বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
গল্পের পাতা
 

আলোর খোঁজে
সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

অসময়ের সবকিছুরই তেজ বেশি। সে মৃত্যু হোক আর ঝড়-বাদল! জাগতিক সুখ লণ্ডভণ্ড করে দিয়েই যেন তাদের শান্তি! পৌষের শীতে ঝমঝম শিলাবৃষ্টি আজ। চারদিক এমনই ছাইরঙের, সকাল না সন্ধ্যা বোঝা মুশকিল। তবুও ছাতা কিংবা রেইনকোট সম্বল করে কেউ কেউ রাস্তায়। পেটের বালাই! ‘গ্রিনভ্যালি’ আবাসনের ‘রিক্তা’,‘রোহিণী’,‘রাধিকা’ বিল্ডিংগুলোর বেশিরভাগ ফ্ল্যাটেই কর্মরতা গৃহিণীদের বাস। তাদের বাঁধা রান্নার লোক রুমকি আজ কাজে যায়নি। দেড় বছরে এই প্রথম কাজে ডুব মেরে গোসাপের মতো তক্তপোশে এলিয়ে রয়েছে। তার ঠান্ডা গা থেকে হাত চারেক দূরে স্টোভের নীলচে আগুনের উপর অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি। বড়বাজার থেকে হাঁড়িটা কিনে এনেছিল রুমকির বর রাজু। 
বছর চারেক আগে রাজুর হাত ধরেই রুমকির কলকাতায় পদার্পণ। ‘রোহিণী’ নাইন বি-এর কাঁকনদিদির থেকে ‘ধনতেরাস’ শব্দটার মাহাত্ম্য আর সঠিক উচ্চারণ শিখে নেওয়াও প্রায় একই সময়ে। রুমকি বলেছিল, ‘ধনতেরাসের দিনে কাঁসা-পেতল-রুপো কিচ্ছু না জোটে না জুটুক! পোড়া কপালে একখান রান্নার বাসুনও জুটবে নাগো!’
বউয়ের ঘ্যানঘ্যানানির পিঠে নিজের গুঁইগাঁই চাপাতে না পেরে ধনবর্ষণের সন্ধ্যায় নির্ধন রাজু, চেনা বাসনওলার থেকে হাঁড়িটা নিয়ে আসে। ওই হাঁড়িতে প্রথমবার ভোগের খিচুড়ি রেঁধেছিল রুমকি। সেবছরের শুরুতে সেলসম্যানের কাজ খুইয়ে, ফলের ব্যবসায় দেদার লোকসান করে শেষে গার্ডের চাকরিটা রাজু পেয়ে গিয়েছিল। সেই উপলক্ষ্যেই বারোয়ারি পুজোতলায় মায়ের পায়ে একথালা খিচুড়ি আর একশো-আট জবার মালা...যেমন সাধ্য, মানত রাখতে তেমনই দিয়েছিল রুমকি। চালেডালে বেশ করে তেলমশলা মাখিয়ে আজও সে খিচুড়ি চাপিয়েছে হাঁড়িটায়। ডুমোডুমো আলু-পেঁয়াজসহ সেদ্ধচালের আমিষ খিচুড়ি, রাজুর প্রিয় খাবার। আজ রুমকি একাই খাবে। এখন সে একা! প্রথম সাত-আটদিন ঠাহর করতে পারেনি। অবশ্য রাজুর পালিয়ে যাওয়াটা এখন জলের মতো পরিষ্কার। বেলা দুপুরে বিছানা ছাড়ে, কুঁড়ের হদ্দ, আজ কাজে ঢোকে তো কালই আবার বেকার, এমন বাউন্ডুলে যে একদিন সংসারের ময়দান ছেড়ে পালাবে সেটা রুমকি ভালো করেই জানত। তাই আগে দু-দু’বার খুঁজে আনলেও এবার সে আর গা করেনি।    
স্টোভের আগুনের পাশে ভাঙা বালতি। বালতিতে জলের বুকে জল পড়ার শব্দ...টুপটাপ...টাপ...টুপ! রুমকির একচিলতে ঘরের চালটাও আকাশের মতোই ছেঁদা। ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আঁধার আর বৃষ্টি দুইই তার ভারী আপন। আপন অন্ধকারে শুয়ে-শুয়ে রুমকি জল পড়া দেখছে। আদুল গায়ে থাকার বয়স ছিল যখন, এমন মনভাসি বৃষ্টিতে ঘরে থাকতে তার ইচ্ছে করত না। মাকে না জানিয়েই ছুটে যেত আমুদিদের বাড়ি। বৃষ্টির তোড়ে আমুদিদের চওড়া উঠোনে সেসময় খালের জল হুহু স্রোত ভাসিয়ে দিচ্ছে আগানবাগান, ঘাসে ঢাকা খামারবাড়ি। থইথই করে নাচতে লাগত আমুদি আর রুমকি। নাচতে নাচতেই টের পেত কইমাছগুলো চুপিচুপি জল থেকে উঠে কানে হেঁটে প্রাণপণে ঢুকে পড়তে চাইছে খালপাড়ের কলমি-থানকুনির জংলায়।  
‘ওরে ও আমুদিনী, ওরে রুকমুকি, এইবেলা চুপ মেরে দাঁড়া দিকিন!’ বলে শুষ্ক ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে হাঁটুর ওপর কাপড় গুটিয়ে নিঃশব্দে ওঁত পাতত আমুদির ঠাকুমা। রুমকিরা দেখত,  বুড়ির কোটরে ঢোকা দু-চোখে বেড়ালচোখের মতো হলদে আগুন! পেটের ডিম আর বাঁচানো হতো না কইমাছদের। বেতের চুপড়িতে পড়া মাত্রই পোয়াতি কইগুলো ছটফটিয়ে উঠত। রুমকিরা আবার হাততালি দিয়ে নাচত। ভর সন্ধ্যায় আমুদিদের মাটির দাওয়ায় বসত পুতুলবিয়ের আসর। রংচঙে কাপড়ের সাজগোজ, রাংতা-চুমকির গয়নাগাটি...এলাহি আয়োজন! অথচ সেই বিয়েতে কক্ষনও মাংস হতো না। হতো ঝালঝাল কইভাপা আর লাল চালের ভাত। পেট ভরে খেয়ে ঢেকুর তুলে বর পুতুলের মা, বউ পুতুলের মায়ের গায়ে ঠ্যাং তুলে ঘুমিয়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা!
কর্ণবিদারী শব্দ! কালেভদ্রে এঁটো বাসন জমে কুয়োতলায় পাহাড় হয়ে গেলে সৎমায়ের থাবড়া খেয়ে যেমন ধড়মড়িয়ে ঘুম থেকে উঠত, কড়কড় বাজের আওয়াজে তেমন করেই উঠে বসে রুমকি। বাজটা কাছেই কোথাও পড়েছে! ফাঁকফোকর গলে ঘরে ঢুকেছে খানিকটা আলো। আবছা আলোতে রুমকি দেখল রাজুর তেল চিটচিটে মাথার বালিশটা বিছানার বাঁ-দিকে মরা বেড়ালছানার মতো পড়ে। মনের ভিতরটা আনচান করে ওঠে। অবশ হাত বাড়িয়ে বালিশটাকে বুকে তুলে নেয় রুমকি। সাত-আট বছরের অভ্যেসে অপছন্দের মানুষটাকেই বড্ড ভালোবেসে ফেলেছিল! শুধুই কি যৌথযাপনের স্মৃতি? প্রবল এই টান অনাবিল সখ্যও বটে! এমনই টান আমুদি মানে আমুদিনীর প্রতি। হয়তো খানিক বেশিই। শৈশব পেরিয়ে টলটলে কৈশোরের গাঙে তখন অচেনা স্বপ্নের ঢেউ! সেই ঢেউতেই গ্রাম্য মেয়ে দু’টির ভেসে ভেসে বেড়ানো। এক্কাদোক্কা, কিতকিত, কানামাছি, কুমিরডাঙা খেলা! খুনসুটি, মারামারি, কৃষ্ণনগরের বুড়ো-বুড়ি, হাতি-ঘোড়া, মেলার জিলিপি-পাঁপড় ভাগাভাগি! ঝিমধরা দুপুরে আলুকাবলির চড়ুইভাতি! সেসবের ফাঁকে কবে যে বড় হয়ে গেল দু’জন, আজও রুমকি বুঝতে পারেনি। পুতুল খেলার মাঝে একদিন আমুদি বলল, ‘আমু চলে যাব সে-ই দিল্লি! কার সঙ্গে খেলা করবি রে তুই?’
‘ওমা! অতদূরে যাবি কেন আমুদিনী?’ 
‘বাহ্ রে! দিল্লি উনার ঘর না!’ 
