


কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত; কায়রোর প্রধান রেল স্টেশনের নাম রামসেস। রেলপথই আমি বেছে নিয়েছিলাম মিশরের অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য নগরী লুক্সার ও তার বিপরীতে অবস্থিত পাহাড়ি উপত্যকায় রাজা-রানিদের সমাধিক্ষেত্র দেখব বলে। কায়রো থেকে লুক্সারের দূরত্ব প্রায় সাতশো কিলোমিটার। অর্থবান পর্যটকরা অনেকে সেখানে যান নীলনদের পথ ধরে মহার্ঘ রিভার ক্রুজে, কেউবা বিমানে, নিদেনপক্ষে গাড়িতে। তবে ট্রেনে একটা সুবিধাও আছে, সাধারণ মানুষকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ ঘটে। সময় লাগে দশ ঘণ্টার কাছাকাছি। ডিজেল চালিত ট্রেন ও ইলেকট্রিক ট্রেন দুই আছে। তবে জনবসতিহীন নির্জন মরুভূমির মধ্যে দিয়ে মাইলের পর মাইল যে ট্রেনগুলি অতিক্রম করে সেগুলি অধিকাংশই ডিজেল চালিত। ট্রেনগুলির ইঞ্জিন বগির গঠনও বেশ আধুনিক। রাতের ট্রেনই ধরলাম। রিজারভেশন পাইনি, অগত্যা জেনারেল কম্পার্টমেন্ট ভরসা। তবে বসার আসন পেয়ে গেলাম জানলার ধারে। ট্রেন ছাড়ার আগে বগি ভর্তি হয়ে গেল। জোব্বা আর পাগড়ি পরা গ্রামীণ মিশরীয়দের সংখ্যাই বেশি। তবে, কায়রো শহরের আধুনিক যুব সমাজ কিন্তু বেশ ফ্যাশন দুরস্ত। আমার যাত্রাপথের সহযাত্রীদের সঙ্গে নানা লটবহর। মুরগির খাঁচা থেকে পোশাকের গাঁটরি। মরু অঞ্চল থেকে শহরে তারা এসেছিল জিনিস বেচাকেনা করতে। এখন ফিরে যাচ্ছে নিজেদের গ্রামে। যা বুঝলাম ট্যুরিস্ট বা বিদেশি বলতে আমিই একমাত্র ব্যক্তি। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে তারা, যদিও তাদের কথাবার্তা আমি বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত এক সহযাত্রীকে পেয়েছিলাম যিনি ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারেন। কারণ, তিনি নাকি একসময় বেশ কয়েক বছর কায়রোর এক হোটেলে কাজ করেছিলেন। আমি লুক্সার ও ভ্যালি অব দ্য কিংস অর্থাৎ ফ্যারাওদের সমাধিক্ষেত্র দেখতে যাচ্ছি জেনে বেশ কিছু পরামর্শ দিলেন। লুক্সারের কাছে কোনও এক গ্রামে তাঁর বাড়ি, উটের দুধের ব্যবসা করেন। সেই বৃদ্ধ সহযাত্রী আমাকে এ কথাও বললেন যে, আমি যেন টুম্ব বা সমাধি কক্ষের ভিতরে প্রবেশ না করি। ফ্যারাওদের কফিন স্পর্শ না করি এবং বিশেষত এমন কোনও পাত্র স্পর্শ না করি যাতে মমি তৈরি করার আগে মৃতদেহের শরীর থেকে অন্তঃযন্ত্র বের করে রাখা হতো। রানি হাতশেপসুতের শব মন্দিরে নাকি তেমন বেশ কিছু পাত্র রাখা আছে। ওসব জিনিস স্পর্শ করলে নাকি ফ্যারাওদের আত্মারা ক্রুদ্ধ হন। তাতে আমার ক্ষতি হতে পারে। —এসব হল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা মিশরীয়দের বিশ্বাস।
রাত ন’টা নাগাদ ট্রেন ছাড়ল। ক্রমে ক্রমে পিছনে সরে যেতে লাগল আলো ঝলমল রাতের কায়রো শহর। ছাড়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা আট-দশ কিলোমিটার অন্তর অন্তর বেশ কয়েকটা স্টেশনে ট্রেন থামল। তারপর ট্রেন প্রবেশ করল তার আসল যাত্রাপথে। দু’পাশে শুধু জনহীন প্রান্তর, তারপর শুরু হল চাঁদের আলোতে জেগে থাকা মরুভূমি। ট্রেন যেন প্রবেশ করল অন্য এক পৃথিবীতে। চাঁদের আলোতে কখনও কখনও চোখে পড়তে লাগল জনহীন মরুভূমিতে একলা দাঁড়িয়ে থাকা কোনও প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। হয়তো বা ফ্যারাওদের রাজত্বকালে সেখানে কোনও জনবসতি ছিল, কিন্তু আজ আর নেই। একবার এক জায়গায় এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল। জ্যোৎস্না মাখা মরুপ্রান্তরে কোনও অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে এগিয়ে চলেছে বিরাট বড় এক উটের কাফেলা। আমার ইংরেজি জানা সহযাত্রী জানাল, যাঁরা ওই উটের কাফেলা নিয়ে চন্দ্রালোকে মরুপথে এগিয়ে চলেছেন তাঁরা নাকি যাযাবর বা বেদুইন। সূর্যের প্রখর তাপ থেকে বাঁচার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে রাত্রিকালকেই বেছে নেন তাঁরা। রাত যত বাড়তে লাগল তত নিস্তব্ধ হতে শুরু করল কম্পার্টমেন্ট। মরুভূমির মধ্যে দিয়ে শুধু ট্রেনের ছুটে চলা। মাঝে মাঝে প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এসে দাঁড়াচ্ছে। স্টেশনের কাছাকাছি ছোট ছোট জনপদ আছে। কোনও কোনও যাত্রী নেমে যাচ্ছে সেই সব ঘুমন্ত প্ল্যাটফর্মে। এসব দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি।
লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচিতেই ঘুম ভেঙে গেল আমার। বাইরে তাকিয়ে দেখি আলো ফুটে গিয়েছে। বেশ কিছু বাড়িঘরও দেখা যাচ্ছে। আমার ইংরেজি জানা সহযাত্রী কোথায় কখন যেন নেমে গিয়েছেন। তবে অন্য যাত্রীদের কথাবার্তা ও তৎপরতার কারণ বুঝতে পারলাম। লুক্সার আসছে। যাত্রীরা সকলে সেখানেই নামবে। এরপর আমাদের যাত্রাপথের দু’পাশে আধুনিক নগর সভ্যতা চোখে পড়তে শুরু করল। আর তার মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে প্রাচীন স্থাপত্য। আর দূরে দিকচক্রবালে দেখা যাচ্ছে পাহাড়শ্রেণি। অনুমান করলাম ওই অঞ্চলই ভ্যালি অব দ্য কিংস বা ভ্যালি অব কুইনস। প্রাচীন রাজা-রানিদের সমাধিক্ষেত্র। অবশেষে পৌঁছে গেলাম লুক্সারে। মোটামুটি বড় স্টেশন। সাতসকালেই যাত্রীদের ভিড়। প্ল্যাটফর্মের বাইরে অনেক আধুনিক দোকানপাট, হোটেল। স্টেশন চত্বরে যেমন দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক গাড়ি তেমনই একপাশে রয়েছে উটের সারি। প্ল্যাটফর্মের বাইরে বেরতেই একদল লোক এসে ঘিরে ধরল আমাকে। তারা কেউ কেউ ট্রাভেল এজেন্সির লোক, কেউ বা আবার উট চালক। ট্রেনে আমার সহযাত্রীর পরামর্শ মতো তাদের পাশ কাটিয়ে প্ল্যাটফর্ম চত্বরের বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। পথের পাশে সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। তেমনই একটা হোটেলে মাথা গোঁজার স্থান পেয়ে গেলাম। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টও মিলে গেল সেখানে। পেট ভর্তি করে খেয়ে নিলাম। তারপর হোটেলের বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। লুক্সারকে স্থানীয় মানুষেরা ‘উকমার’ নামে ডাকে। একসময় এখানেই ছিল মিশরীয়দের প্রাচীন নগরী থিবস। যা ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম নগরীগুলোর মধ্যে অন্যতম। যার সাক্ষ্য আজও বহন করে চলেছে লুক্সারের বিখ্যাত কার্নাক মন্দির সহ অন্য প্রাচীন স্থাপত্যগুলো। আর এ শহরের ঠিক বিপরীতে নীলনদের ঠিক অপর দিকে অবস্থান করছে ভ্যালি অব দ্য কিংস, রানি হাতশেপসুতের শব মন্দির সহ আরও বেশ কিছু বিখ্যাত স্থাপত্য। হোটেলের বাইরে একপাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি কীভাবে আমার দেখা শুরু করা যায়। ঠিক সে সময় জিপ গাড়ির মতো একটা গাড়ি কাকতালীয়ভাবেই আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার পিছনটা খোলা। মুরগির খাঁচা বোঝাই সেখানে। ড্রাইভার লোকটা মাথা বের করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘সে নীলনদের ওপারে ভ্যালি অব দ্য কিংসের দিকে যাবে। ইচ্ছা করলে আমি তার সঙ্গী হতে পারি। সে আমাকে হাতশেপসুতের মন্দিরের কাছাকাছি টিকিট ঘরের সামনে নামিয়ে দেবে। বিনিময়ে মাত্র দু’শো ইজিপশিয়ান পাউন্ড দিলেই হবে। অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় সাড়ে তিনশো টাকার মতো। বুঝলাম এর চাইতে সস্তার বাহন আর পাব না। তাই এরপর ড্রাইভারের নির্দেশ মতো আমি উঠে বসলাম গাড়ির পিছন দিকে মুরগির খাঁচাগুলোর পাশে। মুরগিদের কোঁকোঁরকো ডাকের কনসার্ট সহ্য করতে হলেও অনেকগুলো টাকা বেঁচে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলনদ পেরিয়ে গেল গাড়ি। মসৃণ রাস্তা, পথের দু’পাশে বালির সমুদ্র। দূরের নেড়া পাহাড়গুলো ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। লুক্সার থেকে যাত্রা শুরু করে, আধ ঘণ্টা পর সে আমাকে নামিয়ে দিল নির্দিষ্ট জায়গায়। ভ্রমণ ব্লগগুলোতে কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি যে, মিশরের হোটেল-রেস্তরাঁয়, গাড়ির ড্রাইভার, গাইডদের ‘টিপ’ দেওয়া নাকি বাধ্যতামূলক এবং কত টাকা দিতে হবে সেটাও নাকি তারা বলে দেয়! আমাকে অবশ্য দু’বার মিশর ভ্রমণকালে এমন দাবির সম্মুখীন হতে হয়নি।
আমি যেখানে নামলাম সেখান থেকেই দেখতে পেলাম পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে রানি হাতশেপসুতের বিখ্যাত মন্দির! সকাল ন’টাও বাজেনি। ইতিমধ্যেই বেশ ভিড় কাউন্টারের সামনে। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা সৌধ দেখার টিকিট কিনতে হয় এখানে। টিকিট কাউন্টার থেকে হাতশেপসুতের মন্দির দূরত্ব এক কিলোমিটার মতো। মিশরের প্রাচীন সৌধগুলো যাতে দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য পেট্রল বা ডিজেল চালিত গাড়ি সৌধের কাছে যেতে দেওয়া হয় না। অনেকেই হেঁটে যাচ্ছে। টিকিট কাউন্টারের লাগোয়া সে পথের দিকে এগতেই কয়েকজন ফেরিওলা এসে আমাকে ঘিরে ধরল। তাদের হাতে ঝুলছে সূর্য দেবতার প্রতীক চিহ্ন আঁকা ধাতব পেনডেন্ট, কারও কাছে ওই চিহ্ন খোদাই করা আংটি। তাদের কথা শুনে বুঝলাম যে, আমন দেবতার ওই চিহ্ন ধারণ করেই নাকি হাতশেপসুতের মন্দির বা রাজা-রানিদের সমাধিক্ষেত্রে যাওয়া উচিত। নইলে নাকি তাদের অভিশাপ লাগতে পারে। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা তুতেন খামেনের কবরের অভিশাপের সেই বহুশ্রুত কাহিনিরও উল্লেখ করছে পর্যটকদের প্রভাবিত করার জন্য। অনেক পর্যটককে দেখলাম সেগুলো কিনে গলায় বা হাতে পরছেনও। হয় বিক্রেতাদের কথা বিশ্বাস করে অথবা সুভেনির হিসাবে রাখার জন্য। আমি এগলাম মন্দিরের দিকে। নীলনদের দু’পাশে এ অঞ্চলে প্রধান তিনটি দ্রষ্টব্য হল কারনাক মন্দির, হাতশেপসুতের মন্দির ও ভ্যালি অব দ্য কিংসে অবস্থিত তুতেন খামেনের সমাধি। রুক্ষ বালুকাময় অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে পথ এগিয়েছে। দৃশ্যপটে জেগে আছে নেড়া পাহাড়। রাস্তার দু’পাশে কোথাও কোথাও রয়েছে মানুষের মুখ ও সিংহর দেহধারী স্ফিংস মূর্তি, কোথাও বা ঈগল পাখির মুখ আর মানুষের দেহ সমন্বিত আকাশ দেবতা হোরাম ও অন্য মিশরীয় দেবদেবীদের মূর্তি।
রানি হাতশেপসুতের সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পনেরোশো অব্দ। প্রাচীন মিশরের আঠারোতম রাজবংশর ষষ্ঠ ফ্যারাও হিসাবে তিনি নীলনদের সভ্যতাকে শাসন করেছিলেন। হাতশেপসুতের আগে দু’জন ও পরবর্তীকালেও বেশ কয়েকজন নারী মিশর শাসন করেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র দু’জন মহিলা শাসক হাতশেপসুত ও ক্লিওপেট্রা মিশরের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতা, স্থাপত্য নির্মাণ এবং অবশ্যই তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের বৈচিত্র্য ও রহস্যময়তার কারণে। যেমন হাতশেপসুত পুরুষদের মতো পোশাক পরিধান করতেন এবং ফ্যারাওদের মতো চিবুকে নকল দাড়ি পড়তেন। এ মন্দিরে তিনি মৃত আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য শব সাধনাও করতেন বলে অনেকের বিশ্বাস।
অবশেষে এসে উপস্থিত হলাম মন্দিরের কাছে। পাহাড়ের ঢাল থেকে মাটিতে নেমে এসেছে ত্রিতল বিশাল প্রশস্ত এই মন্দির। প্রতিটি তলের বাইরের অংশই সারামার স্তম্ভ সমন্বিত। দূর থেকে দেখলে থামওয়ালা টানা বারান্দার মতো দেখতে লাগে প্রতিটা তলকে। মন্দিরের কিছুটা তফাত থেকে একটা ঢালু পথ রয়েছে মন্দিরের ওপরে যাওয়ার জন্য। যে পথে একসময় চলাচল করত ফ্যারাও রানি হাতশেপসুতের স্বর্ণরথ। পথের দু’পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকত কাস্তের ফলার মতো তলোয়ার হাতে গার্ডরা। সে সময় ছিল আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে। এ পথে হাঁটতেই কেমন যেন রোমাঞ্চ লাগে।
