Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

লেখায় ‘রক্ত’ শব্দবন্ধনী ব্যবহারের অপরাধ, কবিকে জেলে পাঠিয়েছিল ইংরেজরা

‘কারাগারে আমরা অনেকেই যা‌ই, কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে সেই জেল জীবনের প্রভাব কমই দেখতে পাই। তার কারণ অনুভূতি কম।

লেখায় ‘রক্ত’ শব্দবন্ধনী ব্যবহারের অপরাধ, কবিকে জেলে পাঠিয়েছিল ইংরেজরা
  • ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: ‘কারাগারে আমরা অনেকেই যা‌ই, কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে সেই জেল জীবনের প্রভাব কমই দেখতে পাই। তার কারণ অনুভূতি কম। কিন্তু নজরুল যে জেলে গিয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁর লেখার মধ্যে অনেক স্থানে পাওয়া যায়। এতে বুঝা যায় যে, তিনি একটি জ্যান্ত মানুষ।’ বিদ্রোহী কবি নজরুল সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্যিক, কবি, সুরকার, সাংবাদিকের পাশাপাশি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীও। বিক্ষিপ্তভাবে কবির সেই সত্তা বারবার ফুটে উঠলেও এবার স্বাধীনতা সংগ্রামী নজরুলকে এক অন্য মোড়কে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement

এই উদ্যোগের একাধিক গুরুত্ব রয়েছে। নজরুলের লেখায় তাঁর সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের লেখার কী প্রভাব পড়েছে, তা নানা গবেষণামূলক কাজে দেখানো হয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, অনেকে ইংরেজ শাসকদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হলেও তাঁদের ভয়ে কলমকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সমালোচনা করতেন। বিশেষ প্রতিভাশালী কবি নজরুল ইঙ্গিত বুঝে তাঁর নিজের লেখায় ইংরেজের অপশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করতেন। তবে, সবাই কি বিদ্রোহী কবির সুহৃদ ছিলেন? মোটেও না। বহু বাঙালিই ব্রিটিশদের স্তাবকতা করতে কবির লেখাকে ইংরেজদের বড় সাহেবদের কাছে তুলে ধরতেন। তারপরই কবির উপর নেমে আসত রাজদণ্ড। এই সবকেই তুলে ধরার প্রচেষ্টা শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডি‌জ।

জানা গিয়েছে, চারটি খণ্ড সংবলিত গবেষণামূলক বইয়ে এই বিষয়গুলি তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। তার মধ্যে প্রথম খণ্ডটি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাতৃভূমির মন্ত্রগীতি’। কবির অগ্রজ খ্যাতনামা সাহিত্যিক দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ রায়ের লেখা নজরুলের রচনায় কী প্রভাব ফেলেছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। সাদৃশ্য খোঁজা হয়েছে কবি-সাহিত্যিক দিলীপকুমার রায়ের লেখার সঙ্গেও। আলোচনা করা হয়েছে কবির জেলযাত্রার কথাও। ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত হল আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা। সেখানে ইংরেজ সরকারকে লক্ষ্য করে কবি ‘রক্ত’, ‘রাক্ষস’ শব্দগুলি ব্যবহার করলেন। ইংরেজরা বাংলার সাহিত্যকুল নিয়ে আতঙ্কিত ছিল। বাংলার কিছু শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। যার মধ্যে এই দু’টি শব্দ ছিল। গবেষকদের দাবি, তৎকালীন বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত সেই তথ্য ইংরেজ শাসকদের কানে তুললেন। ফলস্বরূপ কবির ঠাঁই হল জেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রজেক্টের মূল উদ্যোক্তা নজরুল গবেষক গৌরব চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামী নজরুলকে তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি, সমসাময়িক ও তাঁর অগ্রজদের লেখার প্রভাব সেখানে তুলে ধরা হচ্ছে। এই সংক্রান্ত কবির গান থেকে কবিতা সবই থাকবে।

নজরুল সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজের ডেপুটি ডিরেক্টর সোমনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, আমাদের সেন্টারে কবিকে নিয়ে একাধিক উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে। এই উদ্যোগের পাশাপাশি কবিকে নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক সেমিনারও আয়োজন করতে চলেছি। সেখানে কবির বিভিন্ন সত্তাকে নিয়ে আলোচনা করা হবে।

শুধু নজরুল সেন্টারই নয় কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কবিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তার বড় পদক্ষেপ হিসেবে কবির জন্মভিটে চুরুলিয়ায় তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রীগুলিকে নিয়ে থাকা মিউজিয়ামকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে রাজ্য সরকারের আর্থিক সহযোগিতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উদয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কবির বিশালত্বকে আমরা কতটুকুই জেনেছি! তাঁকে জানার অনেক বাকি। বিশ্বমঞ্চে কবিকে আরও বৃহৎভাবে তুলে ধরতে আমরা চেষ্টা করছি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