


সুমন মহান্তি: জার থেকে ফেরার পথে দৃশ্যটা দেখে মনোজ সাইকেল থেকে নেমে পড়লেন। অশ্বিনীদার বাড়ির সামনে প্রচুর লোকের জটলা, চিৎকার চেঁচামেচি চলছে। শ্যামলা রঙের যে লম্বা লোকটিকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে তাকে তিনি চেনেন। দিব্যেন্দু, অশ্বিনীদার পুত্রবধূ দীপালির ভাই। অশ্বিনীদার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে মনোজের। তাই দীপালির ভাইকেও তিনি চেনেন।
মনোজ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে দিব্যেন্দু?’
দিব্যেন্দু উত্তেজিত গলায় বলল, ‘গতকাল ধ্রুবদা দিদির সঙ্গে ঝগড়া করেছে। দিদিকে ডিভোর্স পেপারে সই করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। রাজি না হওয়ায় দিদির গায়ে হাত তুলেছে।’
‘ডিভোর্স! কেন?’
‘ঘটনাটা আমার কানে এসেছে অনেকদিন। এক মহিলার সঙ্গে ধ্রুবদার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। এখানে তাকে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে। প্রায়ই ওখানে রাত কাটায় ধ্রুবদা। ফষ্টিনষ্টি চলছে বহুদিন। এখন আমার দিদিকে তাড়িয়ে তাকে বিয়ে করতে চায় ধ্রুবদা।’
‘সে কী!’
দিব্যেন্দু উঁচু গলায় বলল, ‘আমি চুপ করে বসে থাকব না। একা এলে এরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। তাই হেস্তনেস্ত করতে সঙ্গে পাড়ার ছেলেদেরও সঙ্গে নিয়ে এসেছি।’
দিব্যেন্দু পেশায় বিমা কোম্পানির এজেন্ট, এককালে মস্তানি করে বেড়াত, লোকবলের অভাব তার নেই।
মনোজ জানতে চাইলেন, ‘অশ্বিনীদা কী বলছেন?’
‘উনি আর কী বলবেন? পুত্রস্নেহে অন্ধ। ছেলের হয়ে সাফাই গাইছেন। ছেলের যদি আর মনে না ধরে তাহলে তোমার দিদির ডিভোর্স পেপারে সই করে দেওয়াই ভালো। বুঝুন কাণ্ড, খোরপোশের ব্যাপার নেই। মিউচ্যুয়াল ডিভোর্স। দিদির কোনও দাবিদাওয়া বা অধিকার থাকবে না।’
মনোজ ঘাড় নাড়েন, ‘এরকম হয় নাকি?’
‘কাকু, আমি একবর্ণ মিথ্যে বলছি না। পুরো ফ্যামিলি ছেলের হয়ে লড়ে যাচ্ছে। দিদির শাশুড়ি আরও এককাঠি সরেস। গলা ফুলিয়ে আমাদের সঙ্গে সমানতালে তর্ক করে যাচ্ছেন। ছেলেদের সামলে রেখেছি। যতই হোক, দিদির শ্বশুরবাড়ি। মারধর, গায়ে হাত তোলা এসব করতে চাইছি না। কিন্তু এরা কোনও আলোচনা করতেই নারাজ।’
‘ধ্রুব আছে বাড়িতে?’
‘না। এরকম কিছু ঘটবে বলে আঁচ করেছিল হয়তো। সে নাকি বাড়ির বাইরে। কোথায় গেছে এরা কেউ জানে না। ফোনে পাচ্ছি না। সুইচড অফ। ধ্রুবদা ধুরন্ধর লোক। জানে যে বুড়োবুড়ির ওপর চোটপাট করলেও তার বেশি কিছু করতে পারব না। ও এখন থাকলে মারধর খেয়ে যেত। দিদি চুপচাপ সহ্য করবে কেন? গতকাল রাতেই আমাকে ফোন করে জানিয়েছে। ধ্রুবদা জেনেবুঝে গায়েব হয়ে গেছে।’
‘ঠিক আছে। আমি দেখছি।’
মনোজ ভাবলেন যে, এই সমস্যার একটা সমাধান করে নেওয়াই ভালো। দীর্ঘ বাইশ বছর তিনি এই পরিবারের সুখ-দুঃখের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। সপ্তাহে কমপক্ষে তিনটি সন্ধে এই বাড়িতে আসেন, গল্পগুজব করেন। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত আসেন। একই পাড়ায় বাড়ি। দু’জনের দেশের বাড়িও একই দিকে। সেই সূত্রে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। এখন তিনি এই পরিবারের কাছে নিছক একজন পাড়ার চেনা লোক নন, সুহৃদ ও শুভান্যুধায়ী।
মনোজ সোজা ভেতরের ঘরে ঢুকে গেলেন। অশ্বিনীর পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি ও ধুতি। চেয়ারে বসে আছেন। মাথার ওপরে সিলিংফ্যান ঘুরছে। মুখচোখ লাল, ঘেমে গিয়েছেন খুব।
মনোজ বললেন, ‘এসব কী শুনছি, অশ্বিনীদা?’
