


কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: আগের রাতেই বিমান যোগে পৌঁছেছি ইয়াঙ্গুন বা সাবেক রেঙ্গুন শহরে। বার্মা তখন মায়ানমার। ইয়াঙ্গুন বা রেঙ্গুন এখন আর এ দেশের রাজধানী নয়। মায়ানমারের বর্তমান রাজধানী নেপিদ। তবে রেঙ্গুন দেশের বৃহত্তম শহর। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও দেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এই শহর। উনিশ শতকে প্রচুর বাঙালি এসেছিলেন রেঙ্গুনে জীবিকা অর্জনের জন্য। কেউ কেউ এসেছিলেন কাঠ আর তামাকের ব্যবসার জন্য। এখান থেকে তারা বার্মা টিক আর বার্মা চুরুট পাঠাতেন কলকাতায়। তবে যেসব বাঙালি এখানে এসেছিলেন তাঁদের অধিকাংশই প্রায় গত শতকের তিরিশের দশকের মধ্যেই নানাবিধ কারণবশত রেঙ্গুন ত্যাগ করে বাংলায় ফিরে যান। আমার রেঙ্গুন সফরের এ দিনের সঙ্গী অবশ্য বাঙালি। তবে ভারতীয় বাঙালি নন। চট্টগ্রামের বৌদ্ধ বাঙালি। গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে এসে রেঙ্গুনে আছেন এক বৌদ্ধ মঠের কর্মী হিসাবে। তিনিই আমাকে ঘুরিয়ে দেখাবেন রেঙ্গুন শহরের বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠগুলো।
তাঁর গাড়িতেই এক আলো ঝলমলে সকালে বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখব বলে। শহরের রাস্তা বেশ পরিচ্ছন্ন। কলকাতা শহরের মতো বহুতলের আধিক্য না থাকলেও শপিংমল, বহুজাতিক সংস্থার বিপণি এসব আছে। কলকাতা শহরের সঙ্গে বেশ কিছু মিলও আছে এ শহরের। যেমন ফুটপাত দখল করে খাবারের দোকান, পানের গুমটি। একসময় ব্রিটিশদের কাছে এ শহর বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ শহরে বেশ কিছু স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন তাঁরা। সেগুলো সাধারণত প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করতেন। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এর ধাঁচে নির্মিত সে সব ব্রিটিশ স্থাপত্যও কলকাতা শহরের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রত্যেক দেশেরই স্থানীয় পোশাক আছে। এ দেশের লুঙ্গি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে স্থানীয় মানুষজন শার্ট আর লুঙ্গি পরিধান করেন। পথে সামরিক বাহিনীর টহল আছে। ট্রাফিক পুলিশরাও শার্ট-লুঙ্গি আর বুট জুতো পরে ডিউটি করছেন। আমার সঙ্গী জানিয়ে দিলেন, এদেশের সামরিক আইনে ছবি তোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আছে।
অনেক বাঙালির মতোই আমারও রেঙ্গুনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে। এই রেঙ্গুনে বসেই তিনি শ্রীকান্ত উপন্যাসের প্রথম খণ্ড রচনা করেন। তাঁর সাহিত্য কর্মেও গভীর ছাপ ফেলেছিল তাঁর রেঙ্গুনবাস। ‘পথের দাবী’ সহ তাঁর বহু লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে সে সময়ের রেঙ্গুনের জনজীবন, চালচিত্র। আমার সঙ্গীকে বললাম, ‘শরৎচন্দ্র যে বাড়িতে থাকতেন, সে বাড়ি কি এখনও আছে? থাকলে সেটা একবার দেখার ইচ্ছা আছে।’
তিনি বললেন, ‘শরৎচন্দ্র থাকতেন বোটাডাং অঞ্চলে। আমি যখন প্রথম ইয়াঙ্গুন আসি, সে বাড়ির খোঁজ করেছিলাম। কিন্তু সে বাসস্থানের অস্তিত্ব বহুকাল আগেই হারিয়ে গিয়েছে। একশো বছরেরও বেশি সময় আগের ব্যাপার। যতটুকু জেনেছি সে সময় ও জায়গাতে কাঠের ঘর-বাড়ি ছিল। নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকেরাই ওই অঞ্চলে বেশি বসবাস করত। এখন ও জায়গা শহরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক অঞ্চল। বড় বড় দোকানপাট ঘর-বাড়ি সেখানে। বোটাডাং মন্দিরেই আমরা প্রথম যাব। সেখানে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার কথা।’
জানতে চাইলাম, ‘এ শহরে কোনও বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল বা পাড়া আছে?’
