


নিজস্ব প্রতিনিধি, শিলিগুড়ি ও কলকাতা: আন্তর্জাতিক সাঁওতালি কাউন্সিলের নবম সম্মেলনে শিলিগুড়ির সভাস্থল ঘিরে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘আক্ষেপ’, মুখ্যমন্ত্রীর পালটা ‘জবাব’ সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘নিন্দা’কে ঘিরে তুমুল রাজনৈতিক আলোড়ন শুরু হয়েছে। শনিবার ওই সম্মেলন শুরু হয়েছে বাগডোগরার গোঁসাইপুরে। সম্মেলনস্থলের জন্য প্রথমে নির্ধারিত হয়েছিল বিধাননগরের সন্তোষিনী বিদ্যাচক্রের মাঠ। আয়োজনে খামতিকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের অনুরোধে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে সভাস্থল পরিবর্তনে সবুজ সংকেত দেওয়া হয় বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। সভার জন্য নির্ধারিত হয় গোঁসাইপুরে। এদিন সেখানে পৌঁছে সভাস্থলে জমায়েত দেখে উষ্মা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। বলেন, ‘সভা দেখে মনে হচ্ছে না, এটা কোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলন!’ তাঁর অভিযোগ, ‘আদিবাসীদের বাধা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কেউ কেউ চাইছেন না, সাঁওতালিরা এক হোক, শিক্ষিত হোক। আমাদের মধ্যে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ চালানোর চেষ্টা করছে।’
এরপরই রাজ্যকে নিশানায় বিঁধে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘একলব্য স্কুল, মডেল স্কুল সহ বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা এখানকার মানুষ পাচ্ছেন না বলে মনে হচ্ছে। আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে! এবার আদিবাসীদের জাগ্রত হতে হবে।’ রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা ক্ষুন্ন এবং তাঁকে অপমান করা হয়েছে বলে এক্স-হ্যান্ডলে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নিন্দায় সরব হয়ে পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য। মোদি জানিয়েছেন, ‘এই ঘটনার জন্য বাংলার প্রশাসন দায়ী। সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে গিয়েছে তৃণমূল সরকার।’ রাষ্ট্রপতির অভিযোগ নিয়ে পালটা জবাব দেন মমতাও। বলেন, ‘সম্মানীয় রাষ্ট্রপতিকে ‘ফাঁদে’ ফেলে নিজেদের এজেন্ডা বেচতে পাঠিয়েছে বিজেপি।’ এমনকি রাষ্ট্রপতির সভার আয়োজন নিয়ে আয়োজকদের তরফে যে খামতি ছিল, সেব্যাপারে রাজ্যের তরফে রাষ্ট্রপতি ভবনকে জানানোর বিষয়টিও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন মমতা। বিজেপির এই রাজনীতির সমালোচনা করেন কংগ্রেস নেত্রী অলকা লাম্বাও।
পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচিতে ধরনায় রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিনও গোটা দিন ধরনাস্থলেই ছিলেন তিনি। কিন্তু শিলিগুড়ির সভাস্থলে পৌঁছে ‘প্রোটোকল’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দেশের প্রথম নাগরিক। নিজের উষ্মা ব্যক্ত করার এই পর্বে রাষ্ট্রপতি ‘ছোট বোন’ বলে সম্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রীকে। বলেন, ‘সাধারণত রাষ্ট্রপতি এলে মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের মন্ত্রী ও রাজ্যপালের থাকার কথা। এখানে এখন রাজ্যপাল বদল হয়েছে। এর বাইরে মুখ্যমন্ত্রী আসতে পারতেন। আমার ছোট বোন মমতা হয়তো কোনো বিষয়ে রাগ করেছেন। তাহলে আমিও কিছু মনে করছি না। সকলে ভালো থাকবেন।’ সন্ধ্যায় ধর্মতলার ধরনা মঞ্চ থেকে জবাব দেন মমতা। বলেন, ‘কাদের সম্মেলন, কারা আয়োজক, কারা অর্থ জোগাচ্ছে, কিছুই জানি না। শুধু রাষ্ট্রপতি আসছেন, সেটা জানতাম। ’ দৃশ্যত ক্ষুব্ধ মমতা বলেন,‘এ রাজ্যে শুধু সাঁওতাল কেন, অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষের জন্য আমরা কী কী করেছি, সে খবর আপনি রাখেন না। এ রাজ্যে সাঁওতাল ভাষায় ডব্লুবিসিএস পরীক্ষা দেওয়া যায়। অলচিকি হরফে পড়াশোনার জন্য স্কুল হয়েছে, হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ও। এখানে দীর্ঘদিন ধরে বিনামূল্যে রেশন পান সাঁওতাল সহ সব আদিবাসীরা। এখবর বোধহয় আপনি (রাষ্ট্রপতি) রাখেন না।’ ক্ষুব্ধ মমতা আরও বলেন, ‘মাননীয়া, রাজনীতি আপনার সাজে না! মণিপুর, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে যখন আদিবাসীদের উপর আক্রমণ নেমে আসে, তখন তো যান না সেখানে! দয়া করে নির্বাচনের আগে বিজেপির পরামর্শে রাজনীতি করবেন না।’ এসআইআর প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এসআইআরে কতজন আদিবাসীর নাম বাদ দিয়ে তাঁদের ‘হক’ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সেটা জানেন! সেটা নিয়ে তো বললেন না!’ মমতার কথায়, ‘আপনি সমালোচনা করুন। কিন্তু আমাদের তা সাজে না। শুধু প্রকৃত তথ্য তুলে ধরব। বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষায় আন্দোলন চলছে, ধরনায় বসেছি। সভায় যাব কী করে!’
ধর্মতলায় শনিবার তোলা নিজস্ব চিত্র।