


কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: নদী আমাকে বরাবরই আকর্ষণ করে। তার বহমানতা তো মানুষের জীবনেরই মতো। যে মায়ের মতো স্নেহশীলা। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের আশ্রয়দাত্রী। নীলনদ থেকে মেকং, গঙ্গা থেকে পদ্মা, যখনই তাদের জলরাশির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, বা ভেসেছি তাঁদের বুকে ততবারই এক অনাস্বাদিত নির্মল আনন্দে শ্বাস নিয়েছি। এ বাংলা তো নদীরই বাংলা। তবে কাঁটাতারের বেড়া এখন আলাদা করে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের কুঠি বাড়ির পাশে বয়ে চলা পদ্মাকে, মাইকেলের কপোতাক্ষ, জীবনানন্দর ধলেশ্বরীকে।
নদীর পাড়েই জনপদে শৈশব কাটিয়েছিলেন বাবা। তাই কখনওসখনও তিনি স্মৃতি রোমন্থন করতেন। উঠে আসত টুকরো টুকরো কথা—ঢাকার মগ বাজারের বাসা বাড়ি, বুড়ি গঙ্গা, সদর ঘাট, গোয়ালন্দ ঘাটের স্টিমার। আমি বাংলাদেশ গিয়েছিলাম নদী দেখব বলে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কপোতাক্ষ, ধলেশ্বরী— স্বপ্নে দেখা, গল্পে শোনা আরও অনেক নদী দেখব বলে।
তখন পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। আমার সঙ্গী প্রকৃতিপ্রেমী এক অগ্রজ সুখেন্দু সিনহা। ভ্রমণ প্রিয় মানুষটি নানা জায়গায় গেলেও ইতিপূর্বে কোনওদিন বাংলাদেশ যাননি। আমাদের বাসস্থান থেকে পেট্রাপোল সীমান্ত সড়ক পথে এক ঘণ্টার পথ। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সড়ক পথেই সে দেশে যাব সব কিছু দেখতে দেখতে। আর বিশেষত পদ্মায় ভাসা যাবে সে জন্য। তবে ফেরার বন্দোবস্ত ফ্লাইটে।
খবর নিয়ে জেনেছিলাম যে সময় সীমান্ত খোলে সকাল আটটায়। ঋতু অনুসারে সীমান্ত খোলা বন্ধ হওয়ার সময়ের কিছু পরিবর্তন ঘটে।
বর্ষা তখন সবে শেষ হয়েছে। শরতের এক সকালে পৌঁছে গিয়েছিলাম বনগাঁর পেট্রাপোল বর্ডারে। এপাশের নাম পেট্রাপল। ওপাশের বর্ডারের নাম বেনাপোল, বাংলাদেশের যশোর জেলার অন্তর্গত। দু’পাশে দুটো বড় গেট। তার গায়ে উড়ছে দু’দেশের জাতীয় পতাকা। মধ্যে সামান্য একটা ফাঁকা জায়গা রেলিং দিয়ে চারপাশে ঘেরা। সেটা নো ম্যানস ল্যান্ড। টানেল বেয়ে বৃত্তাকার নো ম্যানস ল্যান্ডে প্রবেশ করলাম। জায়গাটা ছোট হলেও সুন্দর। দু’পাশে দু’দেশের গ্যালারিও আছে। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের দিনে দু’দেশের সীমান্ত বাহিনীর পক্ষ থেকে নানা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয় এই জায়গাতে। সেই নো-ম্যানস ল্যান্ডে পেরিয়ে দু’দেশের লোকরাই অন্য দেশে যাওয়া আসা করছে। নো-ম্যানস ল্যান্ডের গেট গলে আবার ওপাশের ইমিগ্রেশন সেন্টার, ফর্ম ফিল-আপ, ডিক্লারেশন দেওয়া। তবে সেখানে মিনিট পাঁচেক সময়ের লাগল না। তবে বাইরে বেরতেই পঙ্গপালের মতো ছেকে ধরল পোর্টার আর ট্রাভেল এজেন্সির এজেন্টরা। আমাদের লোক আসবে নিতে এই অজুহাতে কোনওরকমে তাদের ভিড় ঠেলে রাস্তায় নামলাম। কয়েক কদম এগলেই রাস্তার পাশে বেনাপোল বাজার। নানা ছোট-বড় ভাতের হোটেল। তার কাচের আধারে রাখা নানারকম মাছ-মাংস। ধর্ম রক্ষার্থে কোনও হোটেলের মাথায় হিন্দু হোটেল বা মুসলিম হোটেল লেখা। তবে সব কিছুর সাইনবোর্ড বাংলাতেই লেখা। দোকানিদের হাঁকডাক আর লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচিতে সরগরম জায়গাটা। বেনাপোল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্থল বন্দরও বটে। রাস্তার অন্যপাশে সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সারসার পণ্যবাহী ট্রাক। ওই দেশের শুভানুধ্যায়ীদের থেকে কীভাবে নির্বিঘ্নে ঢাকা পৌঁছব তা জেনে নেওয়া ছিল। কাকভোরে বেরিয়েছি খিদেও পেয়েছে। প্রথমে পাসপোর্ট দেখিয়ে ও দেশের সিম কার্ড তুলে ঢাকার বন্ধু ইফতি আর তৌফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিলাম। তারাই জানাল ঢাকা পৌঁছবার জন্য কোন পরিবহণ সংস্থার বাস নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে। সেই মতো গিয়ে উপস্থিত হলাম একটি পরিবহণ সংস্থার অফিসে। ঝাঁ-চকচকে কাউন্টার, ইউনিফর্ম পরা কর্মী। যাত্রীদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রতীক্ষালয়। শুনলাম বেলা দশটার বাস সামান্য আগেই রওনা হয়েছে। এরপর বাস বারোটায়। ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাসে পৌঁছতে ঘণ্টা পাঁচেক মতো সময় লাগবে। মাঝে পেরতে হবে পদ্মা। অগত্যা সেই বাসের টিকিট সংগ্রহ করেই বেরিয়ে পড়লাম খাবার জন্য।
এখানকার গাড়ি, বাস সবই বিদেশি কোম্পানির। ঝাঁ-চকচকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভলভো বাস রওনা হল ঠিক সময়ই। প্রতিটা আসনেই যাত্রী। খানিক এগিয়ে একবার কাস্টমস চৌকির সামনে দাঁড়াল বাস। কাস্টমস কর্মীরা তাদের ল্যাব্রাডর সারমেয় নিয়ে বাসে উঠে মালপত্র পরীক্ষা করার পর আবার বাস চলতে শুরু করল। রাজপথ হলেও গাড়ি লোকজনের ভিড়ে বাসের গতি শ্লথ। মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ছে। এই বাসগুলোতে কন্ডাক্টার ছাড়াও ইউনিফর্ম পরা একজন ব্যক্তি থাকে। তাকে বলা হয়—‘গাইড’। সেই গাইডের নির্দেশ মেনেই বাস চালায় ড্রাইভার। যাত্রীদের যাবতীয় মুশকিল আসানের দায়িত্ব গাইডেরই। ঘণ্টা দুই শ্লথ গতিতে চলার পর অবশ্য ফাঁকা রাস্তা পাওয়া গেল। যশোরের মধ্যে দিয়ে চলছে বাস। দু’পাশে নানা গাছগাছালি। অগুনতি কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল ফলে আছে। মাঝে মাঝে ছোট বড় ঘর-বাড়ি, দোকানপাট। একটা মাংসের দোকানের নাম ফলকে দেখলাম লেখা আছে ‘রসনা বিতান’। মাংসের দোকানের এমন কাব্যিক নাম আমি ইতিপূর্বে কখনও কোথাও দেখিনি বা শুনিনি। রাস্তার এক পাশে দেখলাম এক মাঠে মহিলাদের ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে। বহু মানুষ ভিড় করে খেলা দেখছে। দেখে খুব ভালো লেগেছিল। জানি না সে মাঠে আজ আর মেয়েরা ফুটবল খেলে কি না? পাশে বসা এক সহযাত্রীর সঙ্গে পরিচয় হল। তিনিও ঢাকায় থাকেন। কলকাতায় এসেছিলেন ডাক্তার দেখাতে, এখন বাড়ি ফিরছেন। তার সঙ্গে নানা গল্প শুরু হল এ দেশ নিয়ে। যাত্রাপথও তিনি বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। যশোর, খুলনা অতিক্রম করে বাঁক নিল বাস। এক দিকে রাস্তা চলে গেছে কুষ্টিয়ার দিকে, আর আমরা ধরলাম ফরিদপুরের রাস্তা। যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর এসব জায়গার নাম শুনেছি কত লোকের মুখে। একদিন যাঁরা বা তাঁদের পূর্বপুরুষরা এ দেশ থেকে ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গে, ভারতবর্ষে। কলকাতা ও তার উপকণ্ঠে গড়ে তুলেছিলেন কলোনি। বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিকদের রচনাতেও বারবার ঘুরে এসেছে এসব জায়গার অনুষঙ্গ। জ্যামের কারণে বাস নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ঘণ্টা দুই লেটে চলছে। ফরিদপুর পৌঁছতেই বিকাল হয়ে গেল। জমজমাট জায়গা। বাস দাঁড়াল এক জায়গাতে চা-পান ইত্যাদি করার জন্য। নীচে নেমে চা পান করে বাসের সিটে এসে বসেছি। সেই সহযাত্রী ভদ্রলোক কোথা থেকে যেন একটা বড় স্লাইস কেকের প্যাকেট আর জলের বোতল কিনে এনে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই আপনাদের খিদে পেয়েছে, খেয়ে নিন।’ স্বল্প পরিচিত সেই ভদ্রলোকের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলাম। কোনও এক গারমেন্টস ফ্যাক্টরিতে ঠিকা শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। বাস আবার চলতে শুরু করার পর ভদ্রলোক বললেন, ‘ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বাস গিয়ে পৌঁছবে গোয়ালন্দ ঘাটে। বার্জ-স্টিমারে যাত্রী সমেত বাস উঠিয়ে পদ্মা পেরনো হবে। ওপারে গিয়ে ঢাকা পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে না।
এক ঘণ্টার মধ্যে গোয়ালন্দ ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে বাস দাঁড়িয়ে গেল। সামনে সার সার দাঁড়িয়ে আছে ট্রাক আর বাস। গাইড বাস থেকে নেমে এসে জানাল, সামনে নাকি প্রায় এক মাইল ট্রাফিক আছে বার্জে ওঠার জন্য। এরপর বাসের চাকা ঘুরতে লাগল ঠিকই। কিন্তু খানিক এগিয়েই আবার দাঁড়িয়ে পড়তে লাগল দশ-পনেরো মিনিট, কখনও বা আধঘণ্টার জন্য। আমাদের সহযাত্রী ভদ্রলোক বললেন, এমন দুর্ভোগ মাঝে মাঝেই হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যে পদ্মাসেতু চালু হবে। তখন আর এ সমস্যা থাকবে না।
সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। কাকভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। এতক্ষণে আমাদের ঢাকা পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। অবশেষে বাস যখন পদ্মা পাড়ে গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছল তখন সূর্য অস্ত গেছে। আবছা আলো ছড়িয়ে আছে নদীর বুকে। সেই আমার প্রথম পদ্মা দর্শন। নদী নয় যেন কূলহীন সমুদ্রের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। নদী এখানে এত চওড়া যে এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। সার সার বার্জ, স্টিমার দাঁড়িয়ে আছে পাড়ে। তার এক একটার উচ্চতা তিন-চারতলা বাড়ির মতো। জেটির যাত্রা পথে অসংখ্য পাইস হোটেল। আলো জ্বলে উঠেছে সেখানে। জলের গন্ধ, মাছের আঁশটে গন্ধ আর ভাত, নানারকম খাবারের গন্ধ মিলে মিশে এক অদ্ভুত গন্ধ এসে লাগছে নাকে। দোকানিদের হাঁকডাক, লোকজনের কোলাহল, মাইকে যাত্রীদের উদ্দেশে ঘোষণা আর স্টিমারের ‘ভোঁ’ শব্দে পাশের লোকের কথাই প্রায় শোনা যায় না। বাবার মুখে একবার শুনেছিলাম যে, গোয়ালন্দ ঘাটের ভাত আর চিকেনকারি নাকি বিখ্যাত ছিল। তবে তা চেখে দেখার জন্য নীচে নামা হল না। স্টিমারের ওঠার আগে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হলেও বাসের গাইড জানাল বাস স্টিমারে ওঠার আগে নীচে নামা যাবে না। কারণ, এখানে পকেটমারের উৎপাত আছে। তাছাড়া, বার্জ-স্টিমারে ওঠার জন্য ঘোষণা হয়ে গেলে কারও জন্য বাস দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না। স্টিমারে রেস্টুরেন্ট আছে। প্রয়োজনে নদী পেরবার সময় স্টিমারেই কেউ খেয়ে নিতে পারেন।
বাস এক সময় জেটি পেরিয়ে স্টিমারে উঠে পড়ল। শুধু আমাদের বাস নয় আরও তিনটে বাস। এই বার্জের একটা অংশে বাস ওঠানো হয়। আর অন্য অংশে আছে তিনতলা কাঠামো। সেখানে যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য কেবিন, রেস্টুরেন্ট, ডাইনিং প্লেস, মেশিন রুম সব আছে। পাইলট কেবিনও সেদিকেই। গাইড বলল, প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট মতো সময় লাগবে ওপারে পৌঁছতে। তাই বাস থেকে নেমে স্টিমারটা ঘুরে আসা যেতেই পারে।
