


কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: আজকাল নতুন একটা কথা চালু হয়েছে ‘হরর ট্যুরিজম’। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘আতঙ্কের ভ্রমণ’ বা ‘ভয়াল ভ্রমণ’। কিন্তু মানুষ তো আনন্দের জন্য ভ্রমণ করতে যায়। তবে হরর ট্যুরিজম ব্যাপারটা কী? আসলে এই জায়গাগুলো দেখলে বীভৎসতার ইতিহাস স্মরণ করে শিহরিত হতে হয়। একই সঙ্গে এ সত্যও উপলব্ধি করা যায় যুদ্ধ, শাসন ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা কখনওই সভ্য পৃথিবীর কাছে কাম্য হতে পারে না। যেমন জার্মানিতে হিটলারের বেশ কিছু কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, ইউরোপের মধ্যযুগের কিছু দুর্গের যন্ত্রণা কক্ষের মতো কিছু স্থান, যা আজও ইতিহাসের বীভৎসতার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। অনেক পর্যটক অবশ্য এসব স্থানকে এড়িয়ে চলেন।
আমি কম্বোডিয়া এসেছিলাম আঙ্করভাটের বিখ্যাত মন্দির দর্শনের জন্য। এমন কোনও বীভৎস স্মারকস্থল দর্শন করা আমার পরিকল্পনার মধ্যে ছিল না। নমপেন শহর কম্বোডিয়ার রাজধানী। খুব একটা বড় শহর নয়। পুরো একটা দিন আমার হাতে আছে চারপাশ ঘুরে দেখার জন্য। হোটেলের রিসেপশনিস্টের কাছে খোঁজ নিতে তিনি বললেন, ‘একটি জায়গা দেখে আসতে পারেন, যদি না আপনি মানসিকভাবে দুর্বল হন। আমি অবশ্য একবারই সে জায়গাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি সেখানে।’
মেয়েটির কথা শুনে আগ্রহ প্রকাশ করে জানতে চাইলাম, ‘সেই জায়গাটা কোথায়?’
তিনি জানালেন, নমপেন শহরের খানিকটা বাইরে, দশ-বারো কিলোমিটার দূরে। নাম কিলিং ফিল্ড। পল পটের কিলিং ফিল্ড একটা স্মারক সৌধ আছে। সেই সৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যায় অনেকে। ফেরার পথে পল পটের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পও দেখা যায়।
কম্বোডিয়ার একদা কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক পল পট। বহু মানুষকে তাঁর সময়ে হত্যা করা হয়েছে তাও পড়েছি। কিন্তু এ শহরে তার কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বা কিলিং ফিল্ডের উপস্থিতির কথা আমার জানা ছিল না। ইতিহাস আমাকে বরাবরই টানে। তা যত কঠিন কঠোরই হোক না কেন। কাজেই আর কালবিলম্ব না করে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম, ‘কিলিং ফিল্ড’ বা বধ্যভূমি দেখব বলে।
কম্বোডিয়ার সাধারণ মানুষের জন্য জনপ্রিয় ও সস্তার বাহন হল ‘টুকটুক’। মানে টোটো রিকশর মতো। নমপেনসহ কম্বোডিয়ার অন্য শহরগুলোতে হামেশাই দেখা মেলে তাদের। দাম দর করে তারই একটাতে চেপে বসলাম। একসময় শহর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল গাড়ি। ঘিঞ্জি রাস্তা। পথের দু’পাশে কাঠ আর টিনের ছাউনিওলা ঘরবাড়ি দোকানপাট। তার মধ্যে অধিকাংশই ফল-শাক-সব্জি আর মাংসের দোকান। কোথাও বিক্রি হচ্ছে ড্রাগন ফল, কোথাও ঝুলিয়ে রাখা আছে ঝলসানো শূকরের মাংস। টুকটুকের চালক হঠাৎ একটা দোকানের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করাল। দেখলাম, সেই দোকানের কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে কুমিরের দেহ। কুমিরের মাংসের দোকান! চালক জানাল,
মাংসের জন্য বহু কুমির ফার্ম আছে এ দেশের নানা জায়গায়।
