


সমৃদ্ধ দত্ত: রাজা পঞ্চম জর্জ ভারতে এসেছেন। কয়েকটি শহরে যাবেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ভারতের কিছু সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সফরসঙ্গী করা হয়েছে। ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই দলটি হায়দরাবাদে এসেছে। বেছে বেছে যে কয়েকজন মুসলিম সম্পাদক রয়েছেন, তাঁদের প্রাতরাশে ডাকলেন হায়দরাবাদের নিজামের প্রধানমন্ত্রী সালার জঙের ব্যক্তিগত সচিব নবাব ইমাদ উল মালিক। নানা গল্পগুজবের মধ্যে তিনি হঠাৎ জানতে চাইলেন, আচ্ছা প্রশাসনে, সামাজিক সংগঠন বা রাজনীতিতে মুসলিম সমাজের অংশগ্রহণ সেরকম একটা দেখা যায় না কেন?
নবাবকে ওই সম্পাদকরা জানালেন, আসলে সুযোগও কম। কংগ্রেস আর হিন্দু—সমার্থক হয়ে গিয়েছে। আর ব্রিটিশ সরকার তো কংগ্রেসকেই ভারতের প্রতিনিধি ধরে নিচ্ছে। কংগ্রেস যা বলে, ব্রিটিশ ভাবে ওটাই ভারতবাসীর মতামত। ভাবুন না, আজ হাইকোর্টগুলিতে কোনো মুসলিম বিচারপতি নেই। একটা সময় কিন্তু তা ছিল। সব শুনে নবাব ইমাদ উল মালিক বললেন, হুমম। এটা নিয়ে ভাবা দরকার। রাজার কানে খবরটা যাওয়া প্রয়োজন।
সেদিন সন্ধ্যায় রাজা পঞ্চম জর্জের চিফ অব দ্য স্টাফ স্যার লরেন্স ওয়াল্টার নবাবকে বললেন, ‘আসুন, রাজা পঞ্চম জর্জ আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’ তবে রাজার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে স্যার লরেন্স আলাদাভাবে কিছু কথা বললেন। নবাব বললেন, ‘আমি যা খবর পাচ্ছি, মুসলিমদের যে নতুন প্রজন্ম, তারা আর আলিগড় মুভমেন্টে থাকছে না। আগ্রহ পাচ্ছে না। ওরা আরও আধুনিক, রাজনীতি ভিত্তিক কিছু চাইছে। তারা চাইছে যাতে একটা মঞ্চ পাওয়া যায়, যেটা সরাসরি ব্রিটিশের সঙ্গে দর কষাকষি করবে। নিজেদের দাবি তুলে ধরবে।’
লরেন্স বললেন, ‘এটা তো ভালো কথা নয়। আপনারা এখনই কিছু শুরু করুন। যাতে এই নতুন প্রজন্ম কংগ্রেসের দিকে না যায়। কংগ্রেসের মতোই একটা সংগঠন করতে বলুন মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের। আপনি সচিব হবেন। আর আগা খানকে বলুন সভাপতি হতে। ওঁকে সবাই শ্রদ্ধা সম্মান করে। তাছাড়া বেঙ্গল পার্টিশানের বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস। পার্টিশনে তো মুসলিমদের লাভ হয়েছে। সেটা কংগ্রেস মনে হয় চাইছে না!’
