Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

‘রেফার’ রোগে শিশুর মৃত্যু, ৯০ কিমি সিউড়ি-বর্ধমান রাস্তা কার্যত মরণপথ, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নতির দাবি

বৃহস্পতিবার রাতে সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের শিশু বিভাগে যখন দু’বছরের মাম্পি সরেনকে আনার সময় প্রবল শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। শিশুটির বুক হাপরের মতো উঠছিল-নামছিল

‘রেফার’ রোগে শিশুর মৃত্যু, ৯০ কিমি সিউড়ি-বর্ধমান রাস্তা কার্যত মরণপথ, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নতির দাবি
  • ১৬ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বৃহস্পতিবার রাতে সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের শিশু বিভাগে যখন দু’বছরের মাম্পি সরেনকে আনার সময় প্রবল শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। শিশুটির বুক হাপরের মতো উঠছিল-নামছিল। নাকে অক্সিজেনের নল গুঁজেও স্বস্তি নেই। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, ‘লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন’ থাবা বসিয়েছে ছোট্ট শরীরে। এখানে চিকিৎসা হবে না। নিয়ে যেতে হবে বর্ধমানে। সেখানে নিয়ে যাওয়াই কাল হয়ে দাঁড়াল মাম্পির জীবনে। 

Advertisement

রাত তখন প্রায় দেড়টা। অ্যাম্বুল্যান্সের ভিতর প্রবল জ্বর আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে কাতরাচ্ছিল শিশুটি। রাস্তায় প্রবল যানজট। সিউড়ি থেকে বোলপুর, গুসকরা হয়ে বর্ধমানগামী রাস্তায় যমদূতের মতো ছুটে চলছে সারসার বালি-পাথরের ডাম্পার। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে লড়াই করে ছুটতে থাকা অ্যাম্বুল্যান্সটি যে গাড়িগুলোকে ওভারটেক করে এগবে সেই উপায় নেই। সাইরেন বেজেই চলেছে। তবুও যেন হুঁশ নেই কারও। সিউড়ি থেকে বর্ধমান মেডিক্যালে যাওয়ার এই ৯০কিলোমিটারের ‘মরণপথ’ আর তালিতের রেলগেটে আটকে প্রতীক্ষা। সব শেষ করে দিল। যখন অ্যাম্বুল্যান্সেটি বর্ধমান মেডিকেল কলেজের দোরগোড়ায় পৌঁছল, তখন মা-বাবার কোলজুড়ে থাকা মাম্পির নিথর দেহটা কেবলই এক টুকরো হিমশীতল পাথর।
মৃত শিশুর পরিবারের ভেজা চোখের প্রশ্নটা আজ বিঁধছে হাসপাতালের দেওয়ালে। ‘সুপার স্পেশালিটি’ তকমা কি তবে কেবলই বাহারি সাইনবোর্ড? সদ্যোজাতদের জন্য এসএনসিইউ থাকলেও মাম্পিদের মতো একটু বড় শিশুদের জন্য কেন নেই ন্যূনতম লাইফ সাপোর্ট? কেন সামান্য জটিলতায় প্রতিবার রেফার নামক মরণফাঁদে ঠেলে দেওয়া হবে মুমূর্ষু রোগীদের? অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের অভিজ্ঞতায় অবশ্য এই মর্মান্তিক ছবি রোজকার। বেহাল রাস্তা আর যানজটে প্রতিবারই হেরে যায় অ্যাম্বুল্যান্সের আর্তি। সিউড়ির একাধিক অ্যাম্বুল্যান্স চালকের কথায়, রাতে সিউড়ি থেকে বর্ধমান যাওয়ার রাস্তায় এমনিতেই শয়ে শয়ে বালি ও পাথরের ডাম্পার যাতায়াত করে। তার উপর তালিতে রেলগেটে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এর জেরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সময়ে বর্ধমান মেডিক্যালে পৌঁছনো যায় না। 
ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের দাবি, সিউড়ি হাসপাতালের উপর জেলার বহু মানুষ নির্ভরশীল। এই অবস্থায় জেলা হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নত না হলে কিংবা শিশুদের জন্য পৃথক পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট চালু না করা হলে আগামী দিনে মাম্পির মতো শিশুদের ভুগতে হবে। তাছাড়া, জেলায় প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা লেগেই রয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য সিউড়িতে কোনো আধুনিক ট্রমা কেয়ার সেন্টার নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুমূর্ষু রোগীদের রেফার করাটাই এখানে অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি নিউরো, কার্ডিও কিংবা নেফ্রোলজির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা নেই হাসপাতালে। বাসিন্দাদের দাবি, জেলা সদর শহরে চিকিৎসা পরিকাঠামোর উন্নতি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। 
সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সুপার প্রকাশচন্দ্র বাগ অবশ্য অসহায়তার কথা শুনিয়েছেন। তিনি মানছেন, এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁর সাফ কথা, উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার জন্য জেলা হাসপাতালে মেডিক্যাল কলেজ থাকা বাধ্যতামূলক। সিউড়িতে তা না থাকায় এই সমস্যা হচ্ছে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