বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিনোদন
 

তরুণ মজুমদার
(১৯৩১-২০২২)

প্রেমের রং কী? সেভেন সামুরাইয়ের সেটে আকিরা কুরোসাওয়ার দিকে ভেসে এসেছিল এই প্রশ্ন। কিংবদন্তি চিত্র পরিচালকের উত্তর, ‘যে যেমন দ্যাখে। আমার কাছে প্রেম সাদা-কালো। কারও চোখে ভেসে ওঠে ভালোবাসার সাত রং।’
সত্যিই তাই। সত্যজিৎ রায় প্রেমের ছবি এঁকেছেন হৃদয়ের সূক্ষ্ম অনুভূতি দিয়ে। মৃণালের চলচ্চিত্রে প্রেম আবার ঘাত-প্রতিঘাতের চালচিত্র। আমবাঙালি সেই রসে বঞ্চিত। এইখানেই শুরু ‘পলাতক’ তরুণ মজুমদারের পথ চলা। রিলের ক্যানভাসে তাঁর ক্যামেরার তুলি বারবার এঁকেছে আমার-আপনার ভালোবাসার কথা। ‘দাদার কীর্তি’র বোকা কেদার, কিংবা ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’র অরূপকে আমরা আজও নিজেদের মধ্যে খুঁজে বেড়াই। তবে শুধু প্রেমের তারে সিনেমাকে আবদ্ধ করতে চাননি তনুবাবু। দিয়েছেন সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তাও। ‘বালিকা বধূ’ তার প্রমাণ।
এর বাইরে তনুবাবুর সিনেমার একটা মস্ত দুনিয়া আছে। যে দুনিয়ার নায়ক মধ্যবিত্ত বাঙালি। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এর রসিকের মতো ক্লাসে ফেল করা, বিয়ের ভয়ে বাড়ি থেকে পালানো দুরন্ত কিশোর তো সাত কিংবা আটের দশকে বাংলার ঘরে ঘরে। ভুল ইংরেজি বলা উচ্চাভিলাষী বড়লোকদের ছবিও সমান্তরালে এঁকেছেন এই পরিচালক। তাঁরা ‘কৃপা করি করো মোরে রায়বাহাদুর’ আউড়ে পর্দায় হাসি ছড়িয়েছে। প্রয়োজনে নিষ্ঠুর চাউনিও দিয়েছেন। আর এসবের ফাঁকে অমর হয়ে রয়েছে ‘হরিদাসের বুলবুল ভাজা/ টাটকা তাজা খেতে মজা’-র মতো গান।
এসবের শুরু কীভাবে? কেন ছবি পরিচালনায় এলেন তরুণ মজুমদার? আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’তে তিনি লিখছেন, ‘কলেজের পাট চুকিয়ে যখন ভাবছি এবার কী করব, কোন পথ ধরা যায়, এমন সময় বলা নেই কওয়া নেই মনের মধ্যে একটা পুরনো পোকা কুটুস করে কামড় বসালো। এই পোকাটির নাম যে সিনেমা পোকা তা বুঝতে সময় লাগছে।’ 
পাঁচের দশকের শুরুতে শচীন মুখোপাধ্যায় এবং দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘যাত্রিক’ সংস্থা তৈরি করেন তরুণবাবু। উত্তম-সুচিত্রার ‘চাওয়া পাওয়া’, যাত্রিকের প্রথম নিবেদনই সুপারহিট। ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘কাচের স্বর্গ’, ‘পলাতক’ দর্শক হৃদয় জয় করে। এরপর যাত্রিক থেকে বেরিয়ে আসেন তনুবাবু। বসন্ত চৌধুরী ও সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে শুরু হয় ‘আলোর পিপাসা’র শ্যুটিং। তারপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। 
তরুণ মজুমদারের সিনেমায় বারবার এসেছে শহরতলি এবং গ্রাম। নিখাদ প্রেমের ব্যাকড্রপে প্রকৃতির স্নিগ্ধ ছায়া বারবার দর্শকদের স্মৃতিমেদুরতায় আচ্ছন্ন করে। জীবনে কোনওদিন নিজেকে ‘আর্ট’-এর পূজারি মনে করতেন না তিনি। সহজ অথচ জনপ্রিয় সংলাপ ছিল ওঁর ছবির ইউএসপি। প্রেমের সঙ্গে কৌতুকরস অক্লেশে মিশিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘ফুলেশ্বরী’ তাই এখনও বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। 
তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৮’এ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে এই ছবি। অসহযোগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামবাংলার আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামো ধ্বংস হওয়ার কাহিনি মুন্সিয়ানার সঙ্গে দর্শকদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। দেবু পণ্ডিত কিংবা দুর্গা তাই আজও স্মৃতিপটে অম্লান। শ্রেষ্ঠ বিনোদনমূলক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের জন্য এই ছবি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। 
বাংলা সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহারের জন্যও তরুণ মজুমদারকে চিরকাল মনে রাখতে হবে। সমালোচকদের একাংশ অবশ্য এই ব্যাপারে ঋত্বিক ঘটক এবং সত্যজিৎ রায়কে এগিয়ে রাখেন। কিন্তু ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় দেবব্রত বিশ্বাসের দরাজ কণ্ঠে ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ কিংবা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় ব্যবহৃত অমিয়া ঠাকুরের ‘এ পরবাসে রবে কে’র দ্যোতনা সাধারণের মননের সঙ্গে খাপ সেভাবে খায় না। তনুবাবু এই ব্যাপারেও সহজ পথের পথিক। ‘দাদার কীর্তি’র ‘চরণ ধরিতে দিও গো’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’য় ‘হার মানা হার পরাব’ কিংবা ‘আলো’র ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’ সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে আচ্ছন্ন করে।  সোমবার জীবনের ওপারে পাড়ি দিলেন তরুণ মজুমদার। আর সিনেমাপ্রেমীদের জন্য রইল তাঁর ভালোবাসার রামধনু।
ছবি: সুব্রত মাজী

5th     July,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