আমুদি লজ্জা পেল সেই প্রথম। সেদিনের পর থেকে রুমকির সঙ্গে আমুদিনীকে ঘুরতে দেখলে কী হাসতে, খেলতে, নাচতে দেখলেই ফুলুকাকিমা তেড়ে আসত। চিলের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যেত নিজের মেয়েটাকে। দিনরাত্তির ঘাড় ধরে রুটি বেলানো, চচ্চড়িতে নুন-মিষ্টির মাপা, মাংস কষানোর নিয়ম শেখান হতো আমুদিকে। উঁকি মেরে দেখে-দেখে রুমকির বিস্ময় কাটল না, আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় আমুদির বিয়ে হয়ে গেল পনেরো বছরের বড় লক্ষ্মীরঞ্জনের সঙ্গে। বিয়েবাড়ির বাসি মেঠাই খেতে-খেতে রুমকি দেখল ওই অত্ত বড় মানুষটার পাশে চুপটি করে বসে তার সই চলে যাচ্ছে ভিনদেশে। আমুদি কাঁদছে, কিন্তু কেউ চোখ মুছিয়ে দিতে ছুটে যাচ্ছে না। কাঁদতে কাঁদতে ফুলুকাকিমা বলছে, ‘যেতে যে ওকে হবেই! দিল্লিতে রাজমিস্তিরির কাজ ওর বরের!’
তা আমুদিনীর সেই বিয়ের সাতটা বছর পার করে এল মহামারী। ততদিনে রুমকিকেও পাশের গাঁয়ে রাজুর ঘরে যেতে হয়েছে। রোজগারের আশায় এ-পথে সে-পথে ঘুরে, গাঁ ছেড়ে কলকাতায় এসে থিতু হতে হয়েছে। দুই সইতে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি মোটে! সংসারের জোয়াল ঠেলতে গিয়ে যে আমুদির কথা তলিয়ে গিয়েছিল রুমকির মনের কালোয়, পিঁপড়ের মতো লাইন দিয়ে হিল্লিদিল্লি, চেন্নাই, গুজরাত, বম্বে থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফিরতে দেখে, তার কথাই নতুন করে মনে পড়ে গেল দুঃসময়ে। সে মনের পড়া এমনই প্রবল যে দিনেরাতে রুমকি বাপের বাড়ি ফোন করে। ইনিয়ে-বিনিয়ে জানতে চায় আমুদিনীর কথা। জমিজিরেত নিয়ে দু’ঘরের ছেলের বিবাদ তুঙ্গে, রুমকির মা তাই মুখ ঝামটা মারে। 
‘বলি, নিজের সংসারে মন দে না হতভাগী! কে কোতায় বাঁচল, ম’ল তোর তাতে কী?’
শেষমেশ খবর আসে আমুদিরা সব ফিরেছে। বর-বউ আর কোলে এতটুকুন একটা বাচ্চা! মেয়ে! তারা আছে ত্রিপল খাটিয়ে গাঁয়ের কিনারে বটগাছতলায়। সেইখানে দু-হপ্তার নিরালাবাস কাটিয়ে ঘরে ঢুকবে। রুমকি তখন কত কিছুই না ভেবেছিল! নাক-মুখ ঢেকে যাবে। সাবানে হাত ধুয়ে আমুদির বাচ্চাটাকে কোলে তুলে খুব আদর করবে। নিজের হয়নি তাতে কী, সইয়ের মেয়েও যে কন্যাসমা! একখানা খেলনা বানিয়ে নিয়ে গেলেও মন্দ হয় না...ভেবেই, রাত জেগে কাপড় কেটে একটা পুতুলও বানিয়ে ফেলেছিল। অথচ মাস ছয়েক পর গাঁয়ে গিয়ে দেখল আমুদির পরনে ফ্যাটফ্যাটে থান! রুমকিকে দেখেও আমুদি হাসল না। রুখু চুলে জলহাত বুলিয়ে কলপাড়ে বসে বলল, ‘বিষটা উনার শরিলেও ঢুকে গিসল বুঝলি! জ্বর আর ছাড়লই না! সোনামণিও চলে গেল বাপের পিছে। আর পেটেরটাও...’
রুমকির মন মুচড়ে উঠল। জানতে চাওয়া হল না, কেমন আচিস রে তুই, ও আমুদি?
গল্পগাছাও হল না। ইতিমধ্যে আমুদির ভাইয়ের বউ এসে বিষদৃষ্টিতে রুমকিকে দেখেই খ্যারখ্যার করে উঠল, ‘বলিহারি তোমার আক্কেল ঠাকুরঝি, বাসনগুলো না মেজে গল্প জুড়েচ! রান্না চাপাতে যে সন্দে হয়ে যাবে!’  
রুমকি আর বসেনি তারপর। শুধু যখন উঠে আসছে তার সালোয়ারে হাত বুলিয়ে আমুদি বলেছিল, ‘কী সুন্দর রংটা রে! নতুন বুঝি?’    
     দুই
‘রুমকি...ও রুমকি...দোর খোল বেটি।’
ঘরