


বিভাসকুমার সরকার: আমার মোবাইলে এইমাত্র একটা মেসেজ এল। একটু দেখে দেবে কে কী পাঠাল?
নীলাঞ্জনাকে স্মার্টফোন কিনে দিয়ে ঋষভের এই হয়েছে এক নতুন জ্বালা! কতবার করে বুঝিয়েছে। কিছুতেই মনে রাখবে না। আর কাজের সময় এসে জ্বালাবে!
আগেকার দিন হলে ঋষভ ছেড়ে কথা বলত না। নীলাঞ্জনার এই দুর্বলতার সুযোগ নিতই নিত! কিছু না হোক নিদেনপক্ষে একটা চুমু অন্তত আদায় হতোই! কিন্তু এখন সেই বয়স গেছে। ইচ্ছেটিচ্ছেগুলোয় কেমন যেন ভাটার টান!
যাই হোক, একরাশ বিরক্তি চেপে মেসেজটা পড়ে শুনিয়ে দিল। নীলাঞ্জনার বোন রূপাঞ্জনার মেসেজ এসেছে পুনে থেকে। কী ব্যাপার? না ওদের মাসিমণি কলকাতায় খুব অসুস্থ। অর্থ সাহায্য করতে হবে।
নীলাঞ্জনার মুখটা বেজার হয়ে উঠল শুনে
— এই হয়েছে এক জ্বালা!
—মাসখানেক আগে তুমি কিছু টাকা পাঠিয়েছিলে না ওঁকে?
—ওতে কী হবে? ওঁর-পাহাড় প্রমাণ সমস্যার কাছে ও তো নস্যি! দীপা, রূপা অবশ্য অনেক অনেক টাকা পাঠায় নাকি মাসে মাসে। আমি বলে দিয়েছি, আমার দ্বারা নিয়ম করে টাকা পাঠানো সম্ভব নয়।
ঋষভ সব ব্যাপারটাই জানে। মেসোমশাই ছিলেন পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। তখনকার দিনে মাইনে কড়ি নেহাত মন্দ পেতেন না। কিন্তু মুশকিল হল, উনি ছিলেন প্রচণ্ড রকমের উড়নচণ্ডী প্রকৃতির! দু’হাতে খরচ করতেন। একটি মাত্র ছেলে। তার পিছনেও খরচের মাত্রা ছিল, অসম্ভব রকমের বেশি। নামীদামি স্কুলে যাবে, নামীদামি টিউটরের কাছে পড়বে ইত্যাদি। মাসিমণিও স্বামীর তালে তাল মিলিয়ে চলতেন। নিত্যনতুন শাড়ি, গয়না। মাসের শেষে দেখা যেত, যত্র আয়, তত্র ব্যয়— এমনকী আয়কে ছাপিয়েও যেত কখনও কখনও।
তার পরিণাম তো এরকম হবেই। ভদ্রলোক হঠাৎ মারা গেলেন। পেনশনাদি কিছু ছিল না। সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও ভাঁড়ে মা ভবানী। ছেলে কোনওরকমে একটা চাকরি পেয়েছে বটে। কিন্তু তারও নুন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা। স্ত্রী, দুই মেয়ে নিয়ে এখন আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে। বৃদ্ধা, অসুস্থ মাকে দেখাশোনার সময় নেই। কিছু টাকা পাঠিয়ে কর্তব্য কর্ম করে! অগত্যা বৃদ্ধাকে এখন এদিক ওদিক হাত পাততে হচ্ছে! বিশেষ করে সচ্ছল বোনঝিদের কাছে।
দুই
রাতে নীলাঞ্জনার তাড়াতাড়ি শোয়া অভ্যাস। ঋষভের দেরি হয়। পড়াশোনা, লেখালেখিতে নিমগ্ন থাকার দরুন বেশ রাত করে শুতে আসে। আজ কিন্তু তাড়াতাড়ি শুতে এল— নীলাঞ্জনার শোবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
‘কী গো, মনে আছে তো পরশু সকালে আমরা কলকাতা যাচ্ছি’— ঋষভ বলল।
—তা আর মনে নেই! কত কষ্ট করে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিলেছে ওই দিনে! দু’-তিন দিন কিন্তু আমরা থাকব কলকাতায়।
—সে আর বলতে!