তিনি বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই শরৎবাবুর সময়কার হিন্দু বাঙালিদের কথা বলতে চাইছেন? তাঁদের উত্তরপুরুষরা শহরের নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। চার-পাঁচ প্রজন্ম পর বাঙালি বংশোদ্ভূতরা আজ আর কেউ বাংলাতে কথাও বলতে পারেন না। এমনকী, তাঁদের অধিকাংশ লোকই একসময় যে তাঁদের পূর্বপুরুষ বাঙালি ছিল এ কথাও স্বীকার করতে চান না।’
জানতে চাইলাম, ‘পূর্বপুরুষের পরিচয় তাঁরা অস্বীকার করতে চান কেন?’
তিনি গাড়ি চালাতে চালাতে উত্তর দিলেন, ‘বার্মিজ মহিলারা অত্যন্ত কর্মঠ। ঘরে-বাইরে সব কাজই তাঁরা করে বা করতেন। ব্রিটিশ আমলে যে সব বাঙালি এখানে এসেছিলেন, তাঁরা অনেকেই বিনা পয়সায় আশ্রয় বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই স্ত্রী-সন্তানদের এখানে ফেলে রেখে দেশে ফিরে যান। ফলে তাঁদের সন্তানদের পরিচয়হীনতার সংকটে পড়তে হয়েছিল। এ ঘটনার কারণেই অনেকেই আজ আর তাঁদের সেই সব পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে চান না। তাঁদের অনেকেই এখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হয়ে গিয়েছেন।’
গাড়ি এগিয়ে চলল। এখানকার গাড়ি রাস্তার ডানপাশ ধরে চলে। অর্থাৎ আমাদের উল্টো। তবে গাড়ির স্টিয়ারিং কিন্তু আমাদের দেশের গাড়ির মতো ডান দিকেই। আরও একটা ব্যাপার হল ইয়াঙ্গুনে সাধারণ নাগরিকদের জন্য মোটর বাইক নিষিদ্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি পৌঁছে গেল স্ট্র্যান্ড রোড অঞ্চলে। এ জায়গাটা অনেকটা কলকাতা বি-বা-দী বাগের মতো। চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ কলোনিয়াল স্থাপত্যের নানা নিদর্শন। রয়েছে বিখ্যাত স্ট্র্যান্ড হোটেল। যদিও বর্তমানে তা বন্ধ। ঝকঝকে রাস্তা ধরে আরও কিছুটা এগতেই চোখে পড়ল বোটাডাং বৌদ্ধ মন্দিরের সোনালি চূড়া। তার কিছুটা তফাত দিয়ে বয়ে চলেছে ইয়াঙ্গুন নদী। ইয়াঙ্গুনকে বলা হয় প্যাগোডা বা বৌদ্ধ মন্দিরের শহর। তিনটি প্রধান বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে এই শহরে। বোটাডাং, সুনে বা সোয়েডাং ও রিক্লাইনিং-বৌদ্ধ প্যাগোডা। তার মধ্যে বোটাডাং বা বোটাটাউন প্যাগোডা ও সোয়েডাং প্যাগোডা বৌদ্ধদের কাছে বিশেষ পবিত্র স্থান। কারণ, এই দুই প্যাগোডাতে সংরক্ষিত আছে বুদ্ধের পবিত্র শেষ চিহ্ন। প্রচুর জনসমাবেশ প্যাগোডাতে। মায়ানমারের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে প্রবেশ করতে হলে পোশাক বিধি মেনে চলতে হয়। নারী বা পুরুষ কেউই স্লিভলেস বা শর্টস পরে মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে না। এমনকী পায়ে মোজাও রাখা যায় না। বিদেশি