


অনুভা নাথ: বাবা, আমার মাথা খা, তোর বাপকে কিছু বলিস নে। তিনি মেজাজ গরম মানুষ। এখন ধান কাটার মরশুম, তিনি এমনিই ব্যস্ত। পরে না হয় সময় করে...’ মুখুজ্জে গিন্নি আর কথা বলতে পারলেন না। এইটুকু কথার ধকলে মনে হচ্ছে যেন তিনি সাত ক্রোশ দৌড়ে এসেছেন। হাঁপানির তোড়ে তাঁর চোখ মুখ ঠেলে বেরিয়ে আসবে বলে মনে হল। বিভূতি কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর দৌড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
‘এই গরম চা, গরম চা...’ বিভূতি ধড়মড় করে ট্রেনের কামরায় উঠে বসল। আজকাল এই স্বপ্নটা বারেবারে দেখে সে। জেনারেল কামরায় কাঠের সিটে বিভূতি আরও জড়োসড়ো হয়ে বসল। ওর পাশে বসা এক হিন্দুস্থানি লোক নাক ডাকছে। বিভূতি খেয়াল করল, নাকডাকার একটা নিজস্ব তাল আছে। ওর মনে হল, ঘুমন্ত শরীরও কি তাহলে তাল বোঝে? তবে, পরক্ষণেই বিভূতির মনে হল, এখন এসব নিয়ে চিন্তা করার সময় তার নেই। স্বপ্নটা ওকে ক’দিন ধরেই ভাবাচ্ছে।
এতগুলো বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন। কেমন আছে তার পুরনো গ্রাম? মা চলে যাওয়ার পর তাঁর পারলৌকিক কাজের আগের দিনে কাছা পরে সে একরকম জোর করেই চেপে বসেছিল কলকাতাগামী ট্রেনে। জেদি বিভূতির চোখ ভরে উঠেছিল জলে। সে জল কয়লার ইঞ্জিনের জন্য নাকি মা মারা যাওয়ার জন্য তা সে ছাড়া আর কেউ জানে না।
বিভূতি ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল, কালো গরাদের বাইরে চলন্ত দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে, বায়োস্কোপ যেন! কী এক অজানা ভাবনায় মন বারবার ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। ডবরদিহি স্টেশন পার হয়ে গেল। এইবার বিভূতি উঠে দাঁড়াল, কাঁধের ঝোলানো ব্যাগটা আঁকড়ে ধরল। নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকাল, অনামিকায় আংটির সাদা দাগ। রূপগঞ্জে আসবে বলে সোনার আংটি ঘরে খুলে রেখে এসেছে। সারাদিনে এই একটাই ট্রেন রূপগঞ্জে আসে। বিভূতি এইবার নামার জন্য তৈরি হল। অবশ্য, ছোট স্টেশনে নামার লোক প্রায় নেই বললেই চলে।
স্টেশনে নামতেই কার্তিকের ঠান্ডাটা ঝাপটা মারল বিভূতি মুখুজ্জের গায়ে। বহু বছর পর গাঁয়ে ফিরছে সে। বাপ তাকে চিনতে পারলে হয়। গায়ের চাদরটা গলার কাছে ভালো করে জড়িয়ে সাইড ব্যাগটা কাঁধে তুলে বিভূতি হাঁটা দিল। তার চকিতে পনেরো বছর আগের মা-বাবার মুখ মনে পড়ল, তার সঙ্গে আরও একজনের মুখ মুহূর্তে ওর চোখের সামনে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। ডুরে শাড়ি, কলা বিনুনি করে বিভূতির সঙ্গে সে বনে বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়াত। আঠেরোর বিভূতি তখন কৈশোরের হালকা আঁচে লীলার আয়ত নয়নের দৃষ্টিকে সেঁকে নিত। সেকি আজও আছে, ওইরকম চপলা কিশোরী? নিজের অজান্তেই ওর বুকের মধ্যে থেকে দীর্ঘশ্বাস উঠে এল। সময় কারওর জন্য কখনও থেমে থাকে না। বিভূতি নিজের কথা ভাবল, কপর্দকহীন হয়ে কলকাতা এসে বেঁচে থাকার জন্য কী না করেছে সে— মুটের কাজ থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি সব্জি বেচা। তবুও ভাগ্যের কাছে হেরে যাইনি কখনও। বিভূতির হাঁটার গতি কমে এল। সামনের ওই বাঁকটার পরেই শিলাবতী নদী পড়বে। ওর মনে পড়ল, ছেলেবেলায় সে নদীর ওপরে কাঠের সেতুটায় দাঁড়িয়ে নীচে বড় বড় ঢিল ছুঁড়ত, নদীর মধ্যে সেই জলের আওয়াজ যেন আজও ওর কানে কার্তিকের কুয়াশার মতো লেগে রয়েছে। শিলাবতী নদীর চরে পা ডুবিয়ে লীলার সঙ্গে একবার খুব দৌড়েছিল। শেষে কিশোরী লীলা জলে পড়ে গিয়েছিল। বিভূতি ওর হাত ধরে টেনে তুলেছিল, ভিজে যাওয়া কিশোরীর অপাপবিদ্ধ মুখটা বিভূতির আজও মনে আছে। লীলার চোখের পাতায় লেগে থাকা শিলাবতীর সেই জল, সদ্য তরুণ বিভূতির মনের উচ্ছ্বাস— মনে হয় বুঝি গলির মোড়ের মতো। বাঁক ঘুরলেই আবার যেন সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে। বিভূতি মুচকি হাসল। সামনে দেখল, শিলাবতীর পাড় ধরে উঁচু দেওয়াল উঠছে। বিভূতি রাতের অন্ধকারে সেই লম্বা দেওয়ালের সামনে এসে দাঁড়াল। দেওয়াল টপকে নদীটাকে সে দেখতে পেল না আর। বদলে শুনল তার অস্তিত্বর শব্দ। কলকল আওয়াজটা একই রকম আছে, তবে বিভূতির মনে হল, বুঝি এই আওয়াজের সঙ্গে মিলেছে অভিমানের বুদবুদ। ‘এত বছর পর কেন এসেছ? আমি কতটা বদলেছি?’ ওর মনে হল বুঝি শিলাবতী কলকলিয়ে ক্রমাগত এই কথাই বলে চলছে।
সে শিলাবতী ছাড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে দিল। মা মারা যাওয়ার পর বাবার সঙ্গে আর ওই বাড়িতে সে থাকতে চায়নি। বাবার বিরুদ্ধে তার মনে জমে উঠেছিল রাগ আর দুঃখের বারুদ। মায়ের প্রতি বাবার আজীবন অবহেলা সে সহ্য করতে পারেনি। তবে আবার এতগুলো বছর পার করে সে রূপগঞ্জে কেন এল? বিভূতি হাঁটতে লাগল বাড়ির উদ্দেশে।
বহুদিন এত হাঁটার অভ্যাস নেই বিভূতির। এখন তো বেশিরভাগই হয় নিজের বাইকে নয়তো বাসে, ট্রামে চলাচল করে সে। সে ধীর, ক্লান্ত পায়ে যত রূপগঞ্জের মধ্যে দিয়ে বাড়ির দিকে এগতে লাগল তত যেন এই গ্রাম ওর কাছে হয়ে উঠল আরও অচেনা। গ্রামের রাস্তা, বাড়ির বারান্দাগুলো যেন অভিমানী প্রেমিকার মতো ওর কানে কানে বলতে লাগল, ‘কেন এসেছ আবার? কী চাও? সময় বদলে গেছে। এখানে তোমার আর কিছুই চেনা নেই, কিচ্ছু না।’
