


নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: ঘটনা ১— রানিগঞ্জের আনন্দলোক হাসপাতালের বিপরীতে ডক্টর কলোনির একটি নার্সিং হোম। সেই নার্সিং হোমে প্রসুতি মৃত্যু নিয়ে স্বাস্থ্যদপ্তরে অভিযোগ হয়। তদন্তে উঠে আসে, প্রসবের সময়ে নার্সিং হোমে ছিল না কোন প্রশিক্ষিত নার্স। যার জেরেই মৃত্যু। স্বাস্থ্যদপ্তর প্রাথমিক ভাবে এক মাসের জন্য নার্সিং হোমের লাইসেন্স সাসপেন্ড করে। জানা গিয়েছে, নার্সিং হোমের স্টার্ফরা কর্মচ্যুত হবে এই অজুহাতে জেলাশাসকের কাছে নার্সিং হোমে খুলে দেওয়ার জন্য দরবার শুরু হয়েছে।
ঘটনা ২— চলতি মাসে অণ্ডাল থানার উখরা স্টেশনের কাছে একটি নার্সিং হোমে আচমকা অভিযানে যান জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সহ স্বাস্থ্যদপ্তরের আধিকারিকরা। সেখানে গিয়ে তাঁদের চক্ষু চড়ক গাছ। নার্সিং হোমে নেই কোনও আরএমও। একজনও স্টাফ নার্স নেই। পরিচ্ছন্নতা তথৈবচ। সংক্রমণ হওয়ার প্রবল সম্ভবনা। নার্সিং হোম চলছে ঈশ্বরের ভরসায়। স্বাস্থ্যদপ্তর এই নার্সিং হোমটির লাইসেন্সও এক মাসের জন্য সাসপেন্ড করে।
সাম্প্রতিকালে এই দু’টি ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও আসানসোল, দুর্গাপুর, রানিগঞ্জ, কুলটি সহ জেলার বড় শহরের নার্সিং হোমগুলির পরিকাঠামো নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ। ন্যূনতম পরিকাঠামো ছাড়াই চলছে নার্সিং হোম। খাতায় কলমে চিকিৎসক, নার্সের হিসেব দেখানো হলেও বাস্তবে তাঁদের কোনও অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না। হাতুড়ে চিকিৎসক আর আয়ার ভরসায় চলছে বহু নার্সিং হোম। রোগীর জীবন নিয়ে প্রতিদিন এই ছিনিমিনি খেলা চললেও কোনও কঠোর পদক্ষেপ করা হয় না। সাময়িক লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হলেও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে অচিরেই সাসপেনশন উঠে যায়।
ছোট নার্সিং হোম, ক্লিনিকে পরিকাঠামোর অভাবের পাশাপাশি নানা অসাধু কাজ চলারও অভিযোগ আছে। কুলটি, রানিগঞ্জ এলাকায় কন্যাভ্রুণ হত্যা এখনও চলছে বলে স্বাস্থ্যদপ্তরের কাছে খবর। মঙ্গলবার জেলাশাসকের অফিসে স্বাস্থ্য বিভাগের টাস্ক ফোর্সের বৈঠক হয়। সেখানেই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করা হয়।
জেলার বেসরকারি হাসপাতালগুলিও ধোয়া তুলসি পাতা নয়। সেখানেও স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে অজস্র অভিযোগ। রানিগঞ্জের বাঁশড়া এলাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ে প্রায়দিন অভিযোগ উঠছে। একই ভাবে আসানসোল শহরের বুকে একাধিক হাসপাতালে রোগী মৃত্যু ঘিরে আত্মীয়দের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিবাদ নিত্যদিনের ঘটনা। একই অভিযোগ দুর্গাপুরের একাধিক বড় বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। উখরার বাসিন্দা প্রভাত কুণ্ডুকে দুর্গাপুরের একটি হাসপাতালে অপারেশনের জন্য ভর্তি করা হয়। আর্থিক প্যাকেজ আগেই চূড়ান্ত হয়ে যায়। এরপর ভুল অপারেশনের জন্য রোগীকে খেসারত তো দিতেই হয়, পাশাপাশি বিপুল টাকা রোগীর পরিবারকে বাড়তি দিতে হয় বলে অভিযোগ। তাঁদের আক্ষেপ স্বাস্থ্যদপ্তরে অভিযোগ জানিয়েও কাজ হয়নি। মঙ্গলবারই আসানসোলের একটি হাসপাতালে শিশু মৃত্যু নিয়ে অশান্তি হয়। পরিবারের অভিযোগ, আগে তিনটি শিশুটি মারা গেলেও শুধু টাকা নেওয়ার জন্য মৃত শিশুদের আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। যখন শিশুটিকে বের করা হয়, দেখা যায় শরীর বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে।
বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় অরাজকতা নিয়ে জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না পুলিশ, প্রশাসনকে। অনেক সময়ে হতাশ হয়ে নাগরিকরা আইনশৃঙ্খলা হাতে তুলে নিচ্ছে। নার্সিং হোম, হাসপাতাল ভাঙচুর হচ্ছে।
জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শেখ মহম্মদ ইউনুস বলেন, অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে কঠোর পদক্ষেপ করা হয়। দু’টি নার্সিং হোমের লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে।