


সৈকত নিয়োগী: ‘নমস্কার স্যার! আমি নেতাজির মহানিষ্ক্রমণের সময়ে সোভিয়েতে ট্রান্সজিট ভিসা পাওয়ার ব্যাপারে আপনার কাছে কিছু জানতে চাই। আমি আপনার রিপোর্ট এবং আনুষঙ্গিক ফাইলপত্র পড়েছি। আপনি রাশিয়ায় তদন্ত...’
‘নেতাজির বিষয়ে আমি কথা বলি না!’
প্রায় অশীতিপর মানুষটি একরকম মুখের উপর ফোন রেখে দিলেন। সপ্তাহখানেক পরেও পুনরাবৃত্তি। তারপর থেকে তো নাম শুনেই ফোন রেখে দিতেন। তখন অগতির গতি অফিসের পরিত্যক্ত মিটিং রুমের ভি-নেট ফোন। রুমটার নাম ‘টেগোর’। কবিগুরুই সহায় হলেন। ফোনের নম্বর বোঝা যায় না, তাই রক্ষে।
‘স্যার প্লিজ, নেতাজি নিয়ে কোনও কথা বলতে চাই না। রাশিয়া নিয়ে একটা বই লিখছি। প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে...’
‘তুমি যদি নেতাজি নিয়ে না-ই জানতে চাও, আমাকে কেন ফোন করছো?’
মাস সাতেকের তপস্যা। এভাবে সিদ্ধি লাভ হবে ভাবিনি। ‘হ্যাঁ স্যার নেতাজির ব্যাপারেই... রাশিয়াতে আপনি...’
‘আগামী শনিবার সকাল দশটায় আসতে পার।’
মুখার্জি কমিশন যখন মধ্যগগনে, তখন হুমড়ি খেয়ে দাদুর পাশে বসে ‘বর্তমান’ হাতড়ে কমিশনের খবর পড়তাম। কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস দিতে অনীহা, রাজ্য সরকারের ভ্রান্ত হলফনামার শেষে সাতাত্তরটা ফাইল পেল কমিশন—খবরে নেতাজির খোঁজে আগুন ধরিয়েছেন পবিত্র কুমার ঘোষ, বরণ সেনগুপ্ত! গণমাধ্যমে প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। নেতাজির লেখা, বক্তৃতা, সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ—দাদুর পরামর্শমতো আত্মস্থ করতাম। সেই প্রথম নেহরু পরিবারের রক্তচক্ষু এড়িয়ে নেতাজির সন্ধানে নিরপেক্ষ তদন্ত—মুখার্জি কমিশন চলছে! সেই কমিশনের চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মনোজ মুখার্জির সল্টলেকের জি ডি ব্লকের বাসভবনে যেতে অনুমতি পেয়ে প্রথম দিন আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমরা যাঁরা নেতাজির অনুগামী, এই কমিশন তাঁদের কাছে সত্যানুসন্ধানের দৃষ্টান্ত।
‘রাশিয়া নিয়ে তদন্ত এগনোর ইচ্ছে ছিল। অর্থের অভাবে আর হল না।’
তখন ২০১৮ সাল। নেতাজি ফাইল প্রকাশ যজ্ঞে সংবাদপত্র কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু জাস্টিস সাহেবের মন ভারাক্রান্ত।
‘এভাবে কিছু হবে না। সরকারের উচিত আমার রিপোর্ট সংসদে গ্রহণ করা।’
২০০৫ সালে তিনি তদন্ত রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছিলেন, বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু ঘটেনি। তারপর দিল্লির জনপথে এসেছে জওহর কোটের দল। অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শিবরাজ পাতিল ‘অ্যাকশন টেকেন’-এর নামে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলেছে মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট। নেতাজির পরিবারের তরফে সুব্রত বসুর আক্ষেপ সংসদে আর্তনাদের মতো শুনিয়েছে। কালের নিয়মে ফিরেছে অ-কংগ্রেসি দল। তবে দিল্লি যেন রাবণের লঙ্কারাজ্য। লঙ্কাকাণ্ড ঘটানোর মতো বীর হনুমানের খোঁজ মেলেনি। তাই কংগ্রেস বিরোধিতায় অস্ত্র হয়ে ওঠা ছাড়া নেতাজি নথি প্রকাশ যজ্ঞে সত্য প্রকাশ হয়েছে সীমাবদ্ধতায়।