পর্যটকদের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা আছে। প্রবেশ করলাম মন্দিরের ভিতর। সামনে একটা হলঘরের মতো জায়গা। কারুকাজ খচিত স্তম্ভ সিলিং। উজ্জ্বল বর্ণের রঙে আঁকা নানা ছবি। বেশ কয়েকটা গ্যালারি আছে এ মন্দিরে। তাতে রয়েছে বিভিন্ন প্রত্নবস্তু, আছে দুর্মূল্য পাথর, অলঙ্কার। বুদ্ধের পবিত্র চিহ্ন যে স্থানে রয়েছে সে জায়গায় যেতে হলে যে ঘরগুলো অতিক্রম করতে হয়, তার দেওয়ালগুলোয় সোনার পাত বসানো। তাতে নানা অলঙ্করণ আর বুদ্ধের নানা কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে দর্শনার্থীরা যাতে সোনার দেওয়াল স্পর্শ করতে না পারে, তার জন্য দেওয়ালের গায়ে স্বচ্ছ কাচের আবরণ বসানো। মাথার ওপরের বাতির আলো সোনার দেওয়ালে প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। এমন স্বর্ণকক্ষ, অলিন্দ আমি আগে কোথাও দেখিনি।
পবিত্র বোটাডাং মন্দির দর্শন করে যখন বাইরে বেরলাম, তখন সূর্য তার তেজ ছড়াতে শুরু করেছে। এদেশের সূর্য চামড়াতে জ্বালা ধরায়। গরমের থেকে জ্বলুনি হয় বেশি। সে কারণে এখানকার প্রায় সব স্থানীয় মহিলাই তাঁদের গালে অনেকটা চন্দনের মতো দেখতে একধরনের কাঠের গুঁড়োর প্রলেপ মাখেন। চন্দন কাঠের মতোই ভেজা পাথরে ঘষে সেই প্রলেপ তৈরি করা হয়। প্যাগোডার অনতি দূরেই ইয়াঙ্গুন নদী। হেঁটে পৌঁছে গেলাম নদীর পাড়ে। যাত্রী বোঝাই ফেরি চলাচল করছে। আমাদের দেখেই ছুটে এল একদল বাচ্চা ছেলেমেয়ে। তাদের হাতের খাঁচায় ছোট ছোট পাখি আছে। পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য পাখি কিনে ওড়ায় অনেকে। নদীর ঘাট থেকে ফিরে এসে গাড়িতে উঠে রওনা হলাম পরবর্তী গন্তব্য রিক্লাইনিং বৌদ্ধ মন্দির দেখব বলে।
এ মন্দিরটা অনেকটা ইন্ডোর স্টেডিয়ামের মতো। বিস্তৃত জায়গার ওপর উঁচু ছাদ। তার একপাশে উঁচু বেদীর ওপর শায়িত আছেন বুদ্ধ মূর্তি। ধবধবে সাদা মসৃণ পাথরের তৈরি মূর্তির চোখের রং নীল। বিশালাকৃতির বুদ্ধ মূর্তি দৈর্ঘ্যে ছেষট্টি ফুট আর উচ্চতায় পনেরো ফুট। বুদ্ধর শায়িত মূর্তি সাধারণত দু’ধরনের হয়। একটি হল তার অন্তিম শয়ন মূর্তি। ডান হাত মাথার নীচে রেখে চক্ষু মুদ্রিত অবস্থায় পাশ ফিরে শোওয়া। যাকে বলা হয় ‘সিংহ শয়ন’। আর অপরটি হল বিশ্রামরত শায়িত বুদ্ধ মূর্তি। যে মূর্তিও পাশ ফেরা ও মাথার নীচে হাত রেখে পাশ ফিরে শোওয়া। বিশ্রামরত বুদ্ধ মূর্তির চোখ কোনও মূর্তিতে খোলা থাকে আবার কোথাও বন্ধ থাকে। তবে, বুদ্ধ মূর্তির কোনটি তাঁর শেষ শয়ন আর কোনটি তাঁর বিশ্রামরত শয়ন মূর্তি, তা চিহ্নিত হয় মূর্তির পায়ের পাতা দু’টির অবস্থান দেখে। অন্তিম শয়ন বা শেষ শয়নের ক্ষেত্রে মূর্তির পায়ের