


নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর ও সংবাদদাতা: তৎপরতা শুরু হয়েছিল অভিযোগ মিলতেই। দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ, ড্রোন দিয়ে তল্লাশি, সন্দেহভাজনদের বাড়িতে হানা। আর সেই সূত্রেই একদিনের মধ্যে দুর্গাপুরে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ডাক্তারি পড়ুয়াকে গণধর্ষণের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করল নিউ টাউনশিপ থানার পুলিশ। ধৃতদের নাম শেখ রিয়াজউদ্দিন, অপু বাউরি ও ফিরদৌস শেখ। নির্যাতিতার বন্ধু ডাক্তারি পড়ুয়াকে গ্রেপ্তার না করলেও টানা জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। খোঁজ চলছে বাকি দুই অভিযুক্তেরও। রবিবার উদ্ধার হয়েছে নির্যাতিতার মোবাইল ফোনও। গণধর্ষণের পর সেটি ছিনিয়ে নিয়ে জঙ্গলেরই একটি গাছের ডালে লুকিয়ে রেখেছিল অভিযুক্তরা। ঘটনাস্থল থেকে নমুনাও সংগ্রহ করেছে ফরেনসিক বিভাগের টিম। ডিসি অভিষেক গুপ্তা বলেন, ‘বিজরা গ্রামের তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলা যাবে না।’ তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই ঘটনায় যারাই যুক্ত থাকুক না কেন, তিনি শেষ দেখে ছাড়বেন। তাঁর কথায়, ‘বাংলায় জিরো টলারেন্স। দোষীরা কোনও অবস্থাতেই ছাড় পাবে না। বিভিন্ন রাজ্যে নিত্যদিন এমন ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এমনকি, আদালতে যাওয়ার সময় ধর্ষিতাকে রাস্তায় জ্বালিয়ে মেরে দেওয়ার মতো ঘটনাও দেখা গিয়েছে। সাংবাদিকদের ধরে নগ্ন করে জেলে ভরে রাখা হয়। বাংলা এসব সমর্থন করে না। করবেও না। বিভিন্ন রাজ্যের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়তে আসেন। তাঁদের অনুরোধ করব, গভীর রাতে হস্টেলের বাইরে বেরোবেন না। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের দায়িত্ব তাদের ছাত্রছাত্রীদের দেখভাল করা। কেউ যদি রাত সাড়ে ১২টায় বেরিয়ে কোথাও যায়, পুলিশের পক্ষে সেটা জানা সম্ভব নয়। স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু হস্টেলের একটা সিস্টেম আছে। সেটা মানতে হবে। আর পুলিশকে বলেছি কড়া ব্যবস্থা নিতে।’
কী ঘটেছিল শুক্রবার রাতে? এক পুলিশ অফিসার জানিয়েছেন, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার পর মহিলা ডাক্তারি পড়ুয়া ও তার পুরুষ বন্ধু নির্জন এই জঙ্গল এলাকায় আসেন। সেখানেই আচমকা উদয় হয় তিন দুষ্কৃতী। পুরুষ বন্ধুটিকে বলে, ‘চলে যা এখান থেকে।’ তিনি সেখান থেকে চলেও যান। তখন তারা ধর্ষণ করে তরুণীকে। কিছুক্ষণ পর পুরুষ বন্ধু ফিরে আসেন ঘটনাস্থলে। তখন সেখানে তরুণী একাই ছিলেন। সেই সময় হঠাৎ হানা দেয় আরও দুই দুষ্কৃতী। তারা যুবকের উপর চড়াও হয়ে ২০০ টাকা কেড়ে নেয়। ছিনিয়ে নেয় ছাত্রীর মোবাইলও। বলে ৩ হাজার টাকা দিলে ফোন ফিরিয়ে দেবে। এরপর দুই ডাক্তারি পড়ুয়া মেডিকেল কলেজে ফিরে আসেন। দুর্গাপুরে নিউ টাউনশিপ থানার পুলিশ নির্যাতিতার বয়ান নথিভুক্ত করে। তারপর মোবাইলের সূত্র ধরে শুরু হয় দুষ্কৃতীদের ট্র্যাকিং। রবিবার একে একে ধরা পড়ে তিনজন। তাদের জেরা করেই জঙ্গল থেকে নির্যাতিতার মোবাইলটি উদ্ধার হয়।
ধৃতদের নিয়ে অবশ্য এরইমধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধছে। কারণ, ধৃত রিয়াজউদ্দিন আগে ওই বেসরকারি মেডিকেল কলেজেই নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করত। অপু বাউরিও হাসপাতালে পাইপলাইনের কাজ করে গিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে খবর, ধৃতদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল সেখানে। আর তাই প্রশ্ন উঠছে, বিষয়টা পরিকল্পিত নয় তো? প্রশ্নের মুখে রয়েছে পুরুষ বন্ধুটির ভূমিকাও। তিনি কেন বিনা প্রতিবাদে ফিরে এলেন? কেন বান্ধবীকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন না? কেনই বা বাকিদের ডেকে নিয়ে গেলেন না? উত্তর খুঁজছে পুলিশ। পাশাপাশি, এই ঘটনায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজের পাশাপাশি জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছেও স্বাস্থ্য ভবন রিপোর্ট তলব করেছে। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শেখ মহম্মদ ইউনুস বলেন, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে এই ইস্যুতে যে কোনওরকম যোগাযোগ করেনি, সেকথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’