যে জায়গা দেখতে যাচ্ছি তার সম্পর্কে, সেই সময়কাল সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া প্রয়োজন। তাই মোবাইলের সার্চ ইঞ্জিন খুললাম। এ দেশটার প্রাচীন নাম ছিল কম্বোজ। এই শব্দেরই অপভ্রংশ হল কাম্পুচিয়া বা কম্বোডিয়া। একসময় এ দেশ শাসন করত খামের রাজবংশ। ছয় থেকে নয় দশকে উত্তাল ঝড় বয়ে যায় কাম্পুচিয়ার বুকে। রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে দেশের ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। তাদের থেকে আবার গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে কমিউনিস্ট খামের ক্রুজ বাহিনী। যার নেতা ছিলেন স্বৈরাচারী পল পট। কাম্পুচিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান এবং দেশেরও প্রধান। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ এই চার বছর মতো সময়কাল ক্ষমতায় ছিলেন পল পট। তারপর ভিয়েতনামের সহযোগিতায় কম্বোডিয়ার বাসিন্দারা পল পট ও তাঁর কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। পল পট অবশ্য সাজা এড়াতে হিটলারের মতোই আত্মহত্যা করেন। কিন্তু তাঁর শাসিত ওই চার বছরের শাসনকাল ছিল কম্বোডিয়ার ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম চারটি বছর। পৃথিবীর গণহত্যার ইতিহাসেও ওই চারটি বছর ঘৃণ্যতম-নিষ্ঠুরতম বছর বলে পরিচিত। ফ্যাসিস্ট হিটলার বারো বছরের শাসনকালে ৬০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিলেন। আর কমিউনিস্ট শাসক পল পট মাত্র তার চার বছরের শাসনকালে ২০ থেকে ২৫ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেন। গণহত্যা ছাড়াও তাঁর শাসন ব্যবস্থায় জোর করে কাজ করানোর ফলে অতিরিক্ত পরিশ্রমে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। কম্বোডিয়ার জনসংখ্যা চার বছরে পঁচিশ শতাংশ কমিয়ে ফেলেছিলেন। বর্তমান সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পল পটের সময়কালের প্রায় কুড়ি হাজার গণকবরের ও বধ্যভূমির সন্ধান মিলেছে কম্বোডিয়ার নানা অঞ্চলে। আমরা যে বধ্যভূমি ও গণকবরের স্থান দেখতে চলেছি সেটি তাদেরই মধ্যে একটি। নাম ‘চয়ুং জেনোসাইডাল সেন্টার।’ চলতি নাম ‘কিলিং ফিল্ড’।
মোবাইল ফোন ঘেঁটে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে করতেই হঠাৎই যেন এসে পড়লাম গ্রাম্য এক পরিবেশে। চারপাশে ফসলের খেত এবং সে স্থান নির্জনও বটে। সামান্য কয়েকজন কৃষিজীবী মানুষ চোখে পড়ছে রাস্তায়। কারও কাঁধে লাঙল, মাথায় তালপাতার টোকা। পল পটের বাহিনী শহরের বাইরে এই নির্জন পরিবেশকেই নির্বাচন করত বধ্যভূমি হিসাবে। একসময় পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে। তোরণ আর উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা। তবে দেখেই বোঝা যায় তা পরবর্তীকালে নির্মিত। তার সামনের বাঁধানো চত্বরে কয়েকটা ট্যুরিস্ট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করেই সে জায়গাটাকে গাছ আর সবুজ ঘাসে ছাওয়া একটা পার্ক বা অনেকটা গল্ফ কোর্সের মতো মনে হল। আর তোরণের সোজাসুজি দাঁড়িয়ে আছে আকারে চার-পাঁচ তলা বাড়ির আকৃতির একটি সাদা রঙের লম্বাটে ধরনের সৌধ। গেটের ডানপাশে টিকিট কাউন্টার। টিকিট কাটার সঙ্গে সঙ্গেই আমার হাতে দেওয়া হল একটা হেড ফোন আর ছোট রিমোটের মতো একটা যন্ত্র। কাউন্টারের কর্মীরা তাদের কার্যকারিতা আমাকে বুঝিয়ে দিল। এই বধ্যভূমির নানা জায়গায় সংখ্যা লেখা সাইন বোর্ড রাখা আছে। হাতের যন্ত্রতে সেই সংখ্যা টিপলে যান্ত্রিক গাইড আমাকে সে জায়গা সম্পর্কে জানিয়ে দেবে। বিবৃত করবে সে স্থানের ইতিহাস। চোখে পড়ল কাউন্টারের বাইরে একজায়গায় একটা শিশি রাখা আছে। সেই শিশির গায়ে লেখা আছে ‘স্মেলিং সল্ট’। যা সাধারণত কেউ মানসিক উত্তেজনা বা আতঙ্কের কারণে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তা শুকিয়ে চেতনা ফেরানো হয়। ইয়ার ফোনের কার্যকারিতা বোঝাবার পর টিকিট কাউন্টারের কর্মী আমাকে এও পরামর্শ দিয়ে রাখল যে, ‘ঘুরে দেখার সময় যদি শারীরিক বা মানসিক অস্বস্তি বোধ করেন, তবে কান থেকে ইয়ার ফোন খুলে ঠিক এ জায়গায় ফিরে আসবেন। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে রিমোট হাতে নিয়ে এগলাম প্রথম দ্রষ্টব্যের দিকে। একটি সাইনবোর্ডে দেখলাম লেখা আছে এ স্থানটি ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। শ্বেতপাথরের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে সেই স্মারক স্থলে প্রবেশ করার জন্য। দেখলাম এক বৃদ্ধা হাঁটু মুড়ে মাথা নিচু করে বসে আছেন প্রার্থনার ভঙ্গিতে। কারা যেন বেশ কয়েকটি পুষ্পস্তবক সাজিয়ে রেখেছে সিঁড়ির ধাপে। হাতের যন্ত্রের সুইচ টিপে দিলাম। যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর আমার কানে বলতে শুরু করল, ‘আপনি এখন যে স্থানে উপস্থিত হয়েছেন সেই স্মারক স্থলটি মানবতা বিরোধী এক নৃশংস সময়কালের সাক্ষ্য বহন করছে। যে কুখ্যাত গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিল একদা কম্বোডিয়ার কমিউনিস্ট শাসক পল পট ও তাঁর নেতৃত্বাধীন খামের রুজ কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৮০ সালের পর থেকে পল পটের সময়কাল যে গণহত্যার স্থান ও গণ কবরস্থানগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে এই স্থান অন্যতম। এ জায়গা থেকে একশোটি গণ কবরের সন্ধান মিলেছে যার মধ্যে থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দু’হাজার নারী-পুরুষের দেহাংশ। আপনি যে সমাধি সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তা ভীতি প্রদর্শনের জন নির্মিত নয়। নির্মাণ করা হয়েছে মানবতার সপক্ষে ও যুদ্ধ বা রাষ্ট্রের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার জন্য। নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার জন্য। সর্বোপরি সেই সব হতভাগ্য মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য, যাঁরা অসহায়ভাবে স্বৈরাচারী পল পটের ঘাতক বাহিনীর শিকার হয়েছিলেন...।’
জুতো খুলে শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম স্মারক স্তম্ভর প্রবেশমুখে। কাচের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেই সামনে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। নীচ থেকে স্তম্ভর মাথার ওপর উঠে গেছে কাচ ঢাকা সার সার তাক। আর তাতে সাজানো আছে, অগুনতি অজস্র মানুষের মাথার খুলি। তাদের শূন্য কোটর যেন চেয়ে আছে আমার দিকে, ভবিষ্যতের মানুষের দিকে। কী করুণ সেই চাহনি। শো-কেসগুলোর কম্বোডিয়ান ও ইংরেজি ভাষায় মৃত মানুষ ও তাদের বিষয় সংক্ষেপে উল্লেখ করা আছে। সেই কয়েকতলা বাড়ির সমান শোকেসের চারপাশে একটি সংক্ষিপ্ত বৃত্তাকার পথ আছে। প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে সে পথ ধরে ঘুরতে শুরু করলাম। সব দিক থেকেই কাচের বাক্স থেকে আমার দিকে চেয়ে আছে মানুষের মাথার খুলি। যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর আমার কানে বলে চলেছে—‘পল পটের ঘাতক বাহিনী সর্বাগ্রে খুন করত শিক্ষিত মানুষ, শিল্পী-কবি-সাংবাদিকদের। কারণ তারা এ ধারণা পোষণ করত যে, সেই সব মানুষ কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। এছাড়া, ঘাতক বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে অগণিত সাধারণ নর-নারী। এমনকী শিশুরাও বাদ যায়নি পল পটের হত্যালীলা থেকে। আর হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতিও ছিল অতি নৃশংস। আপনি যে নর করোটিগুলো দেখছেন, খেয়াল করে দেখুন তাদের অনেকের মাথাতেই ছিদ্র আছে বা আঘাতের চিহ্ন আছে। গুলির খরচ বাঁচাবার জন্য এই বধ্যভূমিতে মানুষের মাথা শলাকার সাহায্যে বা কুঠার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হতো, তারপর তাদের গণকবর দেওয়া হতো।’ স্তব্ধ হয়ে আমি শুনতে লাগলাম আমার কানে বাজা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরের কথা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই স্থান ছেড়ে বেরিয়ে আমি কণ্ঠস্বরের নির্দেশমতো ঘুরতে শুরু করলাম সেই বধ্যভূমি। তার মাঝে মাঝে ছাউনি ঘেরা জায়গা চিহ্নিত করা আছে। সে জায়গার মাটির তলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে গণ কবর। আমার হাতের যন্ত্রের নির্দিষ্ট স্থানের সংখ্যা টিপলেই যান্ত্রিক গাইড জানিয়ে দিচ্ছে কত সংখ্যক মানুষকে গণকবর দেওয়া হয়েছিল সে স্থানে। তারা কারা ছিলেন। কিছু কিছু ছাউনির নীচে কাচের আধারে মৃত মানুষদের স্মারকও রাখা আছে। ছিন্ন রক্তাক্ত পোশাক ইত্যাদি। একজায়গায় দেখলাম সার সার কাচের বোয়ামের মধ্যে মানুষের দাঁত রাখা আছে। সাইনবোর্ডে লেখা আছে এইসব দাঁত নাকি হত্যার আগে উপড়ে নেওয়া হয়েছিল যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। নির্জন দুপুরে আমার মতো আরও বেশ কিছু ট্যুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই বধ্যভূমিতে। কিন্তু তাঁরাও প্রত্যেকেই আমারই মতো নিস্তব্ধ হতবাক। এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা যেন ছড়িয়ে আছে চারপাশে, এমন বিষণ্ণ পৃথিবী আমি কোনও দিন দেখিনি। কোনও নিভৃত বেঞ্চে বসে চোখের জল মুছছে কেউ কেউ।
একটা গাছের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। তার গা থেকে নানান ধরনের পুতুল, খেলনা ঝুলছে। তার গোড়াতেও কারা যেন পুতুল রেখে গিয়েছে। একটা সাইন বোর্ডে গাছটার সম্পর্কে লেখা আছে ‘কিলিং ট্রি’। হাতের যন্ত্রের বোতাম টিপতেই আমার কানে এল গাছটার বীভৎস পরিচিতি। যে নারীদের ওই বধ্যভূমিতে আনা হতো তাদের অনেকের সঙ্গেই ছোট শিশু থাকত। মাকে হত্যা করার আগে তাদের চোখের সামনে ওই গাছের গুঁড়ির গায়ে শিশুদের আছাড় মেরে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করত পল পটের ঘাতক বাহিনী। সেই সব মৃত শিশুদের স্মরণেই স্থানীয় মানুষজন পুতুল রেখে যায়।
এই বধ্যভূমির বীভৎসতার বিবরণ আর সহ্য করা যাচ্ছিল না। এ জায়গা যেকোনও সুস্থ মানুষের মনোবিকার ঘটানোর পক্ষে যথেষ্ট। কান থেকে হেডফোন খুলে ফেললাম। বেরিয়ে পড়লাম সেই
হত্যাভূমি থেকে। আমার পরের গন্তব্য
ছিল পল পটের বন্দি শিবির বা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প।
সে জায়গাটা অবশ্য নমপেন শহরের মধ্যেই অবস্থিত। গিয়ে উপস্থিত হলাম সে জায়গায়। বিশাল প্রাকার ঘেরা চৌহুদ্দির মধ্যে চারতলা একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সেটা একসময় একটা স্কুল বাড়ি ছিল। যার বর্তমান নাম টুলোসাঙ হল কাস্ট মিউজিয়াম। লেনিন বলেছিলেন, ‘শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব আর বিপ্লব আনে মুক্তি।’ কিন্তু কমিউনিস্ট শাসক পল পট ক্ষমতায় এসে স্কুল বন্ধ করে দিয়ে সেগুলিকে রূপান্তরিত করেছিলেন বন্দি শিবিরে। পল পটের আমলে ক্রমান্বয়ে পনেরো হাজার মানুষকে আনা হয়েছিল এখানে। তার মধ্যে বালক-বালিকারাও ছিল। ওই পনেরো হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র চোদ্দোজন মানুষ জীবিত অবস্থায় ফিরতে পেরেছিলেন এই বন্দি শিবির থেকে। বাকিদের এখানে বা বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আজও হতভাগ্য মানুষদের স্মৃতি বহন করে চলেছে লোহার খাট, যার সঙ্গে কাঁটা সমৃদ্ধ লোহার বেড়ি। আর আছে তাদের পায়ের হাড় ভেঙে দেওয়ার জন্য সাঁড়াশির মতো যন্ত্র। সেই সময়কার অসংখ্য ছবি আছে এই মিউজিয়ামে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় একটা হল ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। এই ঘর চোখে জল এনে দেয়। সার সার ছোট ছোট ছেলেমেয়ের ছবি টাঙানো আছে সেখানে। তাদের হত্যা করার আগে এ ছবিগুলো তোলা হয়েছে। কেউ করুণ মুখে কেউ বা আতঙ্কিতভাবে চেয়ে আছে ছবিগুলোর ভিতর থেকে। সরল, নিষ্পাপ সব শিশু। যাদের আজও পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার ছিল। আর ঘরে ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটা বড় কাচের আধারে টাঙানো আছে আট-দশ বছর বয়সি কোনও মেয়ের ফ্রক। আজও তার গায়ে কালচে রক্তের দাগ লেগে আছে। কম্বোডিয়ার ইতিহাসের রক্তের দাগ। মানব ইতিহাসের, কমিউনিস্ট পল পটের শাসনের কলঙ্কের দাগ।