


অনির্বাণ রক্ষিত: ছোট্ট বন্ধুরা, আন্টার্কটিকা নামটা শুনলেই তোমাদের চোখের সামনে কী কী ভেসে ওঠে? চারদিকে শুধু মাইলের পর মাইল সাদা বরফ, কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর পেঙ্গুইন। আমেরিকার চেয়ে প্রায় চার গুণ বড়ো এই বিশাল মহাদেশটি মাইলের পর মাইল পুরু বরফের চাদরে ঢাকা।
কিন্তু তোমরা জানলে অবাক হবে, আন্টার্কটিকা কিন্তু সব সময় এমন বরফে ঢাকা ছিল না! একসময় এখানেও সবুজের সমারোহ ছিল। তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই বিশাল মহাদেশটি শেষ কবে বরফমুক্ত ছিল? চল, আজ জেনে নেওয়া যাক কুমেরুর কয়েক কোটি বছর আগের ইতিহাস।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিদ এরিক উলফের মতে, আজ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে আন্টার্কটিকাতে বরফের চাদর তৈরি হতে শুরু করে। এর আগে আন্টার্কটিকা কেমন ছিল জানো? আজকের উত্তর কানাডার মতো। সেটি ছিল তুন্দ্রা অঞ্চলের মতো। কুমেরু ছিল পাইন জাতীয় গাছে ভর্তি।
হঠাৎ কীভাবে এত ঠান্ডা হল আন্টার্কটিকা?
আজ থেকে প্রায় ৫ কোটি বছর আগে পৃথিবী আজকের চেয়ে প্রায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উত্তপ্ত ছিল। আজ থেকে ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে তাপমাত্রা কমতে কমতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছয়, যা আজকের চেয়ে মাত্র ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
কিন্তু হঠাৎ তাপমাত্রা এভাবে কমতে শুরু করল কেন? আর তাতেই কি পুরো মহাদেশ বরফে ঢাকা পড়ে গেল? এর উত্তরে এরিক উলফ বলছেন, এর পেছনে মূলত দু’টি বড়ো কারণ ছিল।
প্রথম কারণ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড কমে যাওয়া। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রচুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছিল। যা আজকের তুলনায় আড়াই থেকে পাঁচ গুণ বেশি। কার্বন-ডাই-অক্সাইড পৃথিবীর তাপমাত্রা ধরে রাখে। কিন্তু ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে হঠাৎ করেই বাতাসে এই গ্যাসের পরিমাণ অনেক কমে যায়। ফলে পৃথিবীও ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে শুরু করে এবং বরফ জমার জন্য একদম উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়।
দ্বিতীয় কারণটি হল ভৌগোলিক। সেই সময় বেশ কিছু টেকটনিক প্লেট সরে যাওয়ার ফলে দক্ষিণ আমেরিকা ও আন্টার্কটিকা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই দুই মহাদেশের মাঝখানে তৈরি হয় এক বিশাল সমুদ্রপথ, যাকে আজ আমরা ড্রেক প্যাসেজ বলি। এই পথটি তৈরি হওয়ার ফলে আন্টার্কটিকার চারপাশ ঘিরে সাগরের জলের এক বিশাল ঘূর্ণন তৈরি হয়, যাকে বলা হয় সার্কামপোলার কারেন্ট। এই স্রোতটি আন্টার্কটিকাকে পুরো পৃথিবীর উষ্ণ সমুদ্র স্রোত থেকে একদম আলাদা করে রেখেছে। ফলে গরম বাতাস আর সেখানে ঢুকতে পারে না। আন্টার্কটিকা হয়ে ওঠে বিশাল আইসবক্স!
এতকিছুর পর তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, বিজ্ঞানীরা এতকিছু জানলেন কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রের তলদেশে প্রাণীদের জীবাশ্মে। অক্সিজেনের সাধারণত দু’টি রূপ আছে। একটি হল—সাধারণ অক্সিজেন (অক্সিজেন-১৬) এবং অপরটি ভারী অক্সিজেন (অক্সিজেন-১৮)। পৃথিবীতে যখন প্রচুর বরফ জমতে থাকে, তখন সাধারণ ও হালকা অক্সিজেন বেশি পরিমাণে বরফের ভেতর আটকা পড়ে যায়। ফলে সাগরের জলে ভারী অক্সিজেন-১৮-এর পরিমাণ যায় বেড়ে। সাগরের ছোটো ছোটো প্রাণী যখন তাদের খোলস বানায়, তখন সেই খোলসের ভেতর এই ভারী অক্সিজেন ঢুকে যায়। বিজ্ঞানীরা যখন কোটি কোটি বছর আগের সমুদ্রের প্রাণীদের জীবাশ্ম পরীক্ষা করেন তখন তাঁরা দেখতে পান সেই খোলসগুলিতে ভারী অক্সিজেনের পরিমাণ হঠাৎ করে বেড়ে যায়। আর এর থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়, আন্টার্কটিকায় বিশাল বরফের চাদর তৈরি হয়েছিল।