


রাজা ভট্টাচার্য: সিমলেপাড়ার আগের অবস্থা আর নেই। কয়েক বছর আগেও এখানে দেখা যেত বড়ো বড়ো বাগান, সেগুলো নামেই বাগান, আসলে ঘন জঙ্গল।
এখন অবশ্য সেই সিমলেপাড়া পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। বড়োলোকদের প্রকাণ্ড প্রাসাদের চূড়া দেখা যায় দূর থেকে। রাস্তা এখনও কাঁচা, কিন্তু চওড়া।
চিৎপুর থেকে সিমলে যাওয়ার বড়ো রাস্তার উপরেই বাঁদিকে পড়ে দে-সরকারদের বিশাল প্রাসাদটি। আজ মহাষ্টমী। ঠাকুরবাড়ির প্রকাণ্ড থামগুলো ফুলের মালায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ঝাড়বাতির প্রত্যেকটি। জাঁকজমক দেখলে চোখে যেন ধাঁধা লেগে যায়। পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির ছেলে হয়েও আট বছরের প্রসন্নকুমার বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে রইল। তাদের বাড়িটিও বিশাল, এই বাড়ির থেকে ঢের পুরানো, কিন্তু তার সাজসজ্জা ইউরোপীয় ধরনের।
গোপীমোহন তার হাত ধরে বললেন, ‘চল প্রসন্ন! এমন হাঁ করে তাকিয়ে থাকলে কী করে হবে?’
একটু চমকে উঠে প্রসন্ন বলল, ‘এ কাদের বাড়ি, বাবা? এরা খুব বড়োলোক?’
গোপীমোহন ছেলের বিচিত্র প্রশ্নে হেসে ফেলে বললেন, ‘হ্যাঁ বাবা, খুব বড়োলোক। দাঁড়াও, আগে এই ভিড়ের মধ্যে সেই বড়োমানুষটিকে খুঁজে বের করতে হবে। সে এক কঠিন কাজ।’
তার অবশ্য প্রয়োজন হল না। হঠাৎই এই বহুমূল্য পোশাক পরা ঝলমলে মানুষজনের ভিড় ঠেলে সাধারণ ধুতি-চাদর পরা একজন প্রৌঢ় এসে দাঁড়ালেন গোপীমোহনের সামনে। মাথা নত করে বললেন, ‘প্রণাম, দেওয়ানজি। সংবাদ সব কুশল তো? এটি বুঝি...।’
‘আজ্ঞে আমার ছোটো ছেলে। প্রসন্নকুমার ঠাকুর।’ প্রতি-নমস্কার করে বললেন গোপীমোহন, ‘ঠাকুর দেখতে যাবে বলে বায়না ধরেছিল। বললুম, পুজোর ঘটা যদি দেখবি, তো চল, তোকে মোকাম কলকেতার সেরা পুজো দেখিয়ে নিয়ে আসি। দুলাল সরকারের বাড়ির পুজো।’
প্রসন্ন আন্দাজ করল, এই প্রৌঢ় সম্ভবত এই বাড়ির সরকার মশাই হবেন। তাদের বাড়িতেও এমন একজন আছেন।
পরক্ষণেই তাকে হতবাক করে দিয়ে গোপীমোহন বললেন, ‘প্রসন্ন, ইনিই হলেন তোমার সেই বড়োমানুষ। রামদুলাল দে সরকার। সরকার মশাই, এইমাত্র আমার ছেলেটি বলছিল, এই বাড়ির মালিক নিশ্চয়ই বেজায় বড়োমানুষ হবেন। দেখে নাও বাবা, ইনি এই মুহূর্তে কলকাতার সবচাইতে বড়ো মানুষ।’
হেসে উঠে রামদুলাল বললেন, ‘না বাবা, অর্থে কি আর বড়োমানুষ হয়? মানুষ বড়ো হয় জ্ঞানে। এই যেমন তোমার বাবা কত বড়ো বড়ো কাজ করছেন, কতগুলো ভাষা জানেন! আমার তো সম্বল বলতে এই বাংলা, আর খানিক ভাঙা ভাঙা ইংরেজি।’
গোপীমোহন যে ফরাসি কুঠির দেওয়ান এবং অনেকগুলি ভাষা জানেন, সেই কথা প্রসন্নর জানা আছে। কিন্তু এমন প্রাসাদতুল্য বাড়ির মালিক যে এমন সাদাসিধে হতে পারেন, সে কথা সে ভাবতেও পারেনি।