ভোঁ দিয়ে যখন স্টিমার গোয়ালন্দ ঘাট ছাড়ল তখন চাঁদ উঠতে শুরু করেছে। বাস থেকে নীচে নামতেই শীতল বাতাসে মন প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল। ধীর গতিতে চলছে স্টিমার। সামনে শুধু নদীর অন্ধকার জলরাশি। মাঝে মাঝে বিন্দু বিন্দু আলো দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। সেগুলো নৌকা বা স্টিমারের আলো। গোয়ালন্দ ঘাট থেকে শুধু ওপারে ঢাকাতে নয়, নানা জায়গায় যাওয়ার জন্য স্টিমার ছাড়ে।
পদ্মাকে ভালো করে দেখার জন্য নীচের ডেক থেকে ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে এক সময় উঠে গেলাম স্টিমারের তিনতলার শীর্ষ বিন্দুতে। রেলিং ও ছাউনি দেওয়া ঘরের মতো সে জায়গা। দু-চারজন লোক সেখানে দাঁড়িয়ে। স্টিমারেরই কর্মী তারা। টঙে দাঁড়িয়ে নীচে তাকিয়ে পুরো স্টিমারটার ওপরেই নজরদারি করছে তারা। তবে প্রচণ্ড বাতাসের দাপট জায়গাটাতে। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে তাকালাম নদীর দিকে। ততক্ষণে আকাশে চাঁদ উঠে গেছে। সোনার থালার মতো গোল চাঁদ। বুঝতে পারলাম আজ পূর্ণিমা। সেই চাঁদের আলো ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে পদ্মার বুকে। স্টিমারের মাথার ওপর থেকে অনেকটা নদীবক্ষ দেখা যাচ্ছে সেই আলোতে। স্টিমার চলার কারণে চারপাশে যে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে, তাতে এসে ভাঙছে চাঁদের আলো। মনে হচ্ছে অসংখ্য জোনাকি যেন জ্বলছে, নিভছে স্টিমারের চারপাশে। জল জোনাকি! এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। আর দূরের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে জল আর জ্যোৎস্না যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। জ্যোৎস্না বিধৌত নদী চরাচর। আর তার মধ্যে ভেসে চলেছি আমরা। সেই অপার্থিব দৃশ্যর দিকে তাকিয়ে কখন যেন মুছে গিয়েছে পরিশ্রমের ক্লান্তি, ঠিক সময় গন্তব্যে পৌঁছতে না পারার দুশ্চিন্তা। মনে হচ্ছিল ভাগ্যিস জ্যামে পড়ে আটকে ছিলাম, নইলে চন্দ্রালোকিত পদ্মার এই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখা সম্ভব ছিল না। এক সময় ওপারের জেটির বিন্দু বিন্দু আলো দেখা যেতে লাগল। আর দেখলাম, সেদিক থেকে দাঁড় টানা কিছু নৌকা এগিয়ে আসছে স্টিমারের দিকে। স্টিমারের কর্মীরা এবার আমাকে বলল, ‘এবার নীচে নেমে বাসে ফিরে যান। আমরা পাড়ের কাছে চলে এসেছি।’
ওপর থেকে নেমে যখন বাসের কাছে ফিরে এলাম তখন যে নৌকাগুলোকে ওপর থেকে দেখছিলাম তারা এসে ঘিরে ফেলেছে স্টিমারকে। মাথায় ঝুড়ি নিয়ে অদ্ভুত কৌশলে তারা লাফিয়ে উঠছে স্টিমারে। তাদের আগমনের কারণ স্পষ্ট হয়ে গেল যখন তারা তাদের গোল ডালার মতো ঝুড়িগুলোকে মেলে ধরল আমরা যারা বাসযাত্রী তাদের সামনে। ডালার মধ্যে বৃত্তাকারে সাজানো আছে ইলিশমাছ। পদ্মার ইলিশ। ডালা হিসাবেই মাছ বিক্রি করে তারা। চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে রুপোলি ইলিশ। ভেজা বাতাসে বয়ে আসছে ইলিশ আর নদীর গন্ধ। চারপাশে লোকজনের হাঁকডাক। ভোঁ দিতে শুরু করেছে স্টিমার। বাসগুলোও হর্ন বাজাচ্ছে যাত্রীদের তুলে নেওয়ার জন্য। ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে শুরু করল ওপারের জেটির আলো।