


সংবাদদাতা, রামপুরহাট: সোশ্যাল মিডিয়া এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সেখানেই সম্পর্ক গড়ার হাতছানি। সামান্য কয়েকদিনের ভার্চুয়াল আলাপে প্রেম, লোভনীয় প্রস্তাব। তাতেই বাড়ি বাবা-মায়ের ভালোবাসা, পড়াশোনা ছেড়ে ঘর ছাড়ছে নাবালিকারা। চলতি আর্থিক বছরে গত চারমাসে বীরভূমে ১৭০ জন নাবালিকা নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। এদের কেউ ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়া। কেউ আবার নবম শ্রেণিতে পড়ে। অধিকাংশই সংসার গড়ার স্বপ্নে পলাতক। অল্প বয়সে সংসারের ভার সামলাতে না পেরে মানসিক অবসাদ থেকে আত্মহত্যাও করছে কেউ কেউ। বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে এমনই তথ্য পাচ্ছে প্রশাসন। তাতে উদ্বেগ বাড়ছে সব মহলেই।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত আর্থিক বছরে বীরভূমের বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে ১১৬ জন নাবালিকা নিখোঁজ হয়। এখনও পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে ৯৫ জনকে। আবার ওই বছর নাবালিকা কিডন্যাপিং হয়েছিল ২৬৪ জন। এখনও পর্যন্ত ২১৮ জন নাবালিকাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিস। চলতি আর্থিক বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত কিডন্যাপিং হয়েছে ১২৮ জন নাবালিকা। উদ্ধার করা গিয়েছে ৯৭ জনকে। একইভাবে নিখোঁজ হয়েছে ৫২ জন। যাদের মধ্যে ৩৭ জনকে উদ্ধার করেছে পুলিস। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমের সম্পর্কের তত্ত্ব উঠে আসছে। চিন্তিত অভিভাবকরা। প্রশাসন সূত্রে খবর, প্রতিটি ক্ষেত্রে যে থানায় অভিযোগ দায়ের হচ্ছে তা নয়। সব অভিযোগ থানায় এলে এই পরিসংখ্যান আরও বাড়বে। প্রশাসনের এক আধিকারিকের বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনায় অভিভাবকরাই পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে চুপচাপ থেকে যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা কেউ অষ্টম আবার কেউ বা নবম বা দশম শ্রেণিতে পড়ছে। সকলের হাতেই এখন স্মার্ট ফোন। রিলস তৈরির নেশা। আর পড়াশোনা চলাকালীনই সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও না কোনও বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে তারা।
মঙ্গলবার ময়ূরেশ্বর থানার পুলিস তিনজন নাবালিকাকে উদ্ধার করে। যাদের কেউ একমাস, কেউ পনেরোদিন আগে নিখোঁজ হয়ে যায়। পুলিসের দাবি, স্কুল যাওয়ার পথেই তারা যুবকদের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। কোনও ক্ষেত্রে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে ফুসলিয়ে নাবালিকাদের নিয়ে চলে যাচ্ছে। যাদের অনেকের এখনও পর্যন্ত হদিশই পায়নি প্রশাসন। আবার পালিয়ে যাওয়া নাবালিকাদের কেউ কেউ মানসিক অবসাদ থেকে আত্মহত্যাও করছে। চারমাস আগে নলহাটির উজিরপুর গ্রামের বছর পনোরোর নাবালিকা এক যুবকের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। বিয়েও করে। এরই মধ্যে মানসিক অবসাদ থেকে সোমবার সন্ধ্যায় গলায় দড়ি জড়িয়ে আত্মহত্যা করে। পুলিস জানিয়েছে, স্কুলগুলিতে নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। নাবালিকা বিবাহ থেকে নারী পাচার, গুড টাচ ও ব্যাড টাচের মতো বিষয়গুলি বোঝানো হচ্ছে। তারপরেও এধরনের ঘটনা কমছে না। এক্ষেত্রে মূল ‘ভিলেন’-এর ভূমিকা পালন করছে সোশ্যাল মিডিয়া।
জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক নিরুপম সিনহা বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে ভালোবাসার টানে পালিয়ে যাচ্ছে নাবালিকারা। কিডন্যাপও হচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে দারিদ্রতার কারণও রয়েছে। এব্যাপারে আরও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। অভিভাবকদের আরও সজাগ থাকতে হবে এবং বাচ্চাদের স্কুলমুখী করে তুলতে হবে।’ কুসুম্বা হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক সন্দীপ মণ্ডল বলেন, ‘এধরনের ঘটনা যথেষ্ট উদ্বেগের। বিশেষ করে অল্পবয়সি মেয়েদের সোশ্যাল মিডিয়ায় বিখ্যাত হওয়ার তাগিদ এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তারা বুঝতেই চাইছে না কোনটি তাদের জন্য ভালো আর কোনটি খারাপ।’ তাঁর পরামর্শ, এক্ষেত্রে মেয়েদের পড়াশোনার বাইরে গান, যোগব্যায়াম, অঙ্কন চর্চার মতো বিষয়গুলিকে যুক্ত করতে হবে। যাতে তাদের মনের মধ্যে সুস্থ বিষয় ঘোরাফেরা করে।