রামদুলাল কিন্তু গোপীমোহনের বদলে প্রসন্নর হাত ধরে বললেন, ‘এসো বাবা, তোমাকে ঠাকুরদালানটা ঘুরিয়ে দেখাই। ওরে কে আছিস, দেওয়ানজিকে নিয়ে গিয়ে বসা।’
প্রকাণ্ড ও অপরূপ ঠাকুরদালানটি দেখা শেষ করে প্রসন্নকে নিয়ে রামদুলাল উঠে এলেন উপরে। টানা বারান্দার মাঝামাঝি একটি শ্বেতপাথরের টেবিল। সেখানেই প্রসন্নকে বসিয়ে এক ভৃত্যকে ডেকে রামদুলাল বললেন, ‘খোকার প্রসাদ এখানেই নিয়ে আয় রে।’
প্রসন্ন নিজেও ধনীগৃহের সন্তান। কিন্তু এরকম অতুলনীয় বৈভব সে এর আগে দেখেনি বললেই হয়। বড়ো বড়ো চোখে চারদিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘এটা তো নতুন বাড়ি। আপনার আসল বাড়ি কোথায় ছিল? আপনার দেশের বাড়িও এত বড়ো?’
স্মিত মুখে মাথা নেড়ে রামদুলাল বললেন, ‘আমার পৈতৃক বাড়ি যে কোথায় ছিল, সেটুকুই জানি বাবা। ঠিক কোনটি আমাদের বাড়ি ছিল, তা আমি খুঁজে পাইনি।’
প্রসন্ন বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
রামদুলাল অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, ‘শুনেছি দমদমার কাছে রেকজানি গ্রামে আমাদের নিবাস ছিল। বর্গির হাঙ্গামার সময় আরও অনেকের সঙ্গে আমার মা-বাবাও পালিয়ে আসছিলেন। পথে আমার জন্ম হয়। পরে সেই গ্রামে আমি গিয়েছি। সেখানে কেউ মনে করতে পারেনি— আমার বাবা বলরাম দেবের বাড়িটা ঠিক কোথায় ছিল। এ-বাড়ি ও-বাড়ি বাংলা পড়িয়ে দু’চার পয়সা রোজগার করতেন— এমন মানুষকে কে মনে রাখবে বল? তাছাড়া আমি যখন একেবারে ছোটো, তখনই বাবা-মা দু’জনেই মারা গেলেন।’
এইবার একটু চমকে উঠে প্রসন্ন বলল, ‘আর আপনি?’
আজ যেন রামদুলালকে কথায় পেয়েছে। এই বাচ্চাটির কাছে আনমনে তাই নিজের জীবন-বৃত্তান্ত বলে চললেন তিনি।
‘আমি মানুষ হয়েছি আমার দাদু আর দিদার কাছে। দাদু ছিলেন ভিক্ষাজীবী। দিদা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান কুটতেন, মুড়ি ভাজতেন। অতি কষ্টে দিন চলত আমাদের।’
প্রসন্ন বলল, ‘তাহলে এইসব...।’
রামদুলাল বলতে লাগলেন, ‘তারপর হাটখোলার দত্তদের বাড়িতে দিদা রাঁধুনির কাজ পেলেন। সেই সূত্রে আমারও ঠাঁই হল সেই বাড়ির একতলার একটা অন্ধকার ঘরে। কিন্তু একটা সুবিধে হল। সব বড়োলোকের বাড়িতেই তো পাঠশালা চলে। আমার বয়স তখন বছর পাঁচেক। সেই পাঠশালায় গিয়ে বসে থাকতাম আমি। সেখানেই বাংলা লিখতে-পড়তে শিখলাম। দু-একটা ইংরেজি কথা শেখা হল। একটু বড়ো হওয়ার পর মদনমোহন দত্ত মশাই’— নামটা বলতে গিয়ে কপালে হাত ঠেকালেন রামদুলাল, ‘আমাকে তাঁর বিল-সরকার করে নিলেন। মাইনে ছিল পাঁচটি টাকা।’
‘মাত্র পাঁচ টাকা!’
