বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
শরীর ও স্বাস্থ্য
 

রক্তে ঘুরছে প্লাস্টিক!
কমতে পারে সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা

লিখেছেন ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল এবং ডাঃ চিত্রা মণ্ডল 

মাইক্রোপ্লাস্টিক। অর্থাৎ ৫ মিলিমিটারের কম ব্যাসের প্লাস্টিকের কণা। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণারাই এখন দুনিয়ার বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবিদদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। মানবজীবনের নানা ক্ষেত্রেই এখন প্লাস্টিকের দ্রব্যের ব্যবহার করা হয়। কখনও পরনের কাপড়, কখনও চিকিৎসার সরঞ্জাম আবার কখনও প্যাকিং-এর ব্যাগ। প্লাস্টিক আজ সর্বত্রগামী। বড় বড় প্লাস্টিকের ব্যাগ বা থালা-বাসন তো তাও চোখে দেখা যায়। কিন্তু কারখানার মেশিনে ব্যবহার হওয়া মাইক্রোবিডস বা শিল্পে ব্যবহার হওয়া মাইক্রোফাইবার? সেগুলো তো ব্যবহারের পর মিশে যাচ্ছে মাটিতে বা জলে। গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে; প্রায় সাধারণ চোখে অদৃশ্য এইসব আণুবীক্ষণিক কণা ছড়িয়ে যাচ্ছে ত্রিভুবনে। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পৃথিবীর কোণে কোণে জমা হয়ে রয়েছে। 
আপনারা জানেন প্লাস্টিক নানা রঙের হয়। যখন সমুদ্রের জলে এগুলি মিশছে, তখন জলজ প্রাণীরা এই কণাগুলিকে দেখে ভাবছে প্ল্যাঙ্কটন বা শ্যাওলার কণা। তারা অন্য খাবারের সঙ্গে এগুলি খেয়ে নিচ্ছে নিশ্চিন্তে। এইভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে। প্রথমে ছোট মাছ এই প্লাস্টিক খাচ্ছে; তারপর বড় মাছ খাচ্ছে সেই ছোট মাছ। এরপর সামুদ্রিক পাখিরা খাচ্ছে সেই মাছ। এইভাবে সমুদ্রের জলে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক ছড়িয়ে যাচ্ছে ইকোসিস্টেমের প্রতিটি ধাপে। এরপর কী আর মানুষ বাদ থাকে? মানুষ একসময়ে খাচ্ছে যে মাছ বা পাখির মাংস এবং সেই পথেই আমাদের দেহে প্রবেশ করছে এই প্লাস্টিক। 
এই মাইক্রোপ্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন অনেক রকম হতে পারে। বেশি যেগুলি পাওয়া যায়, তার মধ্যে রয়েছে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন এবং পলিঅ্যামাইড। এইসব রাসায়নিক যে কোনও প্রাণীর দেহে বেশি পরিমাণে প্রবেশ করলে কী হতে পারে? প্রথমত এগুলি সরাসরি বিষাক্ত। যে মাছ বা সামুদ্রিক কচ্ছপ এগুলি খাবার ভেবে খেয়ে নিচ্ছে, সে চরম কষ্ট পেয়ে মরেও যেতে পারে। অকালে মৃত এরকম বহু পাখি বা সীলমাছের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে তাদের পেটে প্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছে। যদি এই হতভাগ্য প্রাণীরা বেঁচেও থাকে, পরবর্তীকালে এদের ক্যান্সার হতে পারে। এবং শেষে এই রাসায়নিকগুলির আরেকটি নতুন ক্ষমতার পরিচয় এখন পাওয়া গিয়েছে, এগুলি হল এন্ডোক্রিন ডিসরাপটার। অর্থাৎ, প্রাণীর শরীরে হরমোনের কাজ এগুলো থামিয়ে দিতে বা গণ্ডগোল করে দিতে পারে। মানে প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে। সুতরাং এইসব রাসায়নিক আমাদের পেটে গেলে যে একইরকম প্রভাব পড়বে না, সেটা কী কেউ বলতে পারে? আসলে মানুষের শরীরে যে এই পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকছে, সেই নিয়ে সচেতনতা সবে তৈরি হয়েছে। এদের শারীরবৃত্তীয় প্রভাব কী কী, সেই নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। তবে এটুকু বলাই যায় যে প্লাস্টিকের মতো একটি দ্রব্য রক্তে মিশে থাকলে ভালো কিছুই হবে না। কিন্তু এখন পৃথিবীতে যে হারে প্লাস্টিক উৎপাদন হচ্ছে এবং রোজ যেভাবে সমুদ্রে বা নদীতে এই প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে দেওয়া হচ্ছে, তাতে আমরা কেউই একে এড়িয়ে যেতে পারব না। 
সম্প্রতি নেদারল্যান্ডে একটি গবেষণায় ২২জন আপাতভাবে সুস্থ মানুষের রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে বেশিরভাগের রক্তেই নানা প্লাস্টিক কণা রয়েছে! এখন প্রশ্ন হল কোথা থেকে এল এই কণা? শুধু কী খাবারের মাধ্যমেই শরীরে ঢুকছে, না কি বাতাসে যে প্লাস্টিক কণা ভেসে বেড়াচ্ছে, সেখান থেকেও রক্তে প্রবেশ করছে? আমরা এখনও জানি না। যেমন আমরা এখনও জানি না যে এই কণা কতদিন শরীরে থাকবে? এগুলো কী কিডনি বা লিভার হয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না কি একবার রক্তে প্রবেশ করলে আমৃত্যু রক্তেই ঘুরতে থাকবে? প্লাস্টিক থেকে যে নানা ক্যান্সার হয়, সেই তথ্য এখন প্রমাণিত। কিন্তু এইসব কণা রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরেই ঘুরছে। এদের চরম পরিণতি কী? 
আপনি হয়তো জল ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে খাচ্ছেন। তাতে অন্য সব জীবাণু নষ্ট হতে পারে। কিন্তু মাইক্রোপ্লাস্টিকের কিছুই হবে না। সব ফিল্টার করার পরেও এই প্লাস্টিক আপনার খাওয়ার জলে থেকে যাবেই। এই নিয়েও গবেষণা হয়েছে এবং দেখা গেছে যে অনেক বোতলবন্দী জলেই মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। এত মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে থাকলে নানা ক্ষতি হতেই পারে। গর্ভস্থ সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন অসম্পূর্ণ থাকতে পারে, ভ্রূণের ওজনবৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। এমনকি বিজ্ঞানীরা এরকম আশঙ্কাও করছেন যে পিতা-মাতার রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকলে শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর জিনগত পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে এই দূষণের প্রভাব বয়ে চলবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। 
তাহলে উপায় কী? একবার রক্তে প্লাস্টিকের কণা ঢুকে গেলে এখন অবধি কোনও ওষুধ বা প্রক্রিয়া জানা নেই একে শরীর থেকে বের করার। তাহলে যাতে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে এই কণা না আসে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে এবং মনে রাখবেন এই কাজ করতে হবে সারা পৃথিবী জুড়ে। আজকে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক জাপানের সমুদ্রের কোনও মাছের শরীরে প্রবেশ করল, এক মাস পরে সেটাই চলে আসতে পারে চেন্নাইয়ের উপকূলে কোনও কাঁকড়ার দেহে। তারপর সেই কাঁকড়া যখন বাজার থেকে আপনার রান্নাঘরে চলে আসবে, তখন আপনিও এই প্লাস্টিক দূষণের শিকার হবেন। তাই সবাইকে সচেতন হয়ে প্লাস্টিকের দূষণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

6th     October,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