


কাদার উপর হেঁটে বেড়াচ্ছে মাছ! জলের বাইরেও এরা শ্বাস নিতে পারে। এই আশ্চর্য মাছ চেনালেন শান্তনু দত্ত।
ছোট্ট বন্ধুরা, বলতে পারবে কোন মাছ ডাঙাতেও থাকে? প্রশ্ন শুনে ভাবছ, মাছ তো জলে থাকে, ডাঙায় থাকবে কী করে! সত্যি এমন এক মাছ রয়েছে যে জলের পাশাপাশি ডাঙাতেও থাকে। আশ্চর্য এই মাছটির নাম মাডস্কিপার। পৃথিবীতে প্রায় ৩০টিরও বেশি প্রজাতির মাডস্কিপার পাওয়া যায়। এরা মূলত সমুদ্রের উপকূলবর্তী এলাকা, বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে থাকে। সুন্দরবন গেলেও এই মাছ দেখতে পাবে। মাডস্কিপারকে দেখতে ভীষণ মজার। বড়ো বড়ো গোল চোখ মাথার উপরের দিকে বেরিয়ে থাকে। ফলে চারপাশ ভালো করে দেখতে পারে এরা। এই চোখ দু’টি আলাদা আলাদাভাবে নাড়ানোও যায়। মাডস্কিপারদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল বুকের পাখনা। এগুলি অনেকটা হাতের মতো কাজ করে। এর সাহায্যে মাডস্কিপার
মাটির উপর হাঁটতে, এমনকি কাদার উপর দিয়ে লাফাতেও পারে। কাদার উপর দিয়ে লাফাতে পারে বলেই এদের নাম ‘মাডস্কিপার’।
জলের বাইরেও শ্বাস নিতে পারে এরা। অন্যান্য মাছেদের মতো এদের শরীরে থাকে ফুলকা। তার সাহায্যে জলের মধ্যে সহজেই শ্বাস নিতে পারে এরা। আর জলের বাইরে? এক্ষেত্রে সাহায্য করে ত্বক, মুখ ও গলার ভিতরের আস্তরণ। এর মাধ্যমে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে মাডস্কিপার। তবে খুব শুকনো জায়গায় বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে না। শরীর সবসময় একটু ভেজা থাকতে হয়। তাই মাডস্কিপার কাদার মধ্যে গড়িয়ে শরীর ভিজিয়ে নেয়।
নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে রাখে মাডস্কিপাররা। অন্য মাছের এলাকায় ঢুকে পড়লে ঝগড়া করতেও পিছপা হয় না এরা। পুরুষ মাডস্কিপাররা পাখনা ফুলিয়ে অন্যদের ভয়ও দেখায়। জোয়ার-ভাটা প্রবণ এলাকায় দেখতে পাওয়া যায় এদের। সমুদ্র বা নদীর জল সামান্য সরে গিয়ে কাদামাটির যে এলাকা দেখা যায়, সেখানেই ঘোরাফেরা করে মাডস্কিপাররা। এই সময়ই মূলত তারা খাবার খোঁজে। এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে ছোটো পোকামাকড়, কাঁকড়া, কৃমি, শামুক ও কাদার মধ্যে থাকা জৈব পদার্থ। মাডস্কিপারও কিন্তু অনেক প্রাণীর খাদ্য। সাপ, পাখি, বড়ো মাছ এদের শিকার করে। নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা করে। কাদার মধ্যে গর্ত বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে। এই গর্তগুলির একাধিক মুখ থাকে। জোয়ার এলে এই গর্তেই ঢুকে পড়ে। অনেক প্রজাতির মাডস্কিপার এই গর্তগুলির ভিতরেই ডিম পাড়ে। গর্তের ভিতর ডিমের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেনের জোগান বজায় রাখতে অনেক সময় গর্তের মুখ বড়ো করে দেয়।
একসময় আমাদের দেশের উপকূলীয় নদীতীরে কাদায় প্রচুর সংখ্যক মাডস্কিপারের দেখা মিলত। তবে সম্প্রতি আশঙ্কাজনকভাবে কমতে শুরু করেছে এই মাছের সংখ্যা। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক সহ নানা দূষণ ও অবাধ নির্মাণের জন্য বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য হারাতে বসেছে সুন্দরবন। এর জন্যই কমছে মাডস্কিপারদের মতো মাছের সংখ্যা।