‘তার আগে আমি কখনো একসঙ্গে পাঁচ টাকা চোখে দেখিনি বাবা। মন দিয়ে কাজ করতাম। ফাঁকি দিতাম না। কিছুদিন পর তাই দত্ত মশাই আমাকে শিপ-সরকার করে দিলেন। মাইনে বেড়ে হল দশ টাকা। মনে হল বড়োলোক হয়ে গিয়েছি।’
প্রসন্ন মুগ্ধ গলায় বলল, ‘তারপর?’
‘এ সময় একটা ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। একদিন নিলামওয়ালা টুল্লো কোম্পানির অফিসে ঝোঁকের মাথায় চোদ্দো হাজার টাকা দিয়ে একটা ডোবা জাহাজ কিনে ফেললাম আমি।’
প্রসন্ন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘যে জাহাজ ডুবে গিয়েছে, তা কিনলেন কেন? তুলে আবার ভাসানো হত বুঝি?’
সস্নেহে একটু হেসে রামদুলাল বললেন, ‘না না। আসলে জাহাজ ডুবে গেলে তো আর কেউ জানতে পারত না, তার মধ্যে কী থাকে। তখন মনগড়া একটা দাম দিয়ে সেটাকে কিনে নিতে হত। তারপর যদি তার মধ্যে দামি জিনিস থাকে, তাহলে তোমার লাভ। না থাকলে লোকসান!’
‘এ তো প্রায় জুয়া খেলা!’
‘তা বলতে পার। হতেই পারে, কেনার পর দেখা গেল সেই জাহাজে দু’হাজার টাকার মালও নেই। যাই হোক, চিন্তিত হয়ে বেরিয়ে আসছি। এমন সময় এক সাহেব এসে বললে, সে ওই জাহাজটা বেশি দামে কিনে নিতে চায়। তার মুখচোখ দেখেই আমার মনে হল, সে জানে— ওই জাহাজে দামি কিছু রয়েছে।’
‘তাই তো! না জানলে সে বেশি দাম দেবে কেন?’
‘আমিও সঙ্গে সঙ্গে বললাম, এক লাখ টাকার কমে ও জাহাজ আমি বিক্রি করব না।’
‘একেবারে এক লাখ!’
‘তার মুখ-চোখ দেখেই মনে হচ্ছিল, সে ভিতরের খবর সব নিয়েই এসেছে। সেটা পরীক্ষা করার জন্যই অমন বলেছিলুম।’ বললেন রামদুলাল।
‘অমনি সেই সাহেব রাজি হয়ে গেল?’
‘তাই কি হয় বাবা?’ মাথা নাড়িয়ে হাসলেন রামদুলাল, ‘এক কথায় কখনো ব্যবসা হয় না। বিস্তর দর কষাকষি হল। শেষে সাহেব পঁচানব্বই হাজারে রফা করে ফেলল।’
‘মানে আপনি রাজি হয়ে গেলেন?’
‘চোদ্দো হাজারে কিনেছি, পঁচানব্বই হাজারে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি। মুনাফা বুঝতে পারছ? রাজি হব না কেন?’
‘এই বাড়তি টাকাটা তো আপনার লাভ, তাই না?’
‘আমার কেন লাভ হবে? টাকা তো দত্ত মশাইয়ের! আমি তাঁর কর্মচারী মাত্র।’
‘ও হ্যাঁ, তাও তো বটে!’ প্রসন্নর ব্যাপারটা মনে ছিল না।
‘আমি সটান সেই টাকা নিয়ে ফিরে গেলুম হাটখোলায়। দত্ত মশাইয়ের হাতে টাকা তুলে দিয়ে সব কথা খুলে বললুম।’
‘তিনি তো নিশ্চয়ই বেজায় খুশি হলেন? কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এতগুলো টাকা লাভ হয়েছে তার!’
‘খুশি হলেন বইকি। কিন্তু তার চাইতেও বেশি অবাক হলেন। বললেন, ‘দুলাল! তোমার সত্যিকারের ব্যবসাবুদ্ধি আছে। আর তার চাইতেও বেশি আছে সততা, যা না থাকলে কখনো ব্যবসা হয় না।’ এই বলে পুরো টাকাটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘এ টাকা আমি তোমায় দিলাম। এই পুঁজি নিয়ে তুমি নিজের ব্যবসা শুরু কর।’ ভাবতে পার, কেমন মানুষ ছিলেন তিনি?’
‘পুরো পঁচানব্বই হাজার টাকাই তিনি আপনাকে দিয়ে দিলেন?’
‘সেজন্যই তো বলছিলাম বাবা, বড়ো মন না হলে কখনো বড়ো মানুষ হয় না। সেই টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করলুম আমি। এই আজ যা কিছু দেখছ, তার সবই সেইদিন শুরু হয়েছিল।’ বলে একটা নিঃশ্বাস ফেলে চারদিকে একবার তাকালেন রামদুলাল।
বালক হলেও প্রসন্নর বুঝতে অসুবিধা হল না— আজ তাকে এইসব স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে রামদুলালের মনে পড়ে গিয়েছে হাটখোলার দত্তদের বাড়ির সেই অন্ধকার একতলার ঘরটির কথা, যেখান থেকে একদিন তাঁর উত্থান শুরু হয়েছিল।
এমন সময় বছর চারেকের একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রামদুলালের পাশে এসে দাঁড়ালেন একজন মহিলা। চাপা গলায় বললেন, ‘বাবা, দেওয়ানজি নীচে অপেক্ষা করছেন।’
রামদুলাল ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘তাঁকে প্রসাদ দিয়েছিস তো মা? চল বাবা, অনেক গল্প হল। এবার নীচে যাওয়া যাক।’ তারপর প্রসন্ন কোলের শিশুটির দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে হাসিমুখে বললেন, ‘আমার বড়ো ছেলে, সাতু। ভালো নাম রেখেছি আশুতোষ।’
কী বলবে বুঝতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে প্রসন্ন বাচ্চাটির গালে হাত বুলিয়ে আদর করে দিল।
বাবার সঙ্গে গাড়িতে বসে পাথুরিয়াঘাটার দিকে ফিরে চলল প্রসন্ন। এখনও অপার বিস্ময় লেগে আছে তার চোখে।
‘জানো বাবা, সরকার মশাইয়ের দাদু ছিলেন ভিখারি। আর দিদা অন্যের বাড়িতে রান্না করতেন।’ প্রায় নিজের মনেই বলল প্রসন্ন।
‘জানি বাবা। এসব গোপন করেন না তিনি,’ মৃদু গলায় বললেন গোপীমোহন, ‘একেবারে নিজের চেষ্টায়, নিজের বুদ্ধিতে আজ রামদুলাল দে সরকার কলকাতার প্রথম কোটিপতি।’
প্রসন্ন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল গোপীমোহনের দিকে। ইনি একজন কোটিপতি!
‘পৈতৃক সূত্রে বড়োলোক কলকাতায় অনেক আছে। ইনি তাঁদের থেকে একদম আলাদা প্রসন্ন,’ বললেন গোপীমোহন, ‘তুমি যখন উপরে বসে মিষ্টি খাচ্ছিলে, তখন একটা আশ্চর্য খবর এসে পৌঁছল,জানো?’
‘কী খবর, বাবা?’ জিজ্ঞাসা করল প্রসন্ন।
‘‘সরকার মশাইয়ের অধিকাংশ ব্যবসা চলে আমেরিকানদের সঙ্গে। তারা একটি জাহাজের নামকরণ করেছে তাঁর নামে। ‘রামদুলাল’। এক ইতিহাস তৈরি হল আজ।’’
‘কতখানি শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারলে এমন সম্মান লাভ করা যায়!’ নিজের মনেই ভাবল প্রসন্ন।
রামদুলালের তুলনায় সে অনেক সৌভাগ্যবান। কলকাতার অন্যতম প্রধান বর্ধিষ্ণু পরিবারে তার জন্ম হয়েছে। কিন্তু আজ এই বালক বয়সেই প্রসন্ন একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে।
সম্মান জিনিসটা নিজে অর্জন করতে হয়। কেবল সফল পিতার পুত্র হয়ে সে বেঁচে থাকবে না। একদিন সে-ও নিজের গুণেই মাথা তুলে দাঁড়াবে।
ঠিক এই রামদুলাল দে সরকারের মতো।