‘কী শুনেছ তুমি?’
‘ধ্রুব নাকি দীপালিকে ডিভোর্সের জন্য ফোর্স করেছে!’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
অশ্বিনীর মুখে বিরক্তি, ‘কেন আবার? ওর আর পোষাচ্ছে না। ওই তো হতকুচ্ছিত চেহারা, কতকাল সহ্য করবে? ধ্রুবর সঙ্গে ওকে মানায় না। বয়সের দোষে ভুল করেছিল ছেলে। আসলে ওই মেয়ে ছলাকলায় ধ্রুবকে ফাঁসিয়েছিল। ছেলের জন্যই ওকে আমরা মেনে নিয়েছিলাম। ধ্রুব যখন ওর সঙ্গে থাকতে চাইছে না আমরা কি জোর করব?’
‘বিয়ের পনেরো বছর পরে এসব কথার কোনও মানে হয় না। ধ্রুব যদি একান্তই না থাকতে চায় কোর্টে যাক। আইনি পথে সমাধান হোক। জোরজার কেন?’
অশ্বিনী বললেন, ‘তাই হবে।’
‘আপনার নাতি আর নাতনির কী হবে?’
‘ধ্রুব নিশ্চয়ই কিছু ভাববে ওদের জন্য।’
মনোজ ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘না, অশ্বিনীদা। আপনি ভুল করছেন। ধ্রুব এক মহিলাতে আসক্ত। তার মোহে পড়েই এরকম করছে। ওর হঠকারিতায় আপনি সায় দেবেন কেন? ছেলেকে বোঝান, ঠিক পথে নিয়ে আসুন। তেমনটা হলে সবারই মঙ্গল হবে।’
সরমা পাশে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। তিনি এবার তির্যক গলায় বললেন, ‘তোমাকে অত মঙ্গল ভাবতে হবে না।’
‘এরকম বলছেন কেন বউদি?’
‘অনেকক্ষণ ধরে শুনছি তোমার কথা। আমাদের ব্যাপার আমরা বুঝব।’
মনোজ অবাক হয়ে তাকালেন, ‘এসব কী বলছেন আপনি! ধ্রুব ভুল করছে। কোনও মহিলার পাল্লায় পড়েছে। ছেলেকে দরকার হলে ধমক দিয়ে পথে আনবেন। আপনাদের নাতি-নাতনির ওপর এর খুব খারাপ প্রভাব পড়বে।’
অশ্বিনী ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘এটা আমাদের ফ্যামিলি ম্যাটার। তোমাকে মাথা ঘামাতে বলেছি আমরা? তখন থেকে জ্ঞান দিয়েই যাচ্ছ। আমাদের ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ করে নিজের চরকায় তেল দাও। আমরা নিজেদের ভালোমন্দ বুঝে নেব।’
মনোজ স্তম্ভিত হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন। অবিশ্বাসের চোখে তিনি অশ্বিনী ও সরমার দিকে তাকালেন। দু’জনের মুখেচোখে রাগ ও বিরক্তির মিশ্র অভিব্যক্তি। মাথা নিচু করে বাইরে বেরিয়ে এলেন মনোজ।
দিব্যেন্দু জিজ্ঞাসা করল, ‘কোনও কথা হল?’
