


কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: মিশর দেশটা আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত হলেও তার মধ্যে ছোট একখণ্ড ইউরোপ লুকিয়ে আছে। তবে সেই ইউরোপও প্রাচীন ইউরোপ। ম্যাসিডনের সম্রাট আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী যখন সারা পৃথিবী দখল করতে বেরিয়েছিল কিংবা সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা যখন নীলনদের দেশকে শাসন করছেন ঠিক তখনকার ইউরোপ। সেখানে মিশর আর ইউরোপের ইতিহাস মিলেমিশে হাত ধরাধরি করে আজও দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন কিছু হায়রোগ্লিফিক লিপিতে এমনও ইঙ্গিত মেলে যে, মিশর সুন্দরী ক্লিওপেট্রা ও রোমান সেনাপতি মার্ক এন্টনির প্রথম সাক্ষাৎ ও প্রেমকাহিনির জন্ম হয়েছিল এই বন্দর নগরীতেই। যার বিখ্যাত বাতিঘরের আলো পথ দেখাত নাবিকদের। রোমের বাইরে পৃথিবীতে হাতেগোনা জায়গাতে এখনও রোমান যুগের অ্যাম্পিথিয়েটার স্থাপত্য চিহ্ন টিকে আছে, তার মধ্যে এ স্থান অন্যতম। এক সময় সুদূর অতীতে এখানেই গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাঠাগার। এ নগরীর নাম সম্রাট আলেকজান্ডারের নাম অনুসারে রাখা হয়েছিল—আলেকজান্দ্রিয়া।
মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার দূরত্ব দু’শো কিলোমিটারের কিছু বেশি। সড়ক পথে যেতে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। মসৃণ হাইওয়ে দিয়ে ছুটছিল আমার গাড়ি। মাথার ওপর সূর্যের ঝলমলে আলো। এ পথের দু’পাশে এক সময় মরুপ্রান্তর ছিল। কিন্তু সুয়েজ খালের বদান্যতায় মিশরের নানান জায়গায় একটু একটু করে সবুজায়ন হয়েছে। এ জায়গাও তেমনই। বড় বড় বৃক্ষ না থাকলেও রাস্তার দু’পাশ মোটামুটি সবুজ। তাই যাত্রাপথে চোখকে তেমন পীড়া দেয় না। ঘণ্টা দুই সময় চলার পর দূর থেকে চোখে পড়ল নীল জলরাশি, যা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে দিগন্তর সঙ্গে। ড্রাইভার জানাল ওটাই ভূমধ্যসাগর। যার কোল ঘেঁষে তটরেখা বরাবর আলেকজান্দ্রিয়া নগরী। ভূমধ্যসাগরের সেই নীল জলরাশি ক্রমশ আমাদের যাত্রা পথের কাছে। ক্রমে ক্রমে চোখে পড়তে লাগল সমুদ্রের অধচন্দ্রাকার তটরেখা বরাবর অবস্থিত স্থাপত্যগুলো, যেখানে আমার গন্তব্য। ঠিক বেলা দশটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম বন্দর নগরী আলেকজান্দ্রিয়াতে। গাড়ি এসে থামল এক প্রাচীন সৌধর ধ্বংসাবশেষের সামনে। আমার গাইড সামিরা সেখানেই অপেক্ষা করেছিল। কায়রো থেকে আলেকজান্দ্রিয়া যাওয়া-আসা-ঘোরা, দর্শনীয় স্থানের টিকিট, গাইডের খরচ থেকে মধ্যাহ্নভোজ সবই আমার প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত।
গাড়ি থেকে যেখানে নামলাম সেখান থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে আমার প্রথম দ্রষ্টব্য স্থান—খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে নির্মিত রোমানদের প্রাচীন কবরখানা বা ‘ক্যাটাকম্ব’। সেদিকে এগতে এগতে আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর ইতিহাস আমাকে সংক্ষেপে ব্যক্ত করতে লাগল সামিরা—‘আনুমানিক খ্রিস্ট পূর্ব ৩৩৪ অব্দে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার তাঁর প্রধান স্থপতি ডাইনোক্রেটসকে দিয়ে সুরস্য অট্টালিকা, বাগিচা সমৃদ্ধ এই নগরী নির্মাণ করান। মিশরের শাসক ফারাওরা তখন আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করেন। পরবর্তীকালে আলেকজান্ডারের সেনাপতি টলেমি এই নগরীর উত্তরাধিকারী হন। আলেকজান্দ্রিয়াই এক সময় মিশরের প্রধান বন্দর হয়ে উঠেছিল। আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য হতো এই বন্দরের মাধ্যমেই। ‘ভূমধ্যসাগরের মুক্তা’ বলা হতো আলেকজান্দ্রিয়াকে। আরও দু’টি কারণে এ নগরী বিশ্ববাসীর কাছে বিখ্যাত ছিল। তা হল আলেকজান্দ্রির বিখ্যাত বাতিঘর বা লাইট হাউস, যা দূরদূরান্ত