নীলাঞ্জনার মুডটা কিঞ্চিৎ ভালো দেখল ঋষভ। বলল, ‘কেনাকাটি আছে বুঝি খুব? কী এবার হাতিবাগান না গড়িয়াহাট কোথায় যাওয়া হবে শুনি? আর কীই বা কেনা হবে?’
—ছেলেটা এবার তাড়াতাড়ি করে চলে গেল। কিছু দেওয়া হয়নি ওকে! ভাবছি দুটো শার্ট কিনব ওর জন্যে। আর ‘পেঁচি-বুড়ি’র জন্য ফ্রক।
—বিদেশে থাকা তোমার ছেলের ওইসব দেশি জিনিস কি পছন্দ হবে? আর নাতনির জন্য যে কিনবে সে তো পড়ে থাকবে এক বছর। মনে নেই, গেলবারের কথা— সব ছোট হয়ে গেল মাপে। এবারও কি জেনেশুনে ওই ফাঁদে পা দেবে?
—তোমার যে কী কথা! ছেলে আমার বিদেশে থাকতে পারে। কিন্তু কোনওদিন কিছু বলেছে? যখন যা দিয়েছি, তাই হাসিমুখে নিয়েছে। আর ‘পেঁচি-বুড়ি’-র ফ্রকের কথা বলছ— একটু বড় সাইজের নিলেই তো ঝঞ্ঝাট মিটে গেল। গতবারে ছোট হল কোথায়— দিব্যি মাপসই হয়েছে!
—সে না হয় হল। কিন্তু তোমার সাধের বউমাকে কিছু দেবে না?
—রক্ষে কর। আমি আর ওসব ঝামেলার মধ্যে নেই। কী কিনতে কী কিনব। পছন্দ হবে না। তার চেয়ে টাকা দিয়ে দেব, যা হোক নিজে কিনে নেবে।
গল্প করতে করতেই নীলাঞ্জনার চোখ একসময় ঘুমে ঢুলে আসে। সারাদিন খাটাখাটনি তো কম করে না! এটা ঝাড়ছে ওটা মুছছে। কাজের লোকের পেছনে দিন রাত্তির টিকির টিকির! কিন্তু এত সহজে ঋষভের ঘুম আসবে না। একেই তো তাড়াতাড়ি শুতে এসেছে, তার ওপর মাথার মধ্যে নানা চিন্তার ঘুরপাক।
একটা সিগারেট নিয়ে ও ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। তারপর সেটা ধরিয়ে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে বাইরেটা লক্ষ করতে থাকে। অক্টোবরের শেষ এটা— মানে কার্তিক মাসের সূচনা। কালীপুজো সবে শেষ হয়েছে। বাতাসে হিমের আভাস। উঠোনের শিউলি গাছটার ফুল কোটানোর খেলা এখনও শেষ হয়নি। ফুলের গন্ধে গোটা বাড়িটা ম ম করে, বিশেষ করে রাতের দিকে। শিউলি ফুলের গন্ধ ঋষভের ভীষণ ভালো লাগে। অবসর নেওয়ার পরে বন্ধুবান্ধব সহকর্মী অনেকেই এই বাঁকুড়া ছেড়ে চলে গেছে কলকাতায়, যেখানে যেমন পারে ফ্ল্যাট কিনে সেখানেই বসবাস করছে। কিন্তু ঋষভ যে বাঁকুড়া ছেড়ে যেতে চায়নি, তার অনেকগুলি কারণের মধ্যে এটাও কি একটা? কে জানে!
