বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
শরীর ও স্বাস্থ্য
 

মাঙ্কিপক্স: তবে কি
নতুন মহামারীর আশঙ্কা?
চিন্তায় চিকিৎসক মহল

ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল: আজকের দিনে হয়তো ‘পক্স’ নামটা শুনলে কারও মনে সেরকম কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। তবে পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে এই নাম উচ্চারণ করলেও শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেত! স্মল পক্স সেই সময়ে ছিল সাক্ষাৎ মৃত্যুর পরোয়ানা। এরপর বহু বিজ্ঞানীর অসীম প্রচেষ্টায় এই মারণরোগের আতঙ্ক দূর হয়েছে। কিন্তু সেই পক্স বিদায় নিলেও রয়ে গেছে তার এক জ্ঞাতি ভাই। অর্থোপক্স ভাইরাস গোত্রের এই জ্ঞাতি ভাই-এর নাম মাঙ্কিপক্স। আজকে, যখন করোনা উপসংহারের পথে, সেই সময়ে আবার নতুন মহামারীর ভ্রূকুটি নিয়ে দেখা দিচ্ছে মাঙ্কিপক্স। অবশ্য করোনার মত ছড়িয়ে পড়তে এই নতুন অতিথি এখনও পারেননি। তবে অদূর ভবিষ্যতে ইনিও যে অশান্ত হয়ে উঠবেন না, এমন কোনও গ্যারান্টি নেই। তাই আজকে, আমাদের আলোচনার বিষয়, কী এই মাঙ্কিপক্স, কতটা বিপজ্জনক এই ভাইরাস এবং অবশ্যই, আমরা এর থেকে বাঁচার জন্য কী কী করতে পারি? 
প্রথমেই জানতে হবে, কী এই মাঙ্কিপক্স? আগেই বললাম, অর্থোপক্স ভাইরাস পরিবারের একটি ভাইরাস এই মাঙ্কিপক্স। ‘মাঙ্কি’ নামটি এসেছে, কারণ প্রথম এই ভাইরাস দেখা গিয়েছিল কতিপয় ল্যাবরেটরির বানরের মধ্যে। তাই বলে, এই নামের মানে এই নয় যে এটি বানর জাতীয় প্রাণী থেকেই শুধু ছড়িয়ে পড়ে। বরং, আফ্রিকার কাঠবেড়ালি, কিছু বুনো ইঁদুর ইত্যাদি প্রাণীই হল এই ভাইরাসের রিজার্ভার। মূলত মধ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকার কিছু জঙ্গলের প্রাণীদের মধ্যেই এই ভাইরাসের বাস। অবশ্য প্রাইমেট জাতীয় প্রাণী, যেমন বানরও এই ভাইরাসের রিজার্ভারের কাজ করতে পারে। গত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরেই আমরা দেখছি যে বার বার এই নানা বন্যপ্রাণী থেকেই নতুন নতুন ভাইরাস আমাদের মানবসমাজে প্রবেশ করে মহামারী সৃষ্টি করছে। আশির দশকের শুরুতে এইচ আই ভি-এর একটি চরম উদাহরণ। তার পরে এভিয়ান ফ্লু, নিপা ভাইরাস ইত্যাদি এসেছে। হালের করোনাও হয়ত এসেছে এরকম প্রাণী থেকেই। আর এখন এই মাঙ্কি পক্স। এগুলিকে এক কথায় বলা হয় জুনোসিস। কিন্তু কেন বার বার আসছে এইসব রোগ? সারা পৃথিবী জুড়ে জঙ্গল ধ্বংস হচ্ছে। ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে সব বিজ্ঞানীরাই সাবধানবাণী শুনিয়ে দিয়েছেন। আপনারাও দেখছেন, কখনও আসছে ঘূর্ণিঝড়, কখনও বন্যা। এভাবে যতই পরিবেশ ধ্বংস হবে, ততই এইরকম নতুন ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে। তবে, ২০০৩ এর আগে আফ্রিকার বাইরে এই ভাইরাস আসেনি। আফ্রিকার দেশগুলিতে ছোটখাট আউটব্রেক হত। আবার কমেও যেত। 
এবার আসি দ্বিতীয় ভাগে, কতটা বিপজ্জনক এই ভাইরাস? আগের পরিচ্ছদের শেষ লাইনটি তুলেই শুরু করি। ১৯৯৬-৯৭ সালে কঙ্গো দেশে একটি মহামারী হয়েছিল। প্রচুর লোক আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুহার ছিল কম। অবশ্য, এই মৃত্যুহার কম ব্যাপারটি শুনে এই ভাইরাসকে অবজ্ঞা করবেন না। করোনার মৃত্যুহার কত? ২ থেকে ৩ শতাংশ। কিন্তু তাতে কী ক্ষয়ক্ষতি কিছু কম হয়েছে? এরপর আফ্রিকার নানা দেশে এই ভাইরাসের খবর পাওয়া গিয়েছে। ২০১৭ সালে নাইজেরিয়ায় প্রায় ৫০০জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবং সবচেয়ে বড় কথা, তারপর থেকে এই দেশে কিন্তু মাঝেমধ্যেই এই ভাইরাসের কথা শোনা যায়। মানে, একবার ভাইরাস সমাজে ঢুকে গেলে তারপর একে নির্মূল করা বেশ কঠিন। ২০০৩ সালে আমেরিকায় এই ভাইরাসের যাত্রা ছিল বেশ চমকপ্রদ। সাধারণত কেউ আফ্রিকার কোন দেশে ভ্রমণ করে তারপর দেশে ফিরলে তখন সেই অভিযাত্রীর মাধ্যমে রোগ ছড়ায়। এটাই পরিচিত সংক্রমণের পথ। কিন্তু এই মাঙ্কিপক্সের ক্ষেত্রে দেখা গেল যে আমদানি করা পশু থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। আফ্রিকা থেকে শুধু হিরে বা দুর্মূল্য কাঠ নয়, প্রচুর পশুও কিন্তু ইউরোপ বা আমেরিকায় রপ্তানি হয়। সেরকম, ২০০৩ সালে ঘানা থেকে আমেরিকায় আমদানি করা হয়েছিল গ্যাম্বিয়ান পাউচড র‍্যাট। তার মাধ্যমেই আমেরিকায় এই ভাইরাস ছড়িয়েছিল। প্রায় সত্তরটি কেস পাওয়া গিয়েছিল। তবে মানুষের মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়ায়। যেমন ২০১৮ সালে নাইজেরিয়া থেকে ইজরায়েলগামী কিছু মানুষের মাধ্যমে এই ভাইরাসের আউটব্রেক হয়েছিল। তবে এই ২০২২ সালে যেভাবে মাঙ্কিপক্স ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়াচ্ছে, তার উৎস কিন্তু এখনও জানা নেই। সবসময় যে এরকম পশু বা পর্যটকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, তা নয়। তাহলে কি ভাইরাস শেষমেশ এইসব দেশে ঢুকেই গেল? যদি ধরে নিই যে তাই ঘটেছে, তাহলে কী হতে পারে এই ভাইরাসে? সংক্রমন হলে অসুখ শুরু হয় জ্বর, গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা এবং দুর্বলতা দিয়ে। এর সাথে ফুলে যায় লিম্ফ গ্ল্যান্ড। এরপর, সেই পক্সের মতো, শুরু হয় মুখে এবং হাতে পায়ে র‍্যাশ। জলভরা পক্সের র‍্যাশ। এইসব র‍্যাশ বড় হয়, পুঁজ হয়, তারপর আস্তে আস্তে শুকিয়ে ঝরে যায়। দু-তিন সপ্তাহ লাগে। মুখে হলে চিরকালীন দাগ থেকে যেতে পারে। চোখে হলে চোখ নষ্ট হওয়ার ভয়। বেশিরভাগ রোগী সেরে ওঠে। শিশুদের বিপদ বেশি। এর সঙ্গে নিউমোনিয়া বা এনকেফেলাইটিস হলে মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি।
তাহলে এবার আসি শেষ ভাগে। আমরা কী করতে পারি? প্রথমত, সাবধান থাকা। এই ভাইরাস করোনার মতো দ্রুত ছড়ায় না। এর সংক্রমণের জন্য রোগীর দেহের খুব কাছে আসতে হয় বা রোগীর দেহরসের সংস্পর্শে আসতে হয়। সুতরাং কারও এই রোগ সন্দেহ হলে তাঁকে আলাদা করে দিলেই বেশিরভাগ সময়ে এর থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। যেহেতু জ্বরের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই র‍্যাশ বেরিয়ে যায়, তাই এই রোগী চিনে নেওয়া খুব সোজা। আর মুখে র‍্যাশ হয়। তাই এই রোগ লুকিয়ে রাখা কঠিন। সন্দেহ হলেই হাসপাতালে যেতে হবে। এখন আপনারা খবরে প্রায়ই দেখবেন আমাদের দেশের এখানে ওখানে নানা বিদেশি জন্তু পাচারের সময়ে ধরা পড়ছে। যেমন সুদূর অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারু এই সেদিন উদ্ধার হল উত্তরবঙ্গ থেকে। সুতরাং যদি খবর পান, আপনার বাড়ির কাছে এরকম অন্য দেশের পশু বা পাখি পাওয়া গেছে, তবে সাবধান থাকাই ভালো।
এখন ইউরোপে কথা হচ্ছে যে স্মলপক্সের সেই ভ্যাকসিন আবার ফিরিয়ে আনতে হবে কি না। অনেক দেশ ইতিমধ্যেই এই স্মলপক্সের ভ্যাকসিন বানানো শুরু করেছে। যেহেতু সেই স্মলপক্স আর এই মাঙ্কিপক্স এক গোত্রের ভাইরাস, আশা করা যায় যে সেই ভ্যাকসিন দিলে এই নতুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হবে। আরও একটি ওষুধ নিয়েও গবেষণা শুরু হয়েছে, সেটি হল ভ্যাক্সিনিয়া সেরাম। এই সেরাম দিলেও মাঙ্কিপক্স চিকিৎসা করা সম্ভব।
সুতরাং শেষ কথা এটাই যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এখনও তত ঘটনার সন্ধান মেলেনি। বিজ্ঞানীদের হাতে কিছু ভ্যাকসিন এবং ওষুধ রয়েছে। দরকার হলে নতুন করে আরও আবিষ্কার হবে। করোনাকে যখন জয় করা গেছে, তখন এই নতুন ভাইরাসকেও মোকাবিলা করা সম্ভব। 

25th     May,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