লরেন্স যে এই কথাটি হঠাৎ বললেন, এমন কিন্তু নয়। ১৯০৫ সালের পর থেকেই ব্রিটিশ সরকারের তরফে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে দিশাহীন করার জন্য গোপনে একটি প্রচার শুরু হয়েছিল। এবং সেটি এই স্যার লরেন্সের ধাঁচেই। তা হল, বঙ্গভঙ্গ হলে মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে, এটা কংগ্রেস এবং হিন্দু সমাজের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মানুষ চাইছে না। তাই এত বিরোধিতা। যদিও কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ বঙ্গভঙ্গের চরম বিরোধিতায় সামিল হয়েছিলেন নবাব সৈয়দ আমীর হোসেন, নবাব সঈদ আব্বাস সোভানের মতো মুসলিম সমাজের কর্ণধাররা। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এমনভাবে ওই প্রচার করেছিল যে, মুসলিমদের একটি বিরাট অংশ তা বিশ্বাস করে। কারণ সমাজে একটি মনস্তত্ত্ব খুব অমোঘ। সেটি হল, আমি বঞ্চিত এবং আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে, এই বিশ্বাস কমবেশি সকলেই বিশ্বাস করতে চায়। অর্থাৎ নিজেকে ভিক্টিম মনে করতে মানুষ পছন্দ করে।
আলিগড়ে একটি বৈঠক হল। সেই বৈঠকেই প্রাথমিক একটি খসড়া ও রূপরেখা তৈরি হয়ে গেল যে, কীভাবে নতুন সংগঠন করা সম্ভব। ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহমোন এডুকেশনাল কনফারেন্সের সদস্যরা মিলিত হলেন। ঢাকার নবাব সলিমুল্লা অথবা আগা খান কেউই প্রাথমিকভাবে এই উদ্যোগকে তেমন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেননি। তাঁদের অভিমত ছিল স্পষ্ট। এতদিন প্রতিপক্ষ ছিল ব্রিটিশ। এবার পৃথক সংগঠন করা হলে আর একটি প্রতিপক্ষ তৈরি হবে। কংগ্রেস। কিন্তু তাঁদের আশ্বস্ত করা হল, এখনই নতুন সংগঠন রাজনৈতিকভাবে কিছু আন্দোলন অথবা কর্মসূচি করবে না। আগে হবে সামাজিক সংগঠন। যারা মুসলিম সম্প্রদায়ের বঞ্চনা, শোষণ, শিক্ষার অভাব ইত্যাদি নিয়ে সরব হবে। পাশাপাশি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। কারণ কংগ্রেস উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিচালিত একটি সংগঠন। বাংলাই হোক বা মহারাষ্ট্র কিংবা পাঞ্জাব, কংগ্রেসের সব প্রথম সারির নেতাই তো উচ্চবর্ণের হিন্দু। অতএব মুসলিমদের স্বার্থ তারা দেখে না। সেদিন মুসলিমদের নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত করার স্বপ্ন দেখিয়ে একটি নতুন সংগঠন জন্ম নিল— অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ। ঠিক সেই ১৯০৬ সালেই আগস্ট মাসে আর্যসমাজের একঝাঁক নেতা একজোট হয়ে নতুন একটি সংগঠন সৃষ্টি করেছিলেন। লালা লাজপত রাই যাঁদের অন্যতম। সংগঠনের নাম হিন্দু সভা। ঘটনাচক্রে ওই ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নাগপুরের রামটেকে এক সরকারি কর্মী সদাশিব রাও পাধিয়েরের এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছিল। এই পরিবারের আদি বাসস্থান কোঙ্কন প্রদেশের গোলওয়ালি নামক এক গ্রাম। তাই পুত্রসন্তানের নাম দেওয়া হল মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর। যাঁর হাতে বহু বছর পর একটি সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব আসবে। যে সংগঠন ভারতের ভাগ্য বদলে দেওয়ার এক নাটকীয় পথে অগ্রসর হবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ। আরএসএস!
ব্রিটিশদের প্রাথমিক পরিকল্পনা সফল। অবশেষে কংগ্রেসের প্রতিস্পর্ধী একটি সংগঠন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। সোজা কথায়, ভারতের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের একটি পথ আরও প্রশস্ত হল। শাসনব্যবস্থাকে মসৃণভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডিভাইড অ্যান্ড রুল হল সবথেকে সহজ এবং কার্যকরী পন্থা। হিন্দু বনাম মুসলিম হবে এবার রাজনৈতিকভাবেও। দু’পক্ষই গুরুত্ব পাওয়ার জন্য ব্রিটিশের প্রতি বেশি বেশি আনুগত্য প্রদান করবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত? শাসন ব্যবস্থায় ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ভোটে অংশ নেওয়ার জন্য নতুন প্রশাসনিক সংস্কার প্ল্যান। ভাইসরয় লর্ড মিন্টো এবং ভারতসচিব লর্ড মর্লে স্থির করেছেন, দু’টি অংশকে তোষণ করা হবে। একটি হল মুসলিম এবং অন্যটি হল কংগ্রেসের যারা নরমপন্থী। অর্থাৎ যে অংশটি ক্ষমতা কিংবা গুরুত্ব চায় ব্রিটিশের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু কংগ্রেসের চরমপন্থী একটি অংশ আছে, যারা ব্রিটিশকে শত্রু মনে করে এবং হত্যার রাজনীতি করছে। যখন তখন বোমা ছুঁড়ছে। ব্রিটিশদের হত্যা করছে। এই নরমপন্থী বনাম চরমপন্থীদের বিরোধে সুরাত অধিবেশনে কংগ্রেস দ্বিখণ্ডিত পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। ব্রিটিশের পক্ষে কাজটা সহজ হল। প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন একটি প্ল্যান হল। তার নাম মিন্টো-মর্লে রিফর্মস প্ল্যান। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল আইনের সংশোধনী। ভারতীয়দের ভোটাধিকার কীভাবে দেওয়া হবে তার রূপরেখা। মিন্টো ও মর্লেকে চিঠি লিখে এক ব্যারিস্টার বলেছিলেন, কিছু মুসলিম নেতা আপনাদের সঙ্গে দেখা করে দাবিদাওয়া জানিয়ে এল। আপনারা বুঝে গেলেন যে ওরাই ভারতের মুসলিমদের প্রতিনিধি? কারা ওরা? মুসলিমদের হয়ে কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে ওদের? অর্থাৎ এভাবে মুসলিমদের নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব নির্মাণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করলেন সেই ব্যারিস্টার। লন্ডন থেকে পাশ করা। ঝকঝকে আধুনিক চিন্তার মানুষ। তাঁর নাম মহম্মদ আলি জিন্না। যিনি মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলবেন এবং নিজেই হবেন মুসলিম অস্তিত্ব রক্ষার দাবি আদায়ের সেনাপতি।
মর্লের সঙ্গে দেখা করে কংগ্রেসের গোপালকৃষ্ণ গোখলে বললেন, ভারতীয়দের প্রশাসনে বেশি করে স্থান দিতে হবে। আর মুসলিম লিগ মর্লের কাছে দাবি করল, মুসলিমরা যাতে আরও বেশি সংখ্যায় নির্বাচিত হতে পারে, আইনসভায় সেই ব্যবস্থা করুন।
এনিয়ে ফরমুলা চূড়ান্ত হল। ১৯০৯ সালে তা কার্যকর হয়। যার সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল, মুসলিমদের জন্য পৃথক ভোটাধিকার। অর্থাৎ মুসলিম প্রার্থীদের মুসলিম ভোটাররাই ভোট দেবে। কী সুবিধা হল মুসলিমদের? বাংলার প্রাদেশিক কাউন্সিলে (আজকের বিধানসভা) মুসলিম প্রতিনিধিত্ব আগে ছিল ১০.৪ শতাংশ। ১৯০৯ সালের ওই ফরমুলার জেরে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব হল ৪০ শতাংশ। ১৯১০ সালে এই ফরমুলায় ভোট হয়েছিল।
কিন্তু ভোটার কারা ছিল? দেশের জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম। কারণ, শর্ত ছিল অনেক। কার কত জমি আছে। কে কত টাকা জমির খাজনা দেয়। কে কত আয়কর দেয়। কার শিক্ষাগত যোগ্যতাই বা কী। কাদের কী কী সামাজিক পদে থাকা ও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে ইত্যাদি। শুধু এই অংশই ভোট দেবে। জেলা অথবা পুরসভায় নির্বাচিতরা ভোট দিয়ে প্রাদেশিক কাউন্সিলে পাঠাবে সদস্য। সেই সদস্যরা ভোট দিয়ে কেন্দ্রীয় আইনসভায় সদস্যদের পাঠাবে। সোজা কথায়, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নগণ্য। সবটাই প্রায় শিক্ষিত এলিট ভোটারের অধিকার। সেই প্রথম কেন্দ্রীয় আইনসভায় মোট সদস্য হল ৬৮ জন। যাদের ২৭ জন নির্বাচিত। বাকিরা মনোনীত। কিন্তু জনগণ রয়ে গেল ভোটাধিকারের বাইরেই।
পরবর্তী প্রশাসনিক সংস্কার হল ১৯১৯ সালে। এডউইন মন্টেগুর মনে খুব আশা ছিল যে, তিনিই হবেন ভারতের পরবর্তী ভাইসরয়। কারণ চার বছর ধরে ভারতের উপ-ভারতসচিব পদে কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁকে হতাশ করে ভাইসরয় করা হল লর্ড চেমসফোর্ডকে। কিন্তু সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হল না মন্টেগুকে। তাঁকে ভারত সচিব পদ দেওয়া হল। যা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ১০ লক্ষ ভারতীয় সেনা ব্রিটিশরাজের হয়ে যুদ্ধ করেছে। অতএব ভারতকে কিছুটা পুরস্কার দেওয়া উচিত। মন্টেগু ভাইসরয় চেমসফোর্ডকে প্রস্তাব দিলেন, প্রাদেশিক আইনসভাগুলিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হোক। কেন্দ্রীয় আইনসভার কোনো অধীনতা থাকবে না। সেটা ভারতীয়দের দীর্ঘদিনের স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিকে অনেকটা পূরণ করবে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এতটা বাড়াবাড়ি পছন্দ করল না।
নতুন যে প্রশাসনিক সংস্কার হল সেটির নাম মন্টগেু-চেমসফোর্ড স্কিম। আবার ভোটাধিকারের ফরমুলা বদল। বলা হল, প্রাদেশিক আইনসভা অর্থাৎ আজ যা বিধানসভা, তার অধিকার থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্যচাষ ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়ণের। কিন্তু অর্থ, প্রতিরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিল্প, কারখানা, খনিজ এই সমস্ত বিষয়ের অধিকার কেন্দ্রীয় আইনসভার। অর্থাৎ আদতে সব প্রধান অধিকারই কেন্দ্রের। তার চালিকাশক্তি মূলত ব্রিটিশ সরকার। ভাইসরয়। তবে ১৯১৯ সালের এই স্কিম অনুযায়ী, মুসলিমদের জন্য পৃথক ভোটাধিকার বন্ধ হল না। রয়েই গেল। যুক্ত হল শিখ, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, ইউরোপিয়ান। কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য সংখ্যা হল ১৪৫। যার মধ্যে ১০৫ জন নির্বাচিত। নির্বাচনের প্রক্রিয়া সেই একই। তবে ভোটাধিকারের সংখ্যা বেড়ে গেল। ৩০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৫০ লক্ষ ভোটাধিকার পেল। যদিও তারাই ভোট দিতে পেরেছিল, যাদের জমি আছে, খাজনা দেয়, আয়কর দেয়, সভা সমিতি ক্লাব সংগঠনের সদস্য, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, শিল্পপতি। অর্থাৎ? উচ্চবর্গের মানুষ। এবারও বাদ সিংহভাগ সাধারণ মানুষ।
ভোট নিয়ে কোনো উত্তেজনা ছিল না এতদিন। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে হয়তো ছিল। সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসেনি। সেই উত্তেজনা, আগ্রহ ও কৌতুহল এসেছিল ১৯৩৭ সালের ভোটে। ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে ততদিনে। কংগ্রেস বনাম মুসলিম লিগ পরস্পরের মুখোমুখি। শুধু তাই নয়, ১৯৩৩ সালে রহমত আলি নামে কেমব্রিজের এক আইনের স্নাতক একটি প্যামফ্লেট বিলি করেছিল। যার শিরোনাম ছিল, ‘এবার নয় নেভার: আমরা কি বেঁচে থাকব? নাকি ধ্বংস হব।’ প্রতিপাদ্য হল, ভারতের মধ্যে থেকে গেলে মুসলমানদের কোনো লাভ হবে না। পাঞ্জাব, কাশ্মীর, সিন্ধ, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বালুচিস্তান নিয়ে একটি পৃথক দেশ করতে হবে। মুসলিমদের জন্য। তাহলেই মুসলিমদের নিজের শুদ্ধতা বজায় থাকবে। স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। দেশের নাম—পাকিস্তান!
১৯৩৩ সালে ওই কথায় ভারতের মুসলিমদের সামান্য অংশ উদ্বেলিত হলেও বিশেষ কোনো প্রভাব পড়েনি। কিন্তু রহমত আলিকে কেউ ভোলেননি। ১৯৩৭ সালের ভোটে পুরোদস্তুর মুসলিম লিগের কর্ণধার হয়ে গিয়েছেন মহম্মদ আলি জিন্না। আর অন্যদিকে কংগ্রেসের তাবড় সব নেতা। জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, বল্লভভাই প্যাটেল, গোবিন্দবল্লভ পন্থ, চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং সর্বোপরি মহাত্মা গান্ধী। ভোটে নতুন একটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা হল। তফসিলি জাতি ও উপজাতি। বাবাসাহেব আম্বেদকর চেয়েছিলেন ঠিক মুসলিমদের মতো যেন দলিতরাও পৃথক ভোটাধিকার পায়। অর্থাৎ দলিত প্রার্থীকে দলিত ভোটার নির্বাচন করবে। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে এই বিভাজন মেনে নিতে গররাজি ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। যা নিয়ে চরম দড়ি টানাটানি, গান্ধীজীর অনশন, রবীন্দ্রনাথের ছুটে আসা ইত্যাদি নাটকীয় ঘটনা ঘটে গিয়েছে।
৩৫ কোটি জনসংখ্যা। ৩ কোটি ভোটার। সবথেকে চমকপ্রদ কী? মহিলা ভোটার। ৪০ লক্ষ মহিলা ভোটার ভোটাধিকার পেয়েছিল ১৯৩৭ সালের ভোটে। যা তখনও বহু দেশ দিতে পারেনি। ভোটার ৩ কোটি হলেও ভোট দিয়েছিল দেড় কোটি।
মুসলিম লিগ এবার বিরাট বড়ো ঝড় তুলবে। এরকমই ভাবা হয়েছিল। ভারতের দেড় কোটি মানুষ সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। যাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মুসলিম। কেন? কারণ ১৯৩৭ সালের ভোটে কংগ্রেস পেল ১১ রাজ্যে ৭০৭টি আসন। দ্বিতীয় স্থানে জিন্নার মুসলিম লিগ। কত আসন পেয়েছিল তারা? মাত্র ১০৬। বাংলা এবং পাঞ্জাব মুসলিম অধ্যুষিত। অথচ এই দুই রাজ্যে মুসলিম লিগ বিপর্যস্ত। ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টিও মুসলিম লিগের থেকে বেশি আসন পেল। পাঞ্জাবে মুসলিম লিগ কটা আসন পেল? মাত্র একটা।
এই চরম লাঞ্ছনা সহ্য করতে পারেননি মহম্মদ আলি জিন্না। তাই আর রাখঢাক নয়। এরপর থেকে তিনি সরাসরি রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যই স্থির করলেন হিন্দু বনাম মুসলিম। ১৯৪০ সালের ২২ মার্চ পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে মুসলিম লিগের অধিবেশনে জিন্না প্রারম্ভিক ভাষণে বললেন, হিন্দু আর মুসলিম দু’টি পৃথক সভ্যতা। পৃথক ইতিহাস। একই রাষ্ট্রের মধ্যে পাশাপাশি থাকা চলতে পারে না। তাই মুসলিম লিগ ব্রিটিশ সরকারের ফেডারেশন স্কিমকে প্রত্যাখ্যান করছে। আমরা চাই পৃথক যুক্তরাজ্য। সার্বভৌম ক্ষমতা ও স্বশাসন। ভারতবাসী পরদিন জানতে পারল জিন্না চাইছেন পাকিস্তান নামক একটি পৃথক সত্তা!
জিন্না পাকিস্তান পেয়েছিলেন। ভারতের বিভাজন হয়েছিল। কিন্তু জিন্না জানতেও পারেননি যে, তাঁর ওই সাধের পাকিস্তান ৮০ বছর পরও গণতন্ত্র পায়নি। অবাধ সুষ্ঠু ভোট কাকে বলে ভালো করে শেখেইনি। অথচ ১৯৫০ সালে নিজস্ব সংবিধান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পশ্চিমবঙ্গের এক আইসিএস অফিসারকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন একটি আশ্চর্য কর্মসূচি সমাধা করতে। সেই অফিসারের নাম সুকুমার সেন। তাঁকে যে পদে স্বাধীন ভারতে প্রথম বসানো হয়েছিল, তার নাম নির্বাচন কমিশনার!
১৭ কোটি ভোটার। যাদের সিংহভাগ জীবনে ভোট কীভাবে দিতে হয় জানে না। কাকে বলে প্রতীক, জানে না। ১৯৫২ সালের সেই ভারতে সাক্ষর কতজন ছিল? ১৮ শতাংশ। তাহলে ১৭ কোটি ভোটারের সিংহভাগ কীভাবে জানবে যে তাদের প্রার্থীর নাম কী? এই অসাধ্য সাধন করে গণতন্ত্রের সফরকে এক চিরকালীন অশ্বমেধের ঘোড়ায় আসীন করেছিল ভারত।
ভারত। গণতন্ত্রের রাজসূয় যজ্ঞের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত। যজ্ঞের নাম ভোট!