থেকে আশা নাবিকদের পথ দেখাত। এত উঁচু বাতিঘর তখন পৃথিবীর অন্য কোনও বন্দরে ছিল না। ৪৫০ ফুট উঁচু ওই বাতিঘরের মাথায় জ্বালানো আগুনের আলো সমুদ্রের ভিতর পঞ্চাশ মাইল দূর থেকেও দেখা যেত। তবে সেই বাতিঘরের অস্তিত্ব আজ আর নেই। চতুর্দশ শতকে প্রবল ভূমিকম্পে তা ভেঙে পড়ে। আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর দ্বিতীয় গৌরবের বিষয় ছিল, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে টলেমির রাজবংশের আমলে প্রতিষ্ঠিত আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার। যার সমতুল্য গ্রন্থাগার একমাত্র প্রাচীন ভারতের নালন্দাতেই ছিল। তবে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে সেই গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে ইউনেস্কোর পরিচালনায় গড়ে উঠেছে সুবিশাল আধুনিক এক গ্রন্থাগার। গল্প শুনতে শুনতেই এক সময় প্রবেশ করলাম প্রাচীন রোমান কবরখানার প্রাঙ্গণে। পাথর বসানো বিশাল একটা চত্বর। তার স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে। কোথাও কোথাও রাখা আছে পাথরের তৈরি বিশাল বিশাল সারকোফেগাস বা কফিন। সামিরা জানাল, ওই অলঙ্কার সমৃদ্ধ পাথরের কফিনগুলো নাকি ভূগর্ভ থেকে তুলে আনা হয়েছে। ওর ভিতর যে রোমানরা শায়িত ছিলেন তাদের দেহ ধুলো হয়ে গিয়েছে বহু শতাব্দী আগেই! এই কবর স্থানে মিশরীয়দের সমাধিস্থ করা না হলেও এখানে একই সঙ্গে রোমান আর মিশরীয় দেবদেবীর মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। কারণ রোমানদের সঙ্গে স্থানীয় মিশরীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছিল। অনেক রোমান সৈনিক মিশরীয় মহিলাদের বিবাহ করেছিলেন। তাই দুই দেশের ধর্ম ভাবনাও অনেক ক্ষেত্রে মিশে গেছিল। ব্যাপারটা দেখানোর জন্য সামিরা এক প্রাচীন কক্ষে প্রবেশ করল আমাকে নিয়ে। যে কক্ষে শব এনে রাখা হতো কবর দেওয়ার আগে। এখানে দু’পাশের দেওয়ালে দু’টি চিত্র খোদাই করা আছে। তার একটি হল প্রাচীন মিশরীয়দের শিয়াল দেবতা বা মৃত্যুর দেবতা আনুবিস। অপরটি হল গ্রিকদের সর্প দেবতার ছবি। তাদের আঁকা হয়েছিল মৃতদেহ রক্ষক হিসাবে। রোমানদের এই প্রাচীন কবর স্থান আসলে একটি ভূগর্ভস্থ কবরস্থান। বেশ কয়েকটা প্রাচীন কক্ষ দেখার পর আমরা গিয়ে উপস্থিত হলাম মাটির নীচে অবস্থিত অংশে। বিরাট একটা কুয়ো যেন! তার নীচের দিকে তাকালে কী আছে তা স্পষ্ট দেখা যায় না। তবে তাকে ঘিরে অপরিসর প্রাচীন পাথুরে সিঁড়ি আছে নীচে নামার জন্য। মাসিরা বলল, ওই কুয়োর মুখ দিয়েই দড়ি বেঁধে পাথরের শবাধার নীচে নামাত হতো। পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম। কিছুটা নীচে নামার পরই বাইরের সূর্যালোক অপসৃয়মান হয়ে এল। আমার দেখার, চলার সুবিধার জন্য সামিরা পকেট থেকে একটা পেন্সিল টর্চ বের করে আলো জ্বালালে। এক সময় ভূগর্ভস্থ কবরখানাতে নেমে এলাম আমরা। অন্তত চার-পাঁচতলা বাড়ির মতো গভীর হবে সে জায়গা। চারপাশ ধুলো মাখা। বাতাসও বেশ ভারী। শ্বাস নিতে মৃদু কষ্ট হয়। বেশ কয়েকটা ঘরের মতো জায়গা আছে সেখানে। আর আছে দেওয়ালের গায়ে আয়তাকার গহ্বর। যার মধ্যে রাখা হতো রোমানদের কফিনগুলো। সামিরা টর্চের আলো ফেলতে লাগল দেওয়ালের সেই গহ্বরগুলোর মধ্যে। কোনও গহ্বর শূন্য আবার কোন গহ্বরের মধ্যে রাখা আছে পাথুরে কফিন। যার মধ্যে জমে আছে প্রাচীন ইতিহাসের ধুলো। মাটির নীচে যে সব কক্ষ আছে সেগুলি ব্যবহার করা হতো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য। সে সব ঘরের দেওয়ালেও খোদিত আছে নানা অলঙ্করণ, রোমান-মিশরীয় দেবদেবীর মূর্তি। বেশ খানিকটা সময় সেখানে কাটিয়ে আবার উঠে এলাম সূর্যালোকিত আকাশের নীচে। মনে হল যেন ইতিহাসের অতল স্পর্শ করে এলাম। প্রাচীন রোমান কবরখানা দেখা শেষ করে আমরা বাইরে বেরতে যাচ্ছি। হঠাৎ সামিরা বলল, এখানে এক জায়গাতে তোমার ভাষা বাংলাতেও নাম লেখা
আছে, দেখবে?
ইতিমধ্যে সামিরার সঙ্গে আমার কিছু আলাপচারিতাও হয়েছে। সে জেনে গিয়েছে, আমি ভারতীয় এবং আমার ভাষা বাংলা। কৌতূহলী হয়ে বললাম, হ্যাঁ, চল দেখি?
কাছেই পথের পাশে কিছু প্রাচীন পাথুরে কফিন রাখা ছিল। কফিনগুলোর গায়ে পাথর দিয়ে ঘষে নানান ভাষায় নাম-ছবি ইত্যাদি আঁকা হয়েছে। অবিবেচক ট্যুরিস্টদের কাণ্ড! সামিরা একটা কফিনের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। আমি দেখলাম কফিনের গায়ে পাথর ঘষে স্পষ্ট বাংলাতে দুটো নাম লেখা আছে—রবি ও সাথী! কোন রবির আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে রবি ও সাথী ইতিহাসের বুকে নিজেদের নাম লেখার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে আমার জানা নেই। তবে আমি বেশ লজ্জিত বোধ করলাম ব্যাপারটাতে। সামিরা বলল, এক বাঙালি ট্যুরিস্ট আমাকে বলেছে ওটা বাংলায় লেখা। তবে তোমার দুঃখ পাওয়ার কারণ নেই। ওর পাশের লেখাগুলো আমরা দেশের ভাষা মানে আরবিতে লেখা।
আমাদের পরের গন্তব্য রোমান অ্যাম্পিথিয়েটার। এ জায়গাতে পৌঁছলে আপনার মনে হতেই পারে আপনি এক প্রাচীন রোমান ভূখণ্ডে পৌঁছে গিয়েছেন। যা দেখতে পাবেন আপনি রোমে গেলে। মহাকাল আর ভূমধ্যসাগরের নোনা বাতাস গ্রাস করে নিয়েছে এই থিয়েটারকে। শুধু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আকাশের বুকে আজও রোমান সাম্রাজ্যের গৌরবের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল শ্বেতপাথরের কিছু স্তম্ভ আর বিশাল অ্যাম্পিথিয়েটারের গ্যালারির একটা অংশ। ঐতিহাসিকদের মতে, এই অ্যাম্পিথিয়েটার বা খোলা আকাশের নীচে গ্যালারি ঘেরা মুক্তমঞ্চের নির্মাণকাল চতুর্থ শতক। অ্যাম্পিথিয়েটার নির্মাণের জন্য সাদা পাথরগুলো আনা হয়েছিল রোম থেকে। আর কালো গ্রানাইট পাথর আনা হয়েছিল মিশরের আসোয়ান থেকে। এবং অবশ্যই তা আনা হয়েছিল জলপথে নীলনদ আর ভূমধ্যসাগরের পথ ধরে। দীর্ঘদিন মাটির নীচে চাপা পড়েছিল এ জায়গা। মাত্র পঞ্চাশ বছর আগে মাটির তলা থেকে এ জায়গাকে আবার উদ্ধার করা হয়। নেমে এক সময় গিয়ে দাঁড়ালাম অ্যাম্পিথিয়েটারের এরিনা বা ফাঁকা মঞ্চে। বহু শতাব্দী আগে সে বৃত্তাকার জায়গায় পরিবেশিত হতো নাটক, নৃত্য বা গ্র্যাডিয়েটরদের লড়াই! আর তা দেখে উল্লাসিত জনতা করতালিতে ফেটে পড়ত। এরিনায় দাঁড়িয়ে সে সব কথা ভেবে এক আশ্চর্য রোমাঞ্চ অনুভব হচ্ছিল। আমাদের পরের গন্তব্য বিবলিওথিকা আলেকজান্দ্রিয়া অর্থাৎ আলেকজান্দ্রিয়া পাঠাগার।
আলেকজান্দ্রিয়া শহরের বাড়িগুলোর মধ্যে সাবেকিয়ানার ছাপ আছে। বাড়িগুলি রোমান স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি। দু-তিনশো বছর বা তারও প্রাচীন স্থাপত্যর পাশাপাশি যে আধুনিক হোটেল-রেস্তরাঁ-ব্যবসা কেন্দ্রগুলো আছে সেগুলোও গঠনগতভাবে প্রাচীন স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি। কাজেই শহরটার মধ্যে একটা প্রাচীন গন্ধ আছে। রাস্তাঘাট, লোকজনের পোশাক-পরিচ্ছদও
বেশ সুন্দর।
পাঠাগার প্রাঙ্গণে পা রাখলেই প্রথমে চোখে পড়বে সম্রাট আলেকজান্ডারের এক আবক্ষ মূর্তি। প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির স্মরণে ইউনেস্কোর গড়ে তোলা এই আধুনিক লাইব্রেরির বিভিন্ন গ্যালারি বা অংশ আছে। নানা বিষয়ে পাঠ গ্রহণের জন্য আছে বিশাল বিশাল হল ঘর। হার্ড কভার আর ডিজিটাল মাধ্যম— দু’য়ের সাহায্যেই পাঠ নেওয়া যায়। পাঠকক্ষের প্রতিটা ডেস্কের সামনেই রাখা কম্পিউটার। দেশ-বিদেশ থেকে আগত মানুষজন পড়াশোনা করছেন সেখানে। প্রতিটা ফ্লোরের মেঝের একটা বড় অংশই কাচের তৈরি। তাই ওপর থেকে নীচের বিভিন্ন ফ্লোরে যারা বই পড়ছেন, তাঁদের দেখা যাচ্ছে। এটি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও বটে। তাই এখানে রক্ষিত আছে বিভিন্ন প্রাচীন ছবি, শিল্পকর্ম, মুদ্রণযন্ত্র, প্যাপিরাস সহ বিভিন্ন ধরনের কাগজ-কালি-কলম ইত্যাদি। আমরা যখন লাইব্রেরি থেকে বাইরে বেরলাম, তখন বেলা ১টা বাজে।
মধ্যাহ্নভোজের পর আমাদের শেষ গন্তব্য কাইতবে সিটাডেল বা সিটাডেল দুর্গ। আমরা যখন দুর্গে পৌঁছলাম তখন বিকেল হয়ে এসেছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতান আল আশরাফ ভূমধ্যসাগর উপকূলে নগরীর নিরাপত্তার কারণে এই দুর্গ নির্মাণ করান। সাদা পাথরের তৈরি মাঝারি আকৃতির এই দুর্গটিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে ভূমধ্যসাগরের জল। দুর্গে প্রবেশ করতে হয় বিশালাকৃতির এক কাঠের দরজা অতিক্রম করে। প্রাচীন কামান শোভিত এই দুর্গের ভিতরটা পর্যটকদের জন্য সুন্দর করে সাজানো। এ দুর্গের নির্মাণশৈলীতে ইউরোপীয় স্থাপত্যের চিহ্ন আছে। ওয়াচ টাওয়ার, কামান বসানোর জন্য ছাদে খাঁজ কাটা আকার, তার গা বেয়ে সৈনিকদের পদচারণার রাস্তা সবই আছে। সামিরা বলল, ‘ঠিক এখানেই এক সময় অবস্থান করত আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত বাতিঘর। সেই ভেঙে পড়া বাতিঘরের পাথর দিয়েই এ দুর্গের বেশ খানিকটা অংশ নির্মাণ করা হয়।’
ঘণ্টাখানেক মতো সময় লাগল দুর্গটা ঘুরে দেখতে। তারপর গিয়ে বসলাম দুর্গ সংলগ্ন সমুদ্রের পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা পাথরের স্তূপের ওপর। বিকেল হয়ে গিয়েছে। আমার সামনে ভূমধ্যসাগরের শান্ত নীল জলরাশি। দু-চারটে জেলে নৌকা ঘুরে বেড়াচ্ছে সমুদ্রে। আর উড়ে বেড়াচ্ছে সমুদ্র পাখির ঝাঁক। সামিরাকে বললাম, আমার মনে থাকবে তোমাদের সবাইকে।
সে হেসে আরবিতে জবাব দিল ‘সুক্রান’ অর্থাৎ ধন্যবাদ।