শিউলি ফুল শিউলি ফুলের গন্ধ আরও একজনের খুব প্রিয় ছিল! সে হল ঋষভের মা। মায়ের কথা স্মরণে আসতেই মনটা দুঃখে ভরে যায়। এই একটা ব্যথার জায়গা ওর। কত বছর হয়ে গেল মা মারা গেছে, তবু মায়ের সম্পর্কে বেদনার একটা অদ্ভুত অনুভূতি আশ্রয় করে আছে ওর হৃদয়কে। কেউ জানে না— এ তার এক গোপন জায়গা। যার স্পর্শে দুঃখ আছে আবার বুঝি একরকম সুখও আছে! ব্যাপারটা কাউকে বোঝানোর নয়। শুধু নিজের মর্মে উপলব্ধি করা! কতদিন এমন হয়েছে, যত্ন করে রাখা মায়ের চিঠিগুলি একলা ঘরে বসে বসে পড়তে পড়তে অশ্রু সজল হয়ে গিয়েছে দু’চোখ। কেন যে এমন হয় ঋষভ জানে না। অনেকরকম ভাবে বিশ্লেষণ করেছে ও। কোথা থেকে আসছে এই অনুভূতি? এই অনুভূতির উৎস কি কোনও অনুশোচনা কোনও আফশোস? অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ঋষভ রায় ভেবে কোনও কূলকিনারা পায় না।
তিন
ঋষভ-নীলাঞ্জনার কলকাতা পরিক্রমা শেষ। নীলাঞ্জনাকে ডাক্তার দেখেছে। হাতিবাগান, গড়িয়াহাট ঘুরে নীলাঞ্জনার মার্কেটিংও হয়েছে যথারীতি। কিন্তু মন ভরেনি ওর। ঋষভ ঠাট্টা করে— ‘আরে, মার্কেটিং-এর কি শেষ বলে কিছু আছে? নিজেকেই তো একসময় ইতি টানতে হয় নিজের মানিব্যাগের দিকে তাকিয়ে— না কি?’
নীলাঞ্জনা ছদ্মরাগে ঝংকার দিয়ে ওঠে— ‘যাও! তোমার বাধা দেবার অভ্যেসটা আর গেল না! আমি কিছু কিনতে গেলেই তোমার যত আপত্তি! যাই হোক এখন চুপ কর। আমরা মাসিমণির বাড়ি এসে গেছি।’
বেলগাছিয়ায় এসে ট্যাক্সি ছেড়ে দিতে দিতে ঋষভ বলে— ‘ঠিক, ঠিক! এই দেখ, আমি চুপ করলাম!’
নীলাঞ্জনার মাসিমণিকে দেখে ঋষভের মনটা ব্যথায় ভরে গেল। এই ভদ্রমহিলা একদিন তাদের কত যত্ন করে খাইয়েছিলেন মনে পড়ে গেল সেকথা। তখন মেসোমশাই বেঁচে। বলেছিলেন, আগে থেকে খবর দিয়ে যেন আসা হয়। ওরা তাই করেছিল। তারই ফল টের পেয়েছিল খেতে বসে। মেসোমশাইয়ের তখনই শরীর খারাপ। তবুও ঘুরে ঘুরে বাজার করেছেন— মাছ, মাংস, দই, মিষ্টি সব। আর মাসিমণি সারা সকাল ওদের জন্যে বসে বসে রান্না করছেন। আর সেই মাসিমণির কী অবস্থা!— একেবারে কপর্দকহীন। তার ওপর শারীরিকভাবে পঙ্গু— ওঠা চলার ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে! দোতলায় জানলার ধারে বিছানায় শুয়ে থাকেন। জানলায় দড়ি বাঁধা আছে। সেই দড়িতে একটা থলে বাঁধা। জানালা দিয়ে চিৎকার করে একে ধরে তাকে ধরে জিনিসপত্র কোনওরকমে নেন। তারপর ওই থলে করেই পয়সা কড়ি নামিয়ে দেন। জীবন যন্ত্রণার কী নিষ্ঠুর ছবি!