‘স্যার, নেতাজি অনুরাগী প্রবাসী অনেক বন্ধু রয়েছে আমার। বিদেশের আর্কাইভগুলিতে তল্লাশি চালালে অনেক কিছু পাওয়া সম্ভব। শুধুমাত্র রহস্য নয়, নেতাজির আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রসঙ্গেও ইতিহাসের অনেকটাই আমরা এখনও জানি না। সরকারি উদ্যোগে আজাদ হিন্দের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আজও লেখা হয়নি।’ কথাগুলি শুনে নেতাজি অন্তপ্রাণ সেই অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষটির চোখে সেদিন এক দীপ্তি দেখেছিলাম। কমিশনের পেপার ঘেঁটে রাশিয়ার এগারোটা আর্কাইভের নামের তালিকা নিয়ে গিয়েছিলাম। যদি কোনও সূত্র পাই।
‘রাশিয়াতে কিছু পাওয়া কঠিন। বরং লন্ডনে খোঁজ করে দেখ।’
বিশ্বজুড়ে ভারত নিয়ে যেখানে যা হয়, ব্রিটেন তা প্রতিলিপি এবং অনুবাদ সহ সংগ্রহ করে। নামেই স্বাধীনতা, আসলে ক্ষমতা হস্তান্তর। লন্ডনের আর্কাইভগুলি তারই প্রমাণ দেয়। ২০০১ সালের ১৪ জুন। ‘বর্তমান’ সংবাদপত্রে শিরোনাম ‘নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য: নথি খুঁজতে লন্ডন যাবে কমিশন’। মহাজাতি সদনে অ্যানেক্স হলে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষে প্রাক্তন বিচারপতি তথা কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছিলেন, ‘আগামী ৭ জুলাই এই অন্তর্ধান রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা লন্ডনে যাচ্ছি।’ সেখানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে। সেই বছরেই ২৩ আগস্ট মুখার্জি কমিশনের চেয়ারম্যানের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, সাতশোর বেশি নেতাজি সংক্রান্ত গোয়েন্দা রিপোর্ট গ্রেট ব্রিটেনের সিন্দুকে রয়েছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাহায্যে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার চেষ্টা করলেন মনোজবাবু।
‘আমরা ৭৭৪টি ফাইল দেখতে চেয়েছি। কেবলমাত্র ইংল্যান্ডের লর্ড চ্যান্সেলার আমাদের সেই অধিকার দিতে পারেন।’ একথা বলার পাশাপাশি তিনি লন্ডনে হাউজ অব লর্ডসের সদস্য পিটার আর্চারকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন চ্যান্সেলারের কাছে দ্রুত বিষয়টি উত্থাপনের জন্য। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মনোজবাবু জানিয়েছিলেন, লন্ডনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ মহাফেজখানা, বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আর্কাইভে ছড়িয়ে রয়েছে নেতাজি সংক্রান্ত নথি। বলেছিলেন কমিশনের সীমাবদ্ধতার কথাও। প্রবাসী নেতাজি অনুরাগীদের নিয়ে গবেষণা দল গঠনের পরিকল্পনা শুনে খুশি হয়ে জানিয়েছিলেন, ‘এটাই একমাত্র পথ।’ তখনই জেনেছিলাম, সাউথহ্যাম্পটনের হার্টলে লাইব্রেরিতে ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ক্লিমেন্ট অ্যাটলির পত্রালাপ সংরক্ষিত রয়েছে। নেতাজি প্রসঙ্গে সেই আলোচনা বেশ তথ্যবহুল।
বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি—এই সিদ্ধান্তে মনোজবাবু উপনীত হয়েছিলেন যে সমস্ত তথ্যাদির উপর নির্ভর করে, তার অন্যতম প্রধান ‘তাইওয়ান রিপোর্ট’। ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার নিযুক্ত শাহনওয়াজ কমিটি নেতাজি রহস্য ভেদ করতে তথাকথিত দুর্ঘটনাস্থল তাইহোকু বিমানবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট স্থানগুলিতে যেতে উদ্যত হন। ঠিক তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অফিস। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মেঘনাদের মতো আজব এক দপ্তর। এদের দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। কিন্তু এরা আছে। ভারতের মতো দেশে ঔপনিবেশিক শাসনকে নবরূপায়ণে লুকিয়ে রাখতে।