মনোজ দীর্ঘশ্বাস চেপে বললেন, ‘ওঁরা অনড়। তুমি বুঝে নাও। আমার কিছু করার নেই।’
বাইরে দাঁড়ানো যুবকেরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ল। মনোজের প্রতিবেশী সুনীলও কৌতূহলে উঁকি দিলেন একবার। অশ্বিনীদা ভেতরের ঘর থেকে বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। সুনীলকে দেখেই আঙুল তুলে ক্ষিপ্তভাবে বললেন, ‘সুনীলবাবু, আপনি এখানে কেন? মজা দেখতে এসেছেন? আগুন লাগাতে চাইছেন আমার ঘরে?’
সুনীলের হাত ধরে মনোজ টানলেন, ‘চলে আসুন, সুনীলদা। ওঁরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন। কেন অপমানিত হবেন?’
সুনীল বললেন, ‘আমি তো কিছু বলিইনি। তা-ও এভাবে রিঅ্যাক্ট করলেন অশ্বিনীদা!’
‘বাদ দিন।’
সুনীল কাঁপা গলায় বললেন, ‘বাদই দেব এবার থেকে। মৌখিক একটা ভালো সম্পর্ক ছিল, আজ থেকে তা শেষ হল।’
ঘরে এসে ফুলস্পিডে ফ্যান চালিয়ে পাখার নীচে বসলেন মনোজ। এমনিতে তিনি ধীরস্থির, শান্ত প্রকৃতির, সহজে রাগেন না। আজও রাগ হচ্ছে না তাঁর, ভীষণ দুঃখ হচ্ছে। মর্মাহত মনোজ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এর পর থেকে অশ্বিনী এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে তিনি আর কোনও সম্পর্ক রাখবেন না। সমস্তরকম সম্পর্কে আজ ইতি পড়ে গেল চিরদিনের জন্য। নিজেকে ওই পরিবারের আপন একজন ভাবতেন। সুপরামর্শ দিতে গিয়েই ভুলটা ভাঙল তাঁর। স্বার্থে ঘা পড়তেই লুকনো নখ-দাঁত বের করে তাঁকে এভাবে অপমান করলেন ওঁরা? এক লহমায় দীর্ঘ বাইশ বছরের ঘনিষ্ঠতা মিথ্যে হয়ে যেতে পারে এভাবে? বলতে গেলে পরোক্ষে আজ তাঁকে ঘাড় ধাক্কাই দিয়েছেন ওঁরা। এমনিতেই অশ্বিনীদার পরিবারের ভালো ইমেজ নেই পাড়ায়, আড়ালে-আবডালে নিন্দে করে অনেকেই। তবুও সেসব কখনওই অন্তরঙ্গতার পথে বাধা হয়নি।
তিনিই অন্ধ ছিলেন এতকাল। পাড়ার লোকেরা বোধহয় ভুল বলত না।
....
অশ্বিনীদার সঙ্গে সম্পর্ক আর জোড়া লাগেনি। মনোজ ভেবেছিলেন যে, পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে অশ্বিনীদা তাঁর খারাপ ব্যবহারের জন্য নিজে থেকেই ভুল স্বীকার করে নেবেন। বলবেন, ‘রাগের মাথায় ওসব বলে ফেলেছি। তুমি মনে রাগ রেখ না।’
তেমনটি আদৌ হয়নি, মনোজের ভাবনায় ভুল ছিল। শুরুতে মন খারাপ লাগত, পরে মেনে নিয়েছেন। সংসারে সমস্ত সম্পর্ক কি আর সরলরেখায় চলে? অতি ঘনিষ্ঠতার আড়ালে বিচ্ছেদ হয়তো ঘাপটি মেরে বসেছিল। ভাঙন অনিবার্য ছিল।
দিব্যেন্দু পার্টিকে ধরেছিল শুনেছিলেন। যে কারণেই হোক ডিভোর্স হয়নি। দীপালিকেও ঘর থেকে বিতাড়িত হতে হয়নি। পাড়াপড়শিদের আলোচনায় শুনতেন যে, দীপালি ওপরেই থাকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনও সম্পর্কই অবশিষ্ট নেই। ধ্রুব থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে নীচতলায়। ফ্ল্যাটের সেই মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে ধ্রুব। এই ব্যাপারে সে কাউকে পরোয়া করে না। ওদের দু’জনকে একসঙ্গে বাইকে দেখেছে অনেকে। ধ্রুবর বিজনেসে আরও শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে, একটি দামি গাড়ি কিনেছে। দীপালিকে সে অফিসিয়ালি ডিভোর্স না দিলেও বাস্তবে একরকম ত্যাগই করেছে বলা চলে। দোতলায় পরিত্যক্ত আবর্জনার মতো পড়ে থাকে দীপালি। ছেলেমেয়েরা মাকে উপেক্ষা করে না, ভালোবাসে। এটাই দীপালির একমাত্র সান্ত্বনা।
....
