


ভারতের টেস্ট ক্রিকেটের রাশ এখন তাঁর হাতে। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড সফরে তিনটি সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন। তাই ক্রিকেট ভক্তরা বলতে শুরু করেছেন, কিং কোহলির যোগ্য উত্তরসূরি হলেন শুভমান গিল। পাঞ্জাবের এই ভূমিপুত্রের সিঁড়ি ভাঙার গল্প শোনালেন সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়
পাঞ্জাবে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন ছোট্ট গ্রাম ফাজিলকা। সেখানের এক চাষির ছেলে লকভিন্দর সিং ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সংসারে অনটন, উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে তাঁর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। কিন্তু কথায় আছে না, ‘বাপ কা বেটা, সিপাহি কা ঘোড়া, কুছ নেহি তো থোড়া থোড়া।’ লকভিন্দর লক্ষ করেন, তাঁর ছেলেও ক্রিকেটপাগল। জ্ঞান হওয়ার পর ব্যাট-বল ছাড়া কোনও খেলনাই ছুঁয়ে দেখে না। সারাক্ষণ ক্রিকেট আর ক্রিকেট। সেদিনই তিনি সঙ্কল্প করে ফেলেন, নিজে পারেননি ঠিকই, তবে ছেলের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে কোনও বাধা আসতে দেবেন না। তাই গ্রামের সুখী জীবন ছেড়ে সপরিবারে চলে আসেন মোহালিতে। যাতে চার বছরের ছেলে ক্রিকেট শিখতে পারে। তাই মোহালি স্টেডিয়াম থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বেই বাড়ি ভাড়া নেন। অজানা শহর, নতুন পরিবেশে সংসার চালানো সহজ ছিল না পেশায় কৃষক লকভিন্দরের। কিন্তু ছেলের স্বপ্নের জন্য জীবন বাজি রাখতেও রাজি ছিলেন তিনি। আর তাঁর এই দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের মর্যাদাও রেখেছেন ছেলে। সেই ছেলে আর কেউ নন, বর্তমানে ভারতীয় টেস্ট দলের অধিনায়ক শুভমান গিল।
ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটে বিরাট কোহলি-রোহিত শর্মা উত্তরযুগে ব্যাটন শুভমানের হাতে। ২৫ বছর ২৮৫ দিন বয়সে পঞ্চম কনিষ্ঠ হিসেবে অধিনায়কের দায়িত্ব নেন। আর প্রথম সফরেই অ্যাসিড টেস্ট। অনেকেই ভেবেছিলেন, ইংল্যান্ড সফরে চাপের প্রেশার কুকারে চুপসে যাবেন গিল। কিন্তু সব আশঙ্কা টেমস নদীতে ভাসিয়ে প্রথম টেস্ট থেকেই জ্বলে উঠেছেন তিনি। লিডসে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বুঝিয়ে দেন, ‘প্রিন্স’ তকমা অতীত, এবার ভারতীয় ক্রিকেটে রাজত্ব করবেন। আর দ্বিতীয় টেস্টে আরও একধাপ এগিয়ে দুই ইনিংসেই শতরান হাঁকালেন। না! ভুল লেখা হল। থুড়ি প্রথম ইনিংসে দ্বিশতরান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে দেড়শোর বেশি রান করেন তিনি। বিরাট কোহলির পর দ্বিতীয় ভারতীয় অধিনায়ক হিসেবে প্রথম দুই টেস্টে তিনটি সেঞ্চুরির কৃতিত্ব দেখালেন। সাধে তো আর তাঁকে ‘কিং কোহলি’র যোগ্য উত্তরসূরি বলা হয় না। এমনকী, এক টেস্ট সিরিজে ভারতীয়দের মধ্যে সর্বাধিক রান সংগ্রাহকও এখন শুভমান (৬০৩)। ভেঙে দিয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়ের ২৩ বছরের পুরনো রেকর্ড। সবে তো পাঁচ ম্যাচের সিরিজে তিনটি ম্যাচ হয়েছে। সিরিজ শেষ হতে হতে অনেক রেকর্ডই ভেঙে দেবেন নিশ্চয়ই। শুধু ব্যাট হাতে দাপট দেখানো নয়, মাঠে নেতৃত্বও দিচ্ছেন দক্ষভাবে। প্রয়োজন পড়লে আগ্রাসী হতেও পিছপা হচ্ছেন না। লর্ডস টেস্টেই তো তৃতীয় দিনের শেষ দুই ইংলিশ ওপেনার ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করলে তাঁদের উপর ক্ষোভ উগরে দেন। যুবরাজ সিংয়ের হাতে গড়া, তারপর অনুপ্রেরণা বিরাট কোহলি— আগ্রাসন তো থাকবেই। সেই সঙ্গে বড় মঞ্চে উজ্জ্বল পারফরম্যান্সও মেলে ধরছেন। আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করলে, ‘ক্যাপ্টেন লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট!’
পাঞ্জাবের বর্ডার সংলগ্ন গ্রাম থেকে ভারতীয় টেস্ট দলের অধিনায়ক গিল— সফরটা মোটেও মসৃণ ছিল না। কিন্তু ওই যে, হার স্বীকার করা বাবা-ছেলে কারওরই অভ্যাসে নেই। ছোট থেকেই বাবার অনুগত শুভমান অনুশাসনে বড় হয়েছেন। তাঁর প্রথম কোচ বাবা লকভিন্দরই। ৯ বছরের শুভমানকে দিনে ১৫০০টি বল থ্রো ডাউন খেলাতেন। এছাড়া বলের সঙ্গে ব্যাটের সংযোগ বাড়াতে স্টাম্প নিয়ে ব্যাটিং করাতেন। ছেলেকে যে আউট করতে পারবেন, তাঁকে ১০০ টাকা পুরস্কারও দিতেন। অভাবের সংসার, তাই বাবার গ্যাঁটের কড়ি খরচ যাতে না হয়, ক্রিজে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতেন ছেলে।
শুভমানের কেরিয়ারে অনেকেরই অবদান রয়েছে। ছোট্ট গিলের প্রতিভা নজর এড়ায়নি প্রাক্তন ক্রিকেটার কারসন ঘাউরিরও। ২০০৯-’১০ সালের কথা। পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ‘অল ইন্ডিয়া পেস বোলার্স ক্যাম্পে’র আয়োজন করেছিল। দায়িত্বে ছিলেন ঘাউরি। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৮-১৯ বছরের পেসাররা অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাতে উল্লেখযোগ্য নাম রাজস্থান রয়্যালসের পেসার সন্দীপ শর্মা। কিন্তু তাঁদের বল খেলার জন্য ভালো ব্যাটার ছিল না। তাই পিসিএ’র কাছে ঘাউরি আবেদন করেন, কয়েকজন ব্যাটার পাঠাতে। অবশ্য সেদিন বৃষ্টি শুরু হলে আর ট্রায়াল হয়নি। তাই ঘাউরি ও তাঁর সহকারী ইন্ডোর স্টেডিয়ামের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তখন তাঁদের চোখে পড়ে, পাশের এক মাঠে বৃষ্টির মধ্যেই খেলছে ১০-১২ বছরের কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজনের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হন ঘাউরি। ১১ বছরের এক বাচ্চা যেমন তার জমাট ডিফেন্স, তেমনই সব দৃষ্টিনন্দন শট খেলছে। আর মাঠের পাশে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক খেলা দেখছেন। তাঁকে ঘাউরি জিজ্ঞাসা করেন, ‘এই ছেলেটা কে আপনি জানেন?’ তখন সেই ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ছেলে।’ পরের দিন ওই বোলারদের ক্যাম্পে গিলকে নিয়ে আসার জন্য লকভিন্দর সিংকে অনুরোধ করেন ঘাউরি। সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে সেই ঘটনা তুলে ধরে প্রাক্তন ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘ক্যাম্পে ১৮-১৯ বছরের বোলারদের সাবলীলভাবে খেলছিল শুভমান, যা আমায় মুগ্ধ করে। তারপরই পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টকে বলি, এই ছেলেটাকে অনূর্ধ্ব-১৪ দলে নিতে।’ সেই ঘটনার পর আর পিছনে ফিরে তাকাননি শুভমান। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে রানের বন্যা বইয়ে দেন তিনি। ২০১৩-’১৪ এবং ২০১৪-’১৫ টানা দু’বছর সেরা জুনিয়র প্লেয়ারের পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে। এরপর মাত্র ১৮ বছর বয়সেই পাঞ্জাবের হয়ে রণজি ট্রফিতে অভিষেক হয় গিলের। সেখানে যুবরাজ সিংয়ের মতো তারকা ক্রিকেটারের সান্নিধ্য পান তিনি। তাঁর কেরিয়ারে উন্নতির পিছনে যুবিরও অনেক অবদান রয়েছে। শুভমানকে ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসেন ভারতের এই প্রাক্তন বাঁ হাতি ব্যাটার। শুভমান ও অভিষেক শর্মাকে নিজের বাড়িতে ডেকে আলাদা করে অনুশীলন করান যুবি। আর শুভমান পুরো ক্রিকেট বিশ্বের নজরে আসেন ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। সান্নিধ্য পান কিংবদন্তি রাহুল দ্রাবিড়েরও। আর ছ’ম্যাচে একটি শতরান সহ ৩৭২ রান করে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করার পিছনে বড় অবদান রাখেন এই পাঞ্জাব তনয়। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও শুভমান। সেই সুবাদে ওই বছরেই আইপিএল নিলামে তাঁকে চড়া দামে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। জাতীয় দলে অভিষেকেও বিলম্ব হয়নি। ২০১৯ সালে ৩১ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওডিআই দলে পথচলা শুরু তাঁর। আর টেস্টে অভিষেক ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে অজিদের মাটিতেই স্টিভ স্মিথদের হারানোর অন্যতম কারিগর ছিলেন গিল। গাব্বায় দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ৯১ রানের ইনিংস বহুদিন মানুষের মনে গেঁথে থাকবে। জাতীয় দলে বিরাট কোহলি তাঁকে খুবই গাইড করেছেন। কোহলির যোগ্য উত্তরসূরিকে ভারতীয় ক্রিকেটের ‘প্রিন্স’ তকমা দেওয়া হয়। রাজপুত্র বড় হয়ে গিয়েছে। ‘কিং কোহলি’র টেস্ট অবসরের পর ভারতীয় ক্রিকেটে রাজ্যাভিষেক হল শুভমান গিলের।