপ্তর ও আইসিডিএস দপ্তর। পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও এগিয়ে এসেছে।
মুর্শিদাবাদের পুলিস সুপার কুমার সানি রাজ বলেন, মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ পুলিস জেলায় ৯২টি বাল্যবিবাহের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। ১৬৭জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা সর্বত্র কড়া নজরদারি রাখছি। যেখানেই বাল্যবিবাহের খবর পাচ্ছি, তা সঙ্গে সঙ্গে আটকানো হচ্ছে।
জেলার অন্যতম সংস্থা সিনি জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগের সঙ্গে ব্যাপক প্রচার অভিযান শুরু করেছে। জেলার বিভিন্ন স্কুল ও কমিউনিটি ধরে চেতনা গ্রুপের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। পুরোহিত-ইমাম, ডেকরেটর, ক্যাটারার, মুর্শিদাবাদ জেলার চেম্বার অব কমার্স সহকারী সরকারী দপ্তরগুলির সঙ্গেও একযোগে এই উদ্যোগে শামিল হয়েছে প্রচারের জন্য। সিনি জেলার প্রায় ১৫০টি স্কুলকে বেছে নিয়েছে। এলাকাভিত্তিক সমীক্ষা থেকে বেরিয়ে আসা ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলগুলিতে তাদের সদস্যরা কাজ করছেন।
সিনির অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জয়ন্ত চৌধুরী বলেন, আমরা গত জুন মাস থেকে কাজ করতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি, সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বেশ কিছু জায়গায় প্রেগনেন্সির রেজিস্ট্রেশনে টিনেজ রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বেশ কমছে। বহরমপুর ও হরিহরপাড়া ব্লকে সিনির কর্মক্ষেত্রে প্রায় ২৫টির বেশি গ্রাম আছে। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে সেখানকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটিও নাবালিকা গর্ভবতীর কেস রেজিস্টার হয়নি। তার মানে বুঝতে হবে, এখানে গত তিন থেকে চার মাসে একটিও বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয়নি। অর্থাৎ, বাল্যবিবাহের হার কমছে। স্কুলছুট নাবালিকাদের খুঁজে পুনরায় অনেককে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে।
জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক অর্জুন দত্ত বলেন, প্রথম দু’টি ব্লককে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে জেলাশাসক ঘোষণা করেছেন। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই দু’টি ব্লককে আমরা বাল্যবিবাহ মুক্ত এবং স্কুল ড্রপ আউট মুক্ত করব। এর প্রভাবে জেলার অন্যান্য ব্লকও সচেতন হয়ে কাজ করছে।
নিজস্ব চিত্র