


দ্বারকানাথের আমলে ঠাকুরবাড়িতে পয়লা বৈশাখে বিশাল আয়োজন হত। রবীন্দ্রনাথের শেষ নববর্ষ কেমন কেটেছিল, জানালেন অরিন্দম ঘোষাল।
একসময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণ অনুষ্ঠিত হত। তার মধ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুরের দুর্গোৎসব স্মরণীয় হয়ে আছে। আরও একটি বড়ো উৎসব হল পয়লা বৈশাখের উৎসব।
দ্বারকানাথের সময় থেকেই হালখাতা উৎসব জাঁকজমক সহকারে পালন করা হত। কেন? দ্বারকানাথ ছিলেন একাধারে জমিদার, পাশাপাশি তাঁর ব্যাংক, বিমা, জাহাজ সহ আরও অনেক ব্যবসা ছিল। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ ও ইংরেজ ব্যবসায়ী উইলিয়াম কার ১৮৩৪ সালে ‘কার-টেগর অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে একটি বাণিজ্যিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘রবীন্দ্র কথা’ গ্রন্থে দ্বারকানাথের আমলে ঠাকুরবাড়ির নববর্ষের অনুষ্ঠানের বর্ণনা রয়েছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘দ্বারিকানাথ (দ্বারকানাথ) ঠাকুরের সময় প্রতি বৎসর বাংলা সালের প্রারম্ভে ১লা বৈশাখ তারিখে গৃহদেবতা শ্রীশ্রীলক্ষ্মীজনার্দনের বিশেষ পূজা করিয়া খাতা মোহরাঙ্কিত করা হইত। বাংলাদেশের সকল জমিদারের মফঃস্বলে নূতন খাতা প্রবর্তনে ভিন্ন ভিন্ন দিন নির্দিষ্ট হয়। তাহা পুণ্যাহ নামে অভিহিত হয়।’ যেহেতু দ্বারকানাথের সদর কাছারি অর্থাৎ প্রধান কার্যালয় কলকাতায় ছিল, তাই সেখানে উৎসবের জাঁকজমক ছিল অনেক বেশি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রয়াত হন ১৯৪১ সালে। অর্থাৎ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ। সে বছর পয়লা বৈশাখ শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছিলেন তিনি। সেখানে উদ্যাপন করা হয় তাঁর আশি বছরের জন্মদিন। তখন তিনি বেশ অসুস্থ। সেবার নববর্ষের আগে রবি ঠাকুরের কাছে নতুন একটি গান চাওয়া হয়। প্রথমে তিনি আপত্তি করেন। পরে তিনি একটি কবিতা লিখে দেন এবং তাতে সুরারোপ করেন। কবিতাটি হল— ‘ওই মহামানব আসে। / দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে / মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে।।’
১৩৪৮ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের শেষ জন্মদিন কেমনভাবে পালন হয়েছিল? সেদিন ভোরে আশ্রমিকরা বৈতালিক গেয়ে শান্তিনিকেতন পরিক্রমা করেন। সকালে ক্ষিতিমোহন সেনের পরিচালনায় মন্দিরে নববর্ষের উপাসনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গাওয়া হয় দু’খানি গান— ‘হে পুরুষোত্তম’ ও ‘ওই
মহামানব আসে’। আর সেদিন সন্ধ্যায় কবির অনুমতি নিয়ে তাঁর জন্মোৎসব পালন করা হয়।
এই উপলক্ষ্যে উদয়নে একটি মণ্ডপ তৈরি করা হয়। সেখানে রবি ঠাকুরের জন্মদিনের বার্তা ‘সভ্যতার সংকট’ পাঠ করেন ক্ষিতিমোহন সেন। কবি অসুস্থ থাকায় নিজে পাঠ করতে পারেননি। যাইহোক, শুধু ওই বছরই নয়, এর আগে থেকেই পয়লা বৈশাখ শান্তিনিকেতনে কবির জন্মদিন পালন হয়ে আসছে। কবির শেষ জন্মদিনের বিষয়ে রানি চন্দ তাঁর ‘আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আজ নববর্ষ। এবার ১লা বৈশাখেই গুরুদেবের জন্মোৎসব হবে— আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছিল। ভোরবেলা কচি শাল পাতার ঠোঙায় কিছু বেল, জুঁই, কামিনী তুলে উদয়নের দক্ষিণের বারান্দায় গুরুদেবের হাতে দিয়ে তাঁকে প্রণাম করলুম। আজ অনেক আগে থেকেই গুরুদেব বারান্দায় এসে বসেছেন। ফুলের ঠোঙাটি হাতে নিয়ে তা থেকে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ধীরে ধীরে বললেন, আজ আমার জীবনের আশি বছর পূর্ণ হোলো। আজ দেখছি পিছন ফিরে— কত বোঝা যে জমা হয়েছে; বোঝা বেড়েই চলেছে।’