ওদের দেখেই মাসিমণি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।— আয় আয় নীলা আয়। ঋষভ এসো। কতদিন পরে এলে তোমরা! পলাশ কি এখনও বিদেশে? ওরা সব কেমন আছে? ঋষভের একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থা।
—না, না মাসিমণি আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমরা সবাই ভালো আছি। পলাশ বিদেশেই আছে। বছরে একবার করে আসে। তা, আপনি কেমন আছেন মাসিমণি?
—আর বাবা বোলো না। এই তো দেখতে পাচ্ছ সবই!
—আকাশের কী খবর? ও আসে না?
আকাশ মাসিমণির গুণধর পুত্র। ও যে মায়ের সম্পর্কে উদাসীন— পরিবারের সকলেই জানে সে কথা। সব জেনেশুনেও ঋষভ কেন আকাশের কথা তুলছে? নীলাঞ্জনা মনে মনে ভীষণ রেগে যায়। মাসিমণির অলক্ষ্যে ঋষভের দিকে কটমট করে তাকায়। ঋষভের আবার অপ্রস্তুত অবস্থা। সে যেন অজান্তে মাসিমণির ব্যথার জায়গায় আঘাত দিয়ে ফেলেছে। কোনওরকমে মেকআপ দেওয়ার চেষ্টা করে।
—না, মানে বলছিলাম আকাশ তো কাছেপিঠেই থাকে। আপনি তো ওর কাছে গিয়েই থাকতে পারেন।
মাসিমণির কোনও দুঃখ নেই—
—জানো বাবা, ওর কাজের বড় চাপ। সকালেই নাকে মুখে দু’টি গুঁজেই ওকে অফিসে ছুটতে হয়! ফিরতে ফিরতেই প্রায় রাত দশটা। তার ওপর আজ আসানসোল তো কাল ধানবাদ— এই করে বেড়াচ্ছে। আমার কাছে কখন আসবে বল? তাছাড়া যা হয় আজকাল— কম বয়সেই বিয়ে করেছে। দুই মেয়ে নিয়ে এক চিলতে ঘরে হাবুডুবু খাচ্ছে। ওদের কে দেখে তার ঠিক নেই, আমাকে দেখবে!
চোখ ফেটে জল আসে ঋষভের। কোনওরকমে সামলায়। নীলাঞ্জনাকে কথা বলার সুযোগ করে দিতে ও বারান্দায় এসে সিগারেট ধরায়। আরও একটা ভয় আছে। আর যদি বেফাঁস কিছু বলে দেয়!
চার
প্রায় পঁচিশ বছর আগের অতীত জীবনে ফিরে যায় ঋষভ। প্রায় ঠিক এইরকম অবস্থা ছিল মায়ের। হাওড়ার ইছাপুরের একটি ফ্ল্যাটে এইরকমই নিঃসঙ্গ অবস্থায় থাকতেন। বাঁকুড়ায় তখন স্ত্রী, পুত্র আর নতুন চাকরি নিয়ে ঋষভ হাবুডুবু খাচ্ছে। মাকে অবশ্য নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কিছুতেই রাজি হননি। ভীষণ স্বাধীনচেতা মহিলা ছিলেন তিনি।
প্রথম প্রথম মাসে একবার অন্তত মায়ের কাছে যাবার চেষ্টা করত ঋষভ। শেষে তাও বন্ধ হয়ে গেল। বিশেষ করে যখন বাড়ি করতে শুরু করল। তখন তো ফোনের এত সুবিধে ছিল না। পোস্টকার্ডে চিঠি লিখতেন মা। প্রায় প্রতি চিঠিতেই লেখা থাকত— ‘কাজের খুব চাপ তাই না? এখানে আসার মতো ছুটি মিলছে না? যাই হোক চেষ্টা কোরো একবার ঘুরে যেতে। আমার শরীর একরকম আছে। চিন্তা কোরো না।’
