


প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়লে কে না ভয় পায়! ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হয় বাজ পড়া। আকাশে আলোর ঝলকানি। তারপরই তীব্র আওয়াজ। কেন বজ্রপাত হয়? কারণ জানালেন স্বরূপ কুলভী।
গরম পড়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও মাঝেমধ্যেই আকাশ কালো করে শুরু হচ্ছে ঝড়-বৃষ্টি। আর এমন ঝড়-বৃষ্টিতে কড়কড় শব্দে বাজও তো হামেশাই পড়ছে। হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানি আর প্রচণ্ড আওয়াজ। এখন প্রশ্ন হল বজ্রপাত কী? প্রথমে আলোর (বিদ্যুৎ) ঝলকানি, তারপর প্রচণ্ড শব্দ। এটাকে বলা হয় বজ্রপাত। কাজেই এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুতের চলাচল। মেঘের মধ্যে জমে থাকা স্থির বৈদ্যুতিক চার্জের হঠাৎ নিঃসরণই হল বজ্রপাত। মেঘে এই বৈদ্যুতিক চার্জ কীভাবে আসে? আর তা থেকে এই চার্জের নিঃসরণ কেন হয়?
আমরা সবাই জানি, সূর্যের তাপে জল বাষ্পে পরিণত হয়। আর সেই জলীয় বাষ্প উপরে উঠে যায়। পরে ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয়। আর এই ঘনীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় মেঘে প্রচুর বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। এর মূলে রয়েছে পরমাণুর ইলেকট্রন আদান-প্রদান। আমাদের চারপাশের সমস্ত বস্তু অসংখ্য ক্ষুদ্রকণার সমষ্টি। এগুলিকে বলা হয় পরমাণু। আসলে যেকোনো মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা পরমাণু। এর একেবারে কেন্দ্রে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন নিয়ে গঠিত নিউক্লিয়াস। এর চার্জ ধনাত্মক অর্থাৎ পজিটিভ। এর চারপাশে ঘোরে ঋণাত্মক বা নেগেটিভ চার্জযুক্ত ইলেকট্রন। পরমাণুতে প্রোটন ও ইলেকট্রন সমান সংখ্যায় থাকে। ফলে পরমাণু বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ থাকে। পরস্পরের সংস্পর্শে এলে ইলেকট্রনের আদানপ্রদান হয়। এই প্রক্রিয়ায় যার সঙ্গে ইলেকট্রন যুক্ত হয়, সেটির চার্জ নেগেটিভ হয়। আর যেটি ইলেকট্রন হারায় সেটির চার্জ হয় পজিটিভ। দৈনন্দিন জীবনে স্থির তড়িৎ সঞ্চারের উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। শীতকালে চুল আঁচড়ে কাগজের ছোটো ছোটো টুকরোর কাছে আনলে এমনটা দেখা যায়। কাগজের টুকরোগুলো চিরুনিতে আটকে যায়। কারণ চুল আঁচড়ানোর সময় চিরুনিতে ইলেকট্রন সঞ্চারিত হয়ে স্থির তড়িৎ উৎপন্ন হয়। আর কাগজের টুকরোর কাছে আনলে তড়িৎ আবেশ তৈরি হয়। এরফলে কাগজের টুকরোগুলিতে পজিটিভ চার্জ তৈরি হয়। ফলে চিরুনি ও কাগজ একে অপরকে আকর্ষণ করে। ঠিক এভাবে মেঘেও ঠান্ডা ও উষ্ণ বাতাসের প্রবাহের ফলে স্থির তড়িৎ উৎপন্ন হয়। গ্যাসের মিশ্রণে আমাদের বায়ুমণ্ডল গঠিত। এরমধ্যে থাকে জলীয় বাষ্পও। সূর্যের তাপে ভূপৃষ্ঠ থেকে জলীয় বাষ্প উপরে উঠতে থাকে। বায়ুমণ্ডলে বেশি উচ্চতায় তাপমাত্রা কম থাকে। এজন্য ওই জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে মেঘে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় মেঘে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয় এবং তা মেঘে জমা হতে থাকে। বজ্রগর্ভ মেঘে ঠান্ডা ও উষ্ণ বাতাসের উপর নীচে প্রবাহ তৈরি হয়। নিম্নমুখী ঠান্ডা বায়ুতে থাকে বরফ কণা। আর ঊর্ধমুখী বাতাসে থাকে জলের কণা। এই দু’ধরনের কণার সংঘাতে প্রচুর স্থির বিদ্যুৎ চার্জ তৈরি হয়। তুলনায় হালকা পজিটিভ চার্জ মেঘের উপরের পৃষ্ঠে জমা হয়। আর ভারী নেগেটিভ চার্জ থাকে নীচের অংশে। পর্যাপ্ত নেগেটিভ ও পজিটিভ চার্জ জমা হওয়ার পর পারস্পরিক আকর্ষণের জন্য স্থির তড়িৎ নিঃসরণ শুরু হয়। আর তা তিনভাবে হতে পারে। মেঘের ভিতরে, এক মেঘ থেকে অন্য মেঘে এবং মেঘ থেকে ভূপৃষ্ঠে। ভূপৃষ্টের কোনো চার্জ থাকে না। মেঘে জমা হওয়া ঋণাত্মক চার্জের কারণে তড়িৎ আবেশে ভূপৃষ্টে ধনাত্মক চার্জ তৈরি হয়। ঠিক চুলে আঁচড়ানো চিরুনি ও কাগজের টুকরোর মতো। পারস্পরিক চার্জের পার্থক্য নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। যা আমরা বজ্রপাত হিসেবে দেখি। বজ্রপাতের সময় প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়। এরফলে তাত্ক্ষণিকভাবে বাতাস প্রসারিত হয় ও বিকট শব্দ তৈরি হয়। বজ্রপাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। তাই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।