হাঁটতে হাঁটতে সে একসময় নিজের বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। একটু ইতস্তত করল, কী দরকার বাড়ি গিয়ে? এখান থেকে ফিরে গেলেই তো হয়। কেউ কিছুই জানবে না। তারপর, মনের দ্বন্দ্ব সরিয়ে বিভূতি দরজায় কড়া নাড়তে গেল। কিন্তু পাল্লায় হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি খুলে গেল। সামনে ঢাউস উঠোন। তারপর দালান পেরিয়ে দুটো ঘর রয়েছে। একটা ঘরের মধ্যে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। বিভূতি ততক্ষণে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেছে। সে একজন মহিলার গলা শুনতে পেল। ‘মরণ হয় না কেন তোদের? আমার হাড়মাস সব জ্বালিয়ে খেল! দু’দণ্ড যে একটু চুপ করে বসবে তার জো নেই। শুধু রাবণের চিতা জ্বলছে প্যাটে।’ টিমটিমে আলোর ঘর থেকে দুটো বাচ্চার কান্নার শব্দ শোনা গেল। মনে হচ্ছে, ওদের মা বাচ্চা দুটোকে পিটিয়েছে। বিভূতি বুঝতে পারছে না এরা কারা! এভাবে কাটল মিনিট খানেক। তারপর সে দেখল, একটি মহিলা আলোর কুপি নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। বিভূতি বউটির মুখের দিকে তাকাল। পুরনো একটি শাড়ি কোনওরকমে গায়ে জড়ানো। দেখে মনে হচ্ছে, একটা বাঁশের গায়ে কাপড় পেঁচানো। আলোর ক্ষীণ শিখাটা দপদপ করে উঠল। বিভূতির মনে হল, বউটির রুগ্ন চেহারার ছাপ পড়েছে আলোটির ওপরও। বিভূতি একটু ভালো করে খেয়াল করল, বউটি সন্তানসম্ভবা। ‘মনে হয়, তেল কমে গিয়েছে’ সে বলে উঠল। বউটি ওকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। সেটি কাটিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল ‘কাকে চাই?’ হালকা ঘোমটার আড়ালে রুক্ষ চুলওটা মুখটার দিকে তাকিয়ে বিভূতি বলল,
‘আআআমি বিভূতি মুখুজ্জে, কালীচরণ মুখুজ্জের...।’
ওর কথা আর শেষ হল না। বউটি চাপা আর্তনাদ করে দ্রুত পায়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। বিভূতি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকারের মধ্যে। কিছুক্ষণ পরে ঘরের দরজা খুলে দালানে বেরিয়ে এলেন অস্থিচর্মসার এক বৃদ্ধ। ‘বাবা বিভু, তুই শেষ পর্যন্ত এয়েছিস?’ বিভূতি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর বাবা বউটির দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘বিভুকে আবার কীসের লজ্জা গা? সুটো বেলায় ওর সঙ্গে কত বনে-বাদাড়ে খেলছস।’ ততক্ষণে বিভূতি বিস্ফারিত চোখে বউটির দিকে তাকিয়েছে। লীলাই বটে! ঘটনার আকস্মিকতায় বাবাকে প্রণাম করার কথা সে বেমালুম ভুলে গেল। তার মন তখন উড়ো পাতার মতোই জীবনের পাতা সরিয়ে আঠারো বছরে পিছিয়ে গেছে। ওর মন হল, মাথাটা বুঝি এক্ষুনি ফেটে যাবে। মা মারা যাওয়ার পর বাবার এতটা অধঃপতন হল কেমন করে, বিভূতির মন তখন সেই চিন্তায় মগ্ন হয়ে উঠল। ওর বাবা বোধহয় কিছু আন্দাজ করলেন, রোগজর্জর গলায় বলে উঠলেন ‘তর মা মারা যাওনের পর তুই তখন বেবাগী হলি। অর বাপ আমার সঙ্গী বিয়া দিল। কী আর করব বল...।’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ‘না বিয়া দিলে উপায় কী? লীলা তখন তেরো, মেয়ের বিয়া না দিলে অরা একঘরে হয়ে যেত।’
বিভূতির চকিতে মনে পড়ে গেল, বাড়ি আসবার পথে শিলাবতী নদীটাও তো এমন করেই অচেনা হয়ে গিয়েছে।
রাতে খেতে বসে লীলা জনান্তিকে বিভূতির সামনে এল। বিভূতি ওর গর্ভের দিকে তাকিয়ে যেন আরও কুঁকড়ে গেল। লীলা কিছুক্ষণ শাড়ির আঁচল আঙুলে জড়াল তারপর একটু গলা খাঁকরি দিয়ে বলল, ‘আপনার বাবার শরীলের অবস্থা তো দেকলেন। গতমাসে লাইট কেটে দিছে। এট্টু জমি চাষের জন্যি ভাড়া দিয়ে কোনওমতে চলছি। এরমদ্যি বাড়ি, জমির ভাগ আপনাকে দিতে পারবনি।’
এবাড়ির মোটা চালের ভাত বলে বিভূতির গলা দিয়ে নামছে না। এত কমদামি চাল সে বহু বছর খায় না। চিকন চাল আর দামি ডাল দিয়ে সে খাবার খায়। বিভূতি ভাতগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবল, বাস্তব কতটা কঠিন! সে লীলার কথার উত্তর দিতে চাইল, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরল না। তার গলার কাছে শীতের ঠান্ডার মতো একরাশ যন্ত্রণা জমে উঠল।
রাতে সবাই শুয়ে পড়ল, শুধু বিভূতির চোখে ঘুম নেই। তার এখন নিজেকে মনে হচ্ছে, একটা কলের পুতুল। এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরও সে কেমন করে এমন নির্বিকার রয়েছে তা সে নিজেও বুঝতে পারছিল না। সে নিভু লম্ফের আলোয় ঘরের দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ছবিটার দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখ ভরে উঠল নোনতা জলে। সে মনে মনে তার স্বর্গীয় মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কেন মা, কেন আমার ছোট্ট স্বপ্নটা ভেঙে দিলে? বেশ তো অলীক কল্পনা মনের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বেঁচেছিলাম। তোমার ছবিটাই তো শুধু চেয়েছিলাম। তাই তো এত বছর পরেও ফিরে এসেছিলাম রূপগঞ্জে। এইভাবে। কেন যে আমি আজও বিয়ে করতে পারলাম না, কেন এ গ্রামের ছবি, এ নদীর শব্দ আমার মনকে আজও আতরের মতো সুবাসিত করেছে তা হয়তো আমি নিজেই জানি না।’
ভোররাতে বিভূতি তার সঙ্গের ব্যাগের মধ্যে ঘরে টাঙানো মায়ের ধুলোমাখা ছবিটা ভরে নিল। ফার্স্ট ট্রেনটা ধরলে আজই কারখানায় গিয়ে বসতে পারবে। নিজের ব্যবসায় টাকার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়তি হয়। সে ট্রেনের ভাড়া ছাড়া পার্সের সব টাকাগুলো খাটের ওপর উপুড় করে দিল।
হাঁটতে হাঁটতে শিলাবতীর সামনে এসে খানিক দাঁড়াল। তখনও ভোরের আলো ছোঁয়নি রূপগঞ্জের আকাশ। সে কী ভেবে একটা ঢেলা তুলে নদীতে ফেলতে গিয়েও ফেলল না। সময়ের আবর্তে নদীর মতোই মানুষও বদলায়, হয়ে ওঠে অচেনা। এই নির্মম সত্যটা উপলব্ধি করতে করতে সে স্টেশনের উদ্দেশে হাঁটা দিল। তার মন তখন কার্তিকের ঘন ঠান্ডার চেয়েও বেশি আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে এক অন্যরকম গভীর ও অবশ করা শীতলতায়।