


গুয়াহাটির প্রসিদ্ধ কামাখ্যা মন্দির দর্শনের পরে গাড়ির চালক বিশুর কাছে গুয়াহাটির দর্শনীয় স্থান জানতে চাইলে, প্রথমেই তিনি জানালেন, বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমের কথা।
শীতের মিঠে রোদ পিঠে মেখে চললাম বশিষ্ঠ মুনির আশ্রম দর্শনে। গুয়াহাটি শহর থেকে প্রায় চোদ্দো কিলোমিটার দূরে এই আশ্রম। যেতে সময় লাগে প্রায় ৪৫ মিনিট।
পৌঁছানোর আগে চোখে পড়ল গড়ভাঙা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কিছুটা অংশ। ভারি সুন্দর সে পথ। দু’পাশে সবুজ সবুজ লম্বা গাছের গুঁড়িতে সাদা বর্ডার দেওয়া রয়েছে। চরাচর ঢাকা বনাঞ্চলের মাঝে রাস্তা। চোখ এবং মন দুইয়েরই বেশ আরাম হল।
পুরাণ অনুযায়ী, ঋগ্বেদের সপ্তমমণ্ডলের মুনি হলেন বশিষ্ঠ। বেদ, উপনিষদ এবং প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থগুলিতে ওঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। গুয়াহাটির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সন্ধ্যাচল পাহাড়ে এই বশিষ্ঠাশ্রম। গাড়ি থেকে নামতেই আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য দাঁড়িয়েছিল অগুনতি শাখামৃগ। মনে মনে একটু ভয় পেলেও তাদের লম্ফঝম্ফ দেখতে মন্দ লাগছিল না। একে অপরের সঙ্গে হুড়োহুড়ি, এক একজন কতরকমের যে কৌশল দেখাবে তার প্রতিযোগিতা চলছে যেন! মন্দিরের সামনে ছোট ছোট দোকানে দেখলাম তাদের খাবারও মিলছে।
অত্যুৎসাহী ভক্তরা বাদাম, কলা খাওয়াচ্ছেন। খাবার দেওয়ার আগেই হুটোপুটি করে খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার হুজুগও দেখলাম। মন্দিরের সামনে পুজোর সামগ্রী ফুল, মালা, ধূপ, দীপ সবই পাওয়া যাচ্ছে। ঢোকার মুখেই মন্দিরের টেরাকোটার গেটের মাথায় ছোট্ট গণেশ-দুর্গার মূর্তি রয়েছে। তারপর জুতো খুলে বেশ খানিকটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখা। ঘুরে দেখলাম, বশিষ্ঠ মুনির ধ্যানকক্ষ। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে প্রায়ান্ধকার একটি ঘর, একজন পূজারি ব্রাহ্মণ সেখানে পুজো দিচ্ছেন। বড় কালো পাথরখণ্ডের ওপরে ফুল বেলপাতা দেওয়া রয়েছে। পূজারি জানালেন, এইখানেই কঠোর তপস্যা করতেন বশিষ্ঠ। বড় পাথরে তাঁর পায়ের ছাপও রয়েছে। এও বললেন, বিশ্বাস অনুসারে, বশিষ্ঠ মুনি খুব শিবভক্ত ছিলেন। এবং গুহায় শিবের মাঝেই বিলীন হয়েছেন।
মন্ত্র পাঠ করে পুজো দেওয়াচ্ছেন পূজারি। সে তো সব মন্দিরেই হয়। কিন্তু এখানে দেখলাম দেবী কামাখ্যার জয়, হর হর মহাদেবের জয়, গণেশের জয়ের পাশাপাশি পূজ্য পিতামাতার জয় বললেন। যেটা খুব ভালো ও স্বতন্ত্র লাগল।
বৈষ্ণোদেবীর মন্দির ছাড়া এই নিয়ম অন্য কোথাও বড় একটা দেখিনি। মন্দির চত্বরে বশিষ্ঠ মুনির মূর্তিও রয়েছে। অসম রাজা, রাজেশ্বর সিংহ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এবং ৮০০ বিঘা জমি দান ও করেন। মন্দিরে টেরাকোটার এবং পাথরের কাজ রয়েছে। গণেশের বড় মন্দিরও রয়েছে। সেখানে সিদ্ধিদাতার নানা ধরনের মূর্তি ও পুরাণকাহিনি দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে। ভগবান বিষ্ণুর পুজোও হয় এই মন্দিরে। আবার জনশ্রুতি এই যে, মন্দিরে নাকি একটা তালা দেওয়া দরজা রয়েছে, যার পিছনে আছে লুকানো সুরঙ্গ পথ। মন্দির ঘুরে দেখতে গিয়ে কানে আসছিল জলের আওয়াজ। জলের উৎস সন্ধান করতেই দেখা মিলল অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়ি ঝর্ণার। বিরামহীন পাহাড় ছোঁয়া জলের বহমান ধারা। অদ্ভুত সুন্দর সে দৃশ্য। কিংবদন্তি এই যে, ব্রহ্মার পুত্র বশিষ্ঠদেব নিমি রাজার অভিশাপ পান। এরপর পিতার নির্দেশ অনুসারে সন্ধ্যাচল পাহাড়ে বিষ্ণুর তপস্যা করতে শুরু করেন। তাঁর সুকঠিন তপস্যায় বিষ্ণু সন্তুষ্ট হন এবং সন্ধ্যা ললিতা ও কান্তা এই ত্রিধারা প্রবাহিত করে গঙ্গাকে নামিয়ে আনেন। এই ত্রিধারা সঙ্গমে ডুব দিয়ে বশিষ্ঠ অভিশাপ মুক্ত হয়ে নিজের পুরনো চেহারা ফিরে পান। এবং পরবর্তী সময়ে তিনি এখানেই শেষ জীবন অবধি বসবাস করে দীর্ঘ তপস্যায় রত হন। তাঁর নামানুযায়ী এই আশ্রমের নাম হয় বশিষ্ঠাশ্রম।
সন্ধ্যা ললিতা আর কান্তার মিলিত ধারাই বশিষ্ঠ গঙ্গা নামে পরিচিত। এই ধারার আরেক নাম অমৃতকুণ্ড। প্রচলিত বিশ্বাস, পবিত্র অমৃতকুণ্ডর জলে স্নান করলে রোগব্যাধি তো নির্মূল হয়ই মনের শান্তিও মেলে। এখানে বশিষ্ঠ মুনি ত্রিসন্ধ্যা ধ্যান করতেন। বহু পর্যটককে দেখলাম, কেউ বিশ্বাসী মন নিয়ে স্নান করছেন কেউ বা ভক্তি ভরে ত্রিবেণী সঙ্গমের স্রোতস্বিনীর ধারা জল মাথায় ছোঁয়াচ্ছেন। বশিষ্ঠ আশ্রমের ইতিহাস জানতে চাইলে পূজারি আর একটা কাহিনিও শোনালেন— বশিষ্ঠ কামাখ্যা দর্শনে যাওয়ার পথে রাজা নরক তাঁকে বাঁধা দেন। ক্রোধে অগ্নিশর্মা বশিষ্ঠ রাজাকে অভিশাপ দেন এবং সন্ধ্যাচল পাহাড়ের কাছে দেবালয় তৈরি করে শিবসাধনায় মগ্ন হন।
শিবরাত্রিতে এই আশ্রমে ভক্তদের ঢল নামে। মেলাও বসে। বশিষ্ঠ আশ্রমের চারপাশে ঘন জঙ্গল। শালপ্রাংশু বৃক্ষরাজি, বয়ে চলা পাহাড়ি ঝর্ণার রাংতামোড়া রুপালি স্রোত আর বৈচিত্র্যময় পাথরখণ্ডে খানিকক্ষণ বসলাম। দূষণহীন, কোলাহলহীন পরিবেশ,পায়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে পাহাড় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা কোমল স্রোতের ধারা। অশান্ত মন নিমেষেই শান্ত। দৈনন্দিনের জটিলতা এক লহমায় উধাও। নির্মল প্রকৃতির এই এক অদ্ভুত নিরাময় ক্ষমতা।
এ কিন্তু আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। একটু বেলা পর্যন্ত মন্দিরে থাকলে এবং পূজারিকে জিজ্ঞাসা করলে, সর্বোপরি ভাগ্যে থাকলে ভোগও পাওয়া যায়। কলাপাতায় পরিবেশিত হয় গরম গরম খিচুড়ি, আলুর দম আর পায়েস। অমৃতসম স্বাদ সেই প্রসাদের। আমাদের মন্দিরে যেতে একটু বেলা হয়েছিল তাই মন্দির ঘুরে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল।
শীতের বিকেল হতেই এক অদ্ভুত নির্জনতা অনুভব করলাম। শহর ছাড়িয়ে দূরে নির্জন প্রকৃতি মনকে একটা অন্য সুখানুভূতি দেয়। তাহলে আর কী, পুরাণ, পাহাড় আর ঝর্ণার সম্মিলিত রূপকে উপভোগ করতে গুয়াহাটি শহরে গেলে বশিষ্ঠ আশ্রম ঘুরে আসতে ভুলবেন না।
কীভাবে যাবেন: গুয়াহাটির পল্টন বাজার থেকে যাওয়ার জন্য বাস, অটো, টোটো এবং প্রাইভেট গাড়ি পাওয়া যায়। আশ্রমের কাছেই বাস এবং অটোর স্ট্যান্ড রয়েছে।
তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক