


অমিয়কুমার বিশ্বাস, শান্তিপুর: বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র শান্তিপুর আজ গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলের তন্তুবায়দের হাতে বোনা শাড়ি ও কাপড় শুধু রাজ্য নয়, দেশ-বিদেশেও সুনাম কুড়িয়েছে। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গৌরব আজ অনেকটাই ম্লান। ক্রমশ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই শিল্পকে ঘিরেই এখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ঝড়। নির্বাচনের আগে তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবনের আশ্বাসে সরব সব পক্ষই।
এক সময় শান্তিপুরের প্রায় প্রতিটি ঘরেই শোনা যেত তাঁতযন্ত্রের খুটখাট শব্দ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত সুতো কাটা, কাপড় বোনা। হাজার হাজার পরিবার যুক্ত ছিল এই পেশার সঙ্গে। পর্যাপ্ত অর্ডার, সঠিক মজুরি এবং দক্ষ কারিগরদের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী অর্থনীতি। কিন্তু বর্তমানে ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মজুরি কমে যাওয়া, কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বাজারে অর্ডারের ঘাটতি এবং দক্ষ শিল্পীর অভাবে শতাব্দী প্রাচীন এই শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে। একের পর এক তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার অন্য পেশায় চলে গিয়েছে। হাতে বোনা হ্যান্ডলুমের জায়গা দখল করেছে পাওয়ারলুম। এখন মানুষ সস্তার পোশাকের দিকে ঝুঁকছে। ফলে এখানকার তাঁতশিল্পীরা প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারছেন না।
স্থানীয় তাঁত শিল্পীরা বলেন, আগে কাজের অভাব ছিল না। দামও ভাল পাওয়া যেত। আর এখন সংসারই ঠিকমতো চলে না। বহু তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হ্যান্ডলুমের বদলে পাওয়ারলুম চলে আসায় কাজ হারিয়েছেন তাঁতশিল্পীরা। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন। এখন দক্ষ শিল্পীর অভাবে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তাঁতশিল্প। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে না দেখলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখায় দুস্কর।
এনিয়ে শান্তিপুরের তৃণমূল প্রার্থী ব্রজকিশোর গোস্বামী বলেন, বর্তমানে তাঁতশিল্পের প্রভাব ও প্রসার অনেকটা নিম্নমুখী। এর অন্যতম বড় কারণ পরবর্তী প্রজন্ম এই শিল্প নিয়ে আগ্রহী নয়। বহু তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শান্তিপুরে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। তাঁতশিল্পীদের সঙ্গে আলোচনার করে কিভাবে এই শিল্পের উন্নতি করা যায়, তা করা হবে।
বিজেপি প্রার্থী স্বপনকুমার দাস বলেন, পরিকল্পনার মাধ্যমে এই শিল্পের উন্নয়ন করতে হবে। সিপিএম প্রার্থী সৌমেন মাহাত বলেন, কেন্দ্র বা রাজ্য কোন সরকারই তাঁতশিল্প রক্ষায় উদ্যোগী হয়নি। আমরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাই।
কংগ্রেস প্রার্থী অলোক চট্টোপাধ্যায় বলেন, শান্তিপুরের তাঁতশিল্পই ছিল এলাকার অর্থনীতির মূল ভিত্তি। বর্তমানে তাঁতশিল্প ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে। তাঁতশিল্পকে বাঁচাতে না পারলে শান্তিপুরের অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়বে।
প্রবীণ তাঁতশিল্পী অমল বসাক বলেন, তাঁতশিল্পের পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। এখন অর্ডারই আসে না। ভোটের সময় নানা প্রতিশ্রুতি দেয় উন্নতি কিছু হয় না। আর এক তাঁতশিল্পী রাজু বসাক বলেন, এখন দক্ষ তাঁতশিল্পীই নেই। একটা শাড়ি বুনতে দু’দিন লেগে যায়। শাড়ি প্রতি ৫০০ টাকা মজুরি দেয়। এভাবে চলা খুব কঠিন।