পাতা দু’টি সমান্তরাল থাকে। আর বিশ্রামরত শায়িত বুদ্ধ মূর্তির ক্ষেত্রে একটি পায়ের পাতা অপরটির থেকে খানিকটা সরানো থাকে। এই মন্দিরে শায়িত বুদ্ধর চরণ যুগল ঠিক তেমনই। হলঘরের মতো জায়গায় মেঝের কার্পেটের ওপর রাখা আছে সার সার জলচৌকির মতো টেবিল বা দপ্তর বাক্স। যার ওপর পুঁথি রেখে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সম্মিলিতভাবে পাঠ করেন। স্থানে স্থানে কাঠের আলমারিতে ঠাসা কাপড় জড়ানো বহু প্রাচীন পুঁথিও আছে এখানে। ট্যুরিস্ট আর স্থানীয় বৌদ্ধ উপাসকদের ভিড় চারপাশে।
রিক্লাইনিং বুদ্ধ দর্শন করে যখন বাইরে বেরলাম তখন সূর্য ঠিক মাথার ওপর। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সোয়েডাং প্যাগোডা। কিন্তু খিদে পেয়ে গিয়েছে। তাই রিক্লাইনিং মন্দির থেকে গাড়িতে উঠে সোয়েডাং প্যাগোডাতে যাওয়ার আগে আমরা থামলাম স্থানীয় এক বাজার অঞ্চলে। এ জায়গাটা অনেকটা কলকাতার ডেকার্স লেনের মতো। পথের পাশে সার সার খাবারের দোকান। অধিকাংশ দোকানের মাথায় প্লাস্টিক বা চটের ছাউনি। ইয়াঙ্গুন নদী থেকে ধরে আনা ভেটকি, পার্শে মাছ তো আছেই, আরও আছে নানারকম অচেনা মাছ, মুরগি, শূকর ইত্যাদির মাংস। আর আছে আমার মতো ভেতো বাঙালির জন্য ভাত। তবে রান্নাতে শুকনো লঙ্কা আর মশলার আধিক্য প্রচণ্ড। তারপর অবশ্য একটা স্থানীয় মিষ্টি পদ খেলাম। আমার সঙ্গী জানাল সেটা নারকেলের দুধের পায়েস। ইয়াঙ্গুনের যেকোনও রাস্তায় কয়েক পা হাঁটলেই একটা করে পানের দোকান চোখে পড়ে। স্থানীয় মানুষরা অনেকেই তামাকের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট। পান-জর্দা বা ধূমপান এখানে অতিমাত্রায় প্রচলিত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। আমরা আবার উঠে পড়লাম গাড়িতে।
কিছুটা এগতেই দূর থেকে নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে একঝাঁক মন্দিরের সোনালি চুড়ো দেখা দিতে লাগল। আমার সঙ্গী বললেন, ‘ওই হল সোয়েডাং মন্দির।’ এরপর তিনি সেদিকে এগতে এগতে সোয়াডাং প্যাগোডার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বিবৃত করলেন। সোয়েডাং মন্দিরের বয়স আড়াই হাজার বছর। যদিও পরবর্তীকালে বহুবার তা পুনর্নিমিত হয়েছে। তবে এই প্যাগোডার প্রথম কাঠামো নির্মিত হয় গৌতম বুদ্ধের জীবনকালেই। এ জায়গা থেকে দুই শ্রেষ্ঠী ভাই বাণিজ্যে বেরিয়ে বৈশালীতে ভগবান বুদ্ধের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তাঁর বাণী শ্রবণ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। দেশে ফেরার আগে বুদ্ধের কাছ থেকে স্মৃতি চিহ্ন চাইলে বুদ্ধ তাদের তাঁর মাথার আটটি কেশ উপহার দেন। দুই ভাই সেই কেশ নিয়ে ফিরে এসে এ দেশের রাজার হাতে তুলে দেন ও তাঁকে বুদ্ধবাণী শ্রবণ করান। সেই বাণী শুনে রাজা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হন এবং সেই কেশ রক্ষণের জন্য স্তূপ বা মন্দির নির্মাণ করান। যা হল সোয়েডাং মন্দির। ট্যুরিস্টদের সমাগম এ মন্দিরেই সব চাইতে বেশি মনে হল আমার। ছাদ ঢাকা অনেকগুলো চওড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে হয়। সিঁড়ির প্রশস্ত ধাপগুলোর গায়ে অসংখ্য কিউরিও শপ। তাতে রাখা আছে নানান আকৃতির বুদ্ধ মূর্তি, কাঠের মুখোশ, পাথরের জপমালা, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ব্যবহার্য নানা উপকরণ। কোথাও আবার বিক্রি হচ্ছে প্রদীপ-মোমবাতি, ফুলমালা। সিঁড়ির মাথায় টিকিট কাউন্টার। বিদেশি পর্যটকদের জন্য টিকিট লাগে। বাঁধানো চত্বরের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে ইট-পাথর আর কাঠ নির্মিত অসংখ্য প্যাগোডা বা মন্দির। রয়েছে অসংখ্য স্তূপ। সোয়াডাং মন্দিরকে একটি মন্দির না বলে মন্দিরগুচ্ছও বলা যায়। তাদের মাথার ওপর সোনালি রং করা শৃঙ্গগুলো আর কাঠের প্যানেলের কারুকাজ থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোকে মনে করিয়ে দেয়। প্রতিটা মন্দিরে রয়েছে নানা আকৃতির বুদ্ধ মূর্তি। সারা চত্বর জুড়ে ছড়িয়ে আছে ধূপের গন্ধ। আমার সঙ্গীর কাছে জানতে চাইলাম ভগবান বুদ্ধর পবিত্র কেশগুচ্ছ কোথায় আছে? শ্বেতপাথরে বাঁধানো বিশাল চত্বরের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়ে তিনি দাঁড় করালেন চত্বরের এক জায়গায় এক কূপ বা কুয়োর সামনে। তার মুখের ওপর লোহার গরাদ বসানো। কুয়োর চারপাশে ধূপ জ্বলছে। উঁকি দিলাম কূপের ভিতর। গভীর কূপ। আলো শেষ পর্যন্ত প্রবেশ করছে না। তবে তার দেওয়াল গাত্রে কিছু ঝুলন্ত তাক দেখে মনে হল একসময় নীচে নামা ওঠার পথ ছিল। আমার সঙ্গী বললেন, ‘এই কূপের নীচে কোন ভূগর্ভস্থ কক্ষে স্বর্ণ পেটিকায় রাখা আছে ভগবান বুদ্ধের কেশগুচ্ছ। হাজার বছর আগে কোনও একসময় বিধর্মী হানাদারদের দ্বারা মন্দির আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় সেই সময়ের রাজার নির্দেশে কুয়োর নীচের কোনও গোপন কক্ষে লুকিয়ে ফেলা হয় সেই পবিত্র কেশগুলি। তবে মাটির নীচে ঠিক কোন স্থানে তা রক্ষিত তা আজ আর কারও জানা নেই। কারণ, বহু শতাব্দী ধরে কেউ আর এই কূপে নামেনি।’ চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে সোনালি রঙের চূড়া আর সোনালি রং করা মন্দিরগুলো। যেন কোনও সোনার শহরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আর কোন দ্বেষ, হিংসা-মলিনতা ভগবান বুদ্ধের সেই চিহ্নগুলোকে স্পর্শ করতে পারে না।