উঠে এলাম রানি হাতশেপসুতের মন্দিরে। বিশাল বিশাল স্তম্ভগুলোর গায়ে দাঁড়িয়ে আছে ফ্যারাওদের বিশাল বিশাল মূর্তি। মিশর গবেষকদের মতে, রানির নির্দেশে তাঁর মন্ত্রী মতান্তরে রানির প্রেমিক মেনসুতের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয় বিশাল এই মন্দির। যা উৎসর্গ করা হয় মিশরীয়দের প্রধান দেবতা ‘আমন রা’ কে। চুনাপাথর, বেলেপাথর আর গ্রানাইট পাথরের তৈরি এই মন্দির সংযুক্ত ছিল, ‘দেইর-এল-বাহারি’ নামক এই পার্বত্য অঞ্চলের আরও কিছু মন্দিরের সঙ্গে। যেগুলি বর্তমানে অবলুপ্ত। হাতশেপসুতের মৃত্যুর পর তাঁর বহু স্থাপত্যকীর্তি পরবর্তী ফ্যারাও তৃতীয় থোথ কোনও অজ্ঞাত কারণে ধ্বংস করে দেন। এমনকী প্রাচীন মিশরীয় লিপি থেকে জানা যায় যে হাতশেপসুতের মমিটিকে কোনও অজ্ঞাত স্থানে কবর দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সময়ে এ মন্দিরেরও বেশ কিছু পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। বর্তমানে এ মন্দিরের দুটি অংশ। একটি অংশ যা ব্যবহার করা হতো সূর্যদেবের উপাসনা করার জন্য ও বিভিন্ন উৎসব পালনের জন্য। আর দ্বিতীয় অংশ ব্যবহার করা হতো মর্গ হিসাবে। প্রথম অংশটাতে ঘুরতে শুরু করলাম আমি। স্তম্ভ, দেওয়ালের গায়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবী ও ফ্যারাওদের বিশাল বিশাল সব মূর্তি, দেওয়ালের গায়ে আঁকা প্রাচীন মিশরীয়দের জনজীবন।
প্রথম অংশ দেখার পর গিয়ে উপস্থিত হলাম মন্দিরের যে অংশে আগে মর্গ হিসাবে ব্যবহার হতো। যে কারণে এ মন্দিরের নামের সঙ্গে ‘মরচুয়ারি’ শব্দটা জড়িয়ে আছে। এই স্থান ব্যবহার করা হতো মমি তৈরির কাজে। এখানকার বেশ কিছু দেওয়াল চিত্রে মমিকরণ প্রক্রিয়ার ছবি দেখা যায়। অন্য একটি মত হল, এ স্থানে রানি হাতশেপসুত শবদেহ নিয়ে প্রেতচর্চা করতেন। মৃত্যুর দেবতার আরাধনা করতেন। মজার ব্যাপার হল, মন্দিরের মধ্যে এই বিশেষ স্থানটি থাকার কারণেই নাকি হাতশেপসুতের বহুকীর্তি ধ্বংস করলেও পরবর্তী শাসকরা এ মন্দির ধ্বংস করার সাহস পাননি। কারণ তাঁরা প্রেতাত্মাদের অভিশাপের বিষয়টি বিশ্বাস করতেন। বিশাল বিশাল সব শূন্য হল ঘর রয়েছে এখানে। হাঁটলে নিজের পায়ের শব্দ ছাড়া অন্য শব্দ শোনা যাবে না। আধো অন্ধকার কক্ষগুলোতে কিছু বেদি রয়েছে। সম্ভবত তার ওপর শব রেখে ব্যবচ্ছেদ করা হতো। হঠাৎই তেমনই একটা ঘরে একটা বেদির ওপর বসে থাকা মৃত্যুর দেবতা আনুবিসের কালো মূর্তি দেখে প্রচণ্ড চমকে গিয়েছিলাম। সত্যি বলতে মুহূর্তর জন্য ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। তারপর সে লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এল আমার দিকে। এ তো আনুবিস নয়! একটা কালো সারমেয়! আমি ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে তাকে খেতে দিলাম।