তিন বছর আগে ধ্রুব পথ দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে। গভীর রাতে রাজ্য সড়কে দুর্ঘটনা। একটি টেম্পো তাকে ধাক্কা মেরে চলে গিয়েছিল। সরমা বউদিও মারণরোগে ভুগে দু’বছর আগে চলে গিয়েছেন। মনোজ রাগ-ক্ষোভ ভুলে ওদের শেষবারের মতো দেখতে গিয়েছেন। অশ্বিনীদার পাশে দাঁড়িয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন মনোজ। এখন দেখা হলে দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা হয়, তবে অশ্বিনীর ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে কখনও ঢোকেন না। পুরনো অন্তরঙ্গতা সেভাবে আর ফেরেনি কখনও। পরপর দু’টি মৃত্যু পরিবারটিকে বেসামাল করে দিয়েছে। দীপালি-ধ্রুবর ছেলেমেয়েরা এখন সাবালক, দু’জনেই কলেজে পড়ছে। অশ্বিনীদা স্ত্রী-পুত্রকে হারানোর শোকে যেন বেশি বুড়োটে হয়ে গিয়েছেন এখন। অশ্বিনীদা তাঁর চেয়ে এগারো বছরের বড়, তাঁর নিজেরই সত্তর হয়ে গেল। একাশি বছরের অশ্বিনীদার শরীরে বয়সজনিত রোগ বাসা বেঁধেছে। জীবদ্দশায় রোগশোক ভোগ করা কপালে ছিল তাঁর। পাড়ার রাস্তায় একদিন হাঁটছিলেন মনোজ। অশ্বিনী কাতরভাবে তাঁকে ডাকলেন। দীর্ঘ দশ বছর পরে ঘরের অন্দরমহলে ঢুকলেন মনোজ। নীচতলাতেই থাকেন অশ্বিনীদা। একসময়ের প্রাণচঞ্চল ঘরটা জুড়ে খাঁ-খাঁ শূন্যতা। তাঁর হাত ধরে অশ্বিনীদা বাষ্পাচ্ছন্ন গলায় বললেন, ‘ক্ষমা করে দিও, মনোজ। তোমাকে অপমান করেছিলাম। ভুল করেছিলাম। বেশিদিন আর নেই। মাঝেমধ্যে এই বুড়ো মানুষটার কাছে এসো। বড় একা লাগে। কথা বলার কেউ যে নেই!’
দুর্বল জরাগ্রস্ত অশ্বিনীকে মনে মনে ক্ষমা করে দিলেন মনোজ।
....
বিকেলে মনোজ হাঁটতে বেরন রোজ। পাড়ায় নতুন একটি পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্ট হয়েছে, ছেলেমেয়েরা সামনের রাস্তাতেই খেলাধুলো করছে। ওদের হইচই, কলরব বেশ উপভোগ করেন তিনি। বিকেল ফুরিয়ে আসছে, বিষণ্ণ মরা আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। তখনই দৃশ্যটা দেখলেন মনোজ।
দুর্বল, অশক্ত অশ্বিনী লাঠি ধরে থপথপ করে হাঁটছেন। লাঠি অবলম্বন করেও ঠিকভাবে হাঁটতে পারছেন না, তাঁর একটি হাত ধরে পাশটিতে হাঁটছে দীপালি। এখন সংসারে নাতি-নাতনি এবং দীপালি ছাড়া অশ্বিনীর আর কেউ নেই। যাকে একসময় ঘর থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, ছেলের পক্ষে সাফাই গেয়ে যাকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলেন, আজ তারই হাত শক্ত করে ধরে শেষবেলায় হাঁটার চেষ্টা করছেন অশ্বিনী।
মনোজের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সময়ের এমন পরিহাস আজ পর্যন্ত আর কোথাও দেখেননি তিনি।