আর ঋষভের মনে আছে, মায়ের কাছে গেলে কী খুশিই না হতেন! চলাফেরা করায় বেশ অসুবিধে ছিল। তবু রিষু কী ভালোবাসে নিজের হাতে তা-ই করে খাওয়াবেন! নিজের হাতে বিছানা করা থেকে মশারি টাঙানো সব! এখন মনে হয়, ঋষভ মায়ের প্রতি আরও একটু যত্নবান হতে পারত নাকি? অতটা উপেক্ষা, অতটা অনাদর কি সত্যিই তাঁর প্রাপ্য ছিল? মায়ের কথা কেন সেদিন একটু হৃদয় দিয়ে ভাবেনি? তারপর হঠাৎ এল সেই ভয়ঙ্কর দিন। ক্লাস করে এসে স্টাফ রুমে সবে বসেছে, হঠাৎ অফিস থেকে কে যেন বার্তা নিয়ে এল— ‘ঋষভবাবু, আপনার একটা ট্রাঙ্ক কল এসেছে হাওড়া থেকে।’ হঠাৎ যেন মাথার মধ্যে বিদ্যুতের চমক! তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল নৃসিংহবাবুর কণ্ঠস্বর। মা যে ফ্ল্যাটে থাকতেন তারই পাশের ফ্ল্যাটটা নৃসিংহবাবুদের। ব্যাঙ্কের অফিসার ভদ্রলোক। ঋষভ ওখান থেকে ফিরে আসার সময় প্রত্যেকবার না হোক, মাঝে মাঝেই দেখা করত। এটা সেটা নানা কথা বলার পর হেসে বলত— ‘মাকে রেখে গেলাম নৃসিংহ অবতারের হেফাজতে— অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে।’ ভদ্রলোক হাসতেন— ‘চিন্তা কোরো না, আমি তো রইলাম।’ সেই নৃসিংহবাবুর গলাটা কেমন যেন শোনাল— ‘তুমি যত তাড়াতাড়ি পার চলে এসো।’ আর কোনও কথা বলার অবকাশ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিয়েছিলেন।
এক মুহূর্তও দেরি করেনি ঋষভ। নীলাঞ্জনাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল বাড়ি থেকে। কিন্তু বাঁকুড়া থেকে কলকাতা কি কম রাস্তা! ছ’-সাত ঘণ্টা লেগে গেছিল বাড়ি পৌঁছাতে! গিয়ে দেখে সব শেষ।
‘কই গো, কোথায় গেলে তুমি? চল এবার তো যেতে হবে আমাদের!’ নীলাঞ্জনার ডাকে সংবিত ফিরে আসে ঋষভের। ঘরে ঢুকে বলে— ‘চল, চল।’ মাসিমণির দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায়। কিন্তু এ কী! কাকে দেখছে সে, আধশোয়া হয়ে খাটে বসে আছেন কে? ইনি তো নীলাঞ্জনার মাসিমণি নন, ইনি তো তারই মা! সব কেমন যেন গুলিয়ে যায়। আকুলস্বরে বলে ওঠে— ‘তোমাকে আর কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেব না মা। তুমি চল আমাদের সঙ্গে। আমরা তোমাকে দেখব।’ নীলাঞ্জনা অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে থাকে। মাসিমণিও স্তব্ধবাক।
ধীরে ধীরে ওরা নেমে আসে রাস্তায়। কারও মুখে কোনও কথা নেই। নীলাঞ্জনার মাসিমণির মধ্যে ঋষভ সত্যি সত্যিই সেদিন নিজের মাকেই প্রত্যক্ষ করেছিল। কিন্তু তাঁর উদ্দেশে বলা কথাগুলো সবই মনে মনে বলা। প্রকাশ্যে উচ্চারণ করতে পারেনি। তা কি নীলাঞ্জনার ভয়ে নাকি অন্য কোনও কারণে তা জানা নেই। তবে একটি কাজ সে করেছিল নীলাঞ্জনার অজান্তে, মাসিমণিরও অজান্তে— চারটি পাঁচশো টাকার নোট সে রেখে এসেছে মাসিমণির বালিশের তলায়।