১৯৫৬ সাল। সিক্রেট সাইফার টেলিগ্রামে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অফিসের মাধ্যমে তাইওয়ান সরকারের তদন্ত রিপোর্ট ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু জানতেন, সেই তদন্তের রিপোর্টে বিমান দুর্ঘটনার কোনো প্রমাণ নেই। তবে শুধু নেহরু নন, দায় বর্তায় পরবর্তীকালের প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীর উপর, যাঁরা নেতাজির মৃত্যু তদন্ত নিয়ে নিরুত্তাপ ছিলেন। বিমান দুর্ঘটনার এমন নিখুঁত পরিকল্পনা যে দেশনায়কেরই মস্তিষ্কপ্রসূত, তাতে সংশয় থাকে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম লগ্ন, তাইওয়ানে চীনের কুয়োমিনতাং আর্মির সমরাধিনায়ক চিয়াং কাই শেকের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে তখনও মাসখানেক দেরি। হিরোশিমা-নাগাসাকির পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের পরে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন স্তব্ধ। তাইওয়ানে প্রশাসনিক দপ্তর ছিল তামসুই শহরে। প্রশাসনের নামে তখন চলছে অরাজকতা। সেই সময়কে মোক্ষমভাবে ব্যবহার করলেন নেতাজি, ঐতিহাসিক অন্তর্ধানের মধ্যে দিয়ে। আজাদ হিন্দের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে মিত্রশক্তির শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে অবাক করা সেই দুর্ঘটনা, যা প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়ে যায় রাজনীতি ও ক্ষমতার অলিন্দে।
‘নেতাজি জীবিত! চীনেই কোথাও আত্মগোপন করে রয়েছেন। ১৯৫০ সালে তাঁর সঙ্গে আমি প্রায় ৯ মাস ছিলাম!’ নেতাজি অন্তপ্রাণ সহযোদ্ধা মুত্থুরামালিঙ্গম থেবরের এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র দেশে। সেদিন ১৯৫৬ সালের ৩ এপ্রিল। ‘এই বছর ফেব্রুয়ারিতেই আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এখনও যোগসূত্র বর্তমান।’ পরের দিনই লিডারের কাছ থেকে কোডেড বার্তা পেলেন শার্দূল সিং কবীশ্বর। ঠিক যেমনটা পেতেন বিশ্বযুদ্ধের সময়, হোমফ্রন্টের দায়িত্বে থাকাকালীন। দেশজুড়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেতাজির সক্রিয়তার প্রমাণ। গোপনে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অফিসের টেলিগ্রাম গেল হংকং, ব্যাংকক, টোকিও, রেঙ্গুন, তামসুইয়ে। নেতাজি অন্তর্ধান রহস্যের তদন্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরুর ভূমিকা দেখে জনগণের চাঁদায় বেসরকারি কমিশন গড়ার তোড়জোড় চলছিল। টোকিও ট্রায়ালের নায়ক ডঃ রাধাবিনোদ পালকে সামনে রেখেই। বেগতিক দেখে মতি ফিরল মতিলাল-পুত্রের। নেহরুর ক্রীড়নক হলেন শাহনওয়াজ খান। নেতাজির মেজদা সুরেশচন্দ্র এবং মৈত্রবাবুকে নিয়ে কমিটি গড়া হল। রাজনীতির পাশায় সে এক মোক্ষম চাল। শাহনওয়াজ কমিটি সত্যানুসন্ধানে সরেজমিনে তদন্ত করার আগেই অঙ্কের উত্তর জানিয়ে দিতে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অফিস তাইওয়ান সরকারের শরণাপন্ন হল। হয়তো তারা ভেবেছিল মার্কিন কৃপাধন্য চিয়াং কাই শেকপন্থী তাইওয়ানও ব্রিটেনের হ্যাঁ-তেই হ্যাঁ মেলাবে। কিন্তু তারা জানত না, কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু ক্ষমতার বাস্তুতন্ত্রের এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আত্মসাৎ করেই জীবনমুখী হয়ে ওঠে। তাই কেঁচো খুঁড়তে বের হয়ে পড়ল সাপ। তাইওয়ান রিপোর্টে তদন্তকারী অফিসারদের বক্তব্যে প্রকাশ পেল— ১৮ আগস্ট, ১৯৪৫ তারিখে তাইহোকু বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনার কোনো প্রমাণ নেই।
প্রথম এই রিপোর্টের কথা পড়েছিলাম নেতাজি অনুগামী বরেণ্য সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তের বলিষ্ঠ লেখনীতে। প্রাক্তন সাংসদ চিত্ত বসু সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ভারত সরকারের কাছে থাকা তাইওয়ান রিপোর্ট কেন সামনে আনা হবে না?’ ভারত-চীন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানে বিতর্কিত হেনডার্সন ব্রুকস রিপোর্টের মতো নেতাজি তদন্তে তাইওয়ান রিপোর্টও রুদ্ধকারার অন্তরালে হারিয়ে যেত, যদি না প্রাক্তন বিচারপতি মনোজ মুখার্জি সেই পথে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। ২০২৩ সালে নিয়তির টানে যখন লন্ডন যাওয়ার সুযোগ পেলাম। সমুদ্রমন্থনে পেলাম সেই অমৃতভাণ্ড। অপেক্ষায় ছিলাম। অস্ত্র প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত সময়ও আবশ্যক।
২০২৫ সাল। বসু পরিবারের অন্দরে কানাঘুষোতে খবর পেলাম ‘চিতাভস্মের নাটক’ আবার মঞ্চস্থ হতে চলেছে। ১৯৯৬ সালে বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে যখন সেই প্রয়াস গড়ে ওঠে, রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সাংসদ সমর গুহ, জয়শ্রী পত্রিকাগোষ্ঠী, নেতাজি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ফরওয়ার্ড ব্লক। অগ্নিবর্ষী লেখনীতে তীব্র প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছিলেন সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আজ সমরবাবু, বরুণবাবুরা নেই। নেই কংগ্রেস সরকারও। তবু সেই ‘ট্রাডিশন সমানে চলছে’। তাইওয়ান রিপোর্টে তদন্তকারী অফিসারদের বয়ান বিমান দুর্ঘটনার বিতর্কে সর্বকালের মতো ইতি টানতে পারে। সমগ্র ষড়যন্ত্রে জাপানের হাত তথা নেতাজির অগস্ত্য যাত্রায় জাপানের সহায়ক ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে তাইপেই হেলথ সেন্টারের ডিরেক্টর কো-কোং ইউয়ান জানিয়েছিলেন—‘The points in doubt were whether the cremation permit was issued to Bose under an assumed name and whether Bose had actually died. These were important secrets of the Japanese military...’
তাইওয়ান রিপোর্ট সর্বতোভাবে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুতত্ত্বকে নস্যাৎ করে। সেই কথা জেনেই কি বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এই রিপোর্ট প্রসঙ্গে উদাসীন? নেতাজি ফাইল ডি-ক্লাসিফিকেশন যদি সদর্থক ভূমিকা বলে নির্ধারণ করতে হয়, তবে এই রহস্যে যবনিকা পতনে মুখার্জি কমিশন রিপোর্ট গ্রহণ এবং তাইওয়ান রিপোর্ট তথা সেই সংক্রান্ত সিক্রেট টেলিগ্রাম প্রকাশে সরকারের উদ্যোগ নেই কেন? প্রশ্নগুলি চিরন্তন, উত্তর দেবে মহাকাল!
গবেষণা আসলে রিলে রেসের মতো। এক প্রজন্ম চলে যায়, মশাল তুলে দেয় উত্তরসূরির দায়িত্ববান হাতে। কালের নিয়মে প্রযুক্তির আধুনিকীকরণে গবেষণা পদ্ধতি এখন বহুমাত্রিক। নেতাজি রহস্য উদঘাটনে আজ সর্বাধিক প্রয়োজন বিদেশি ভাষাজ্ঞান। বিশেষত জার্মান ও জাপানি। মাত্র ছ’বছরের যুদ্ধে যখন বিশ্বজুড়ে চলেছিল ধ্বংসলীলা, শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষের প্রতিনিধিরূপে নেতাজি সেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে দেশকে পরিচালনা করেছিলেন। সমকালীন গুপ্তচর সংস্থাগুলি নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার অনুসারে আজ অনেক ক্ষেত্রেই স্বকীয় কর্মধারা পরিবর্তন করেছে। সে সময়ের মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা ‘অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিস’ আজ রূপান্তরিত হয়েছে ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’-তে (সিআইএ)। স্ট্যালিনের প্রাণাধিক প্রিয় ‘স্মার্শ’ অবলুপ্ত, ‘এনকেভিডি’ রূপান্তরিত ‘কেজিবি’তে। ‘এমআই ফাইভ’ আজ শাখা বিস্তার করেছে সেকালের উপনিবেশ তথা আজকের কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলিতে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো নথিপত্র প্রকাশের বিষয়ে আজও কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম করেনি। তবে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলির পর্যায়ক্রমে ফাইল ডি-ক্লাসিফিকেশন অব্যাহত। বেসরকারিভাবে প্রবাসী ভারতীয়দের সাহায্যে ফাইলের অন্বেষণ আজ আর অলীক কল্পনা নয়। কিন্তু সংগঠিত প্রয়াস প্রয়োজন। নেতাজি গবেষণায় তাই তরুণ প্রজন্মের আদর্শ নেতাজিরই মতো সর্বত্যাগী মনস্তত্ত্ব।
প্রাক্তন বিচারপতির কথাগুলো আজও স্মৃতির আলমারিতে সযত্নে রাখা আছে। তখন সদ্য এলাহাবাদ হাইকোর্ট নিযুক্ত সহায় কমিশন নিয়ে আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু মনোজ স্যার হতাশ হয়েছিলেন। সল্টলেক জি ডি ব্লকে ৩৫৯ নম্বর বাড়ির স্টাডি রুমে বসে বলেছিলেন—‘ওদের যদি সদর্থক চিন্তা থাকত, ওরা আমার রিপোর্ট থেকেই তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করত।’
শেষবার যেদিন দেখা হয়, সেদিনও তিনি বলেছিলেন লন্ডনের মহাফেজখানাগুলির কথা। সেই পথেই মিলবে সত্যের সন্ধান। কেন্দ্রীয় সরকার মুখার্জি কমিশন গ্রহণের আর্জি একপ্রকার খারিজ করেছে। তাইওয়ান রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র। পরিবারের তরফে তথাকথিত চিতাভস্ম ভারতে এনে নেতাজির মৃত্যুকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়াস আপাতত হিমঘরে। নেতাজির বাণীতেই সঞ্চিত আন্দোলনের রসদ— ‘One individual may die for an idea, but the idea will, after his death, incarnate itself in a thousand lives.’
সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান রিপোর্ট এবং আনুষঙ্গিক নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য রাষ্ট্রপতি ও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা আবেদন জানিয়েছি। তাইপেই সরকারের সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগের প্রচেষ্টাও অব্যাহত। সুভাষচন্দ্র বসুর ভ্রাতুষ্পুত্র অশোকনাথ বসুর দুই কন্যা তপতী ঘোষ, জয়ন্তী রক্ষিত এবং পুত্র আর্য বসু এই উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তাইওয়ান রিপোর্টকে সামনে রেখে নেতাজি অনুগামীদের প্রধান লক্ষ্য নির্দিষ্ট মুখার্জি কমিশনের তদন্ত রিপোর্টের প্রতি। কেন্দ্রীয় সরকার ডি-ক্লাসিফিকেশনের নামে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেতাজি-নথি প্রকাশ্যে এনেছে যা নিঃসন্দেহে নেতাজি গবেষণায় অমূল্য। কিন্তু ২০০৬ সালে কংগ্রেস সরকার যে মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট অগণতান্ত্রিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাতিল করেছিল, আজও কেন্দ্রীয় সরকার তা সামনে এনে পার্লামেন্টে আলোচনার মাধ্যমে নেতাজি রহস্যে স্থায়ী সিদ্ধান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছে না। তবে কি রাজনীতির ধূলিচক্রে নেতাজি কেবলই ভোটের বাজারে সেফটি ভালভের মতো ব্যবহার হবে? দীর্ঘ আশি বছরের প্রৌঢ় গণতন্ত্রে দিল্লির মসনদে যে অনিশ্চয়তার মেঘ হয়ে নেতাজি রহস্য বিরাজ করছে, তা যে-কোনো সরকারের কাছেই তা জাতীয় লজ্জা। ৩৭ পাতার তাইওয়ান রিপোর্ট নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করলেই এব্যাপারে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছার পরিচয় পাওয়া যাবে।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী