


কৌশিক ঘোষ, কলকাতা: মেঘভাঙা বৃষ্টি বা ‘ক্লাউড বার্স্ট’-এর জন্য চলতি বর্ষার মরশুমে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন এলাকা। অনেক মানুষের প্রাণহানি, সম্পত্তি নষ্ট, রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পার্বত্য এলাকায় এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় খুব অস্বাভাবিক নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এখন মেঘভাঙা বৃষ্টি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্ত পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং-কালিম্পংয়ের পাহাড়ে এমন কোনও ঘটনার উদাহরণ নেই। এসব এলাকায় মাঝেমধ্যে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি তৈরি হলে আবহাওয়াগত বিচারে মেঘভাঙা বৃষ্টি বলা যায়, তেমনটা কখনও হয়নি বলেই জানাচ্ছেন প্রবীণ আবহাওয়াবিদরা। তাঁরা বলছেন, আবহাওয়া মণ্ডল ও প্রাকৃতিক পরিস্থিতির কারণেই এই এলাকা ‘ক্লাউড বার্স্ট’ থেকে রেহাই পাচ্ছে। আলিপুর আবহাওয়া অফিসের অধিকর্তা হবিবুর রহমান বিশ্বাস জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গে পাহাড়ের উচ্চতা তুলনামূলক কম ও বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি বেশি মাত্রায় থাকায় মেঘভাঙা বৃষ্টি হয় না।
তুলনামূলক ছোট এলাকায় কম সময়ে খুব বেশি পরিমাণে বৃষ্টি হলে তাকে ‘ক্লাউড বার্স্ট’ বলা হয়। ২০-৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১০০ মিলিমিটার বা ১০ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হলে তাকে মেঘভাঙা বৃষ্টি বলে চিহ্নিত করা হয়। অল্প সময়ে অপর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে পাহাড়ি নদীতে জলস্ফীতি হয়ে আচমকা ‘হড়পা বান’ নেমে আসে। তখন পাহাড়ে বড় বড় ধস নামে। প্রকৃতির তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যায়। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, উষ্ণ জলীয় বাষ্প পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে উপরে উঠে শক্তিশালী ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ সৃষ্টি করে। উষ্ণ বায়ু পার্বত্য এলাকার ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে ঘন মেঘ তৈরি করে। ওই মেঘে প্রচুর পরিমাণে জলকণা থাকে। তখন প্রবল বৃষ্টি হয়। পাহাড়ের উচ্চতা বেশি হলে তা শক্তিশালী মেঘ তৈরির ক্ষেত্রে অধিকতর সহায়ক হয়। পাহাড়ের ঠান্ডা বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকাটাও শক্তিশালী মেঘ তৈরির অন্যতম একটি শর্ত। উষ্ণ ও শীতল বাষ্প মিলে শক্তিশালী মেঘ তৈরি হয়। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের উচ্চতা তুলনামূলক কম হওয়ায় ও বাতাসে বেশি জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় শক্তিশালী মেঘই তৈরি হয় না। তাই মেঘভাঙা বৃষ্টি বলতে যা বোঝায়, তা কখনও হয়নি পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলে।
আলিপুর আবহাওয়া অফিসের অধিকর্তা বলেন, ‘পুরনো রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গিয়েছে, দার্জিলিংয়ে একবার ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হওয়ার নজির রয়েছে। তবে এটা ২৪ ঘণ্টা বা একদিনের হিসেব। তাই আবহাওয়াগত বিচারে ক্লাউড বার্স্ট বলা যায় না।’ তাঁর মতে, উত্তরবঙ্গে হিমালয় সংলগ্ন এলাকায় বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ঢোকে। এর ফলে ভালো বৃষ্টি হয় কিন্তু অল্প সময়ে অপর্যাপ্ত বৃষ্টি বা ‘ক্লাউড বার্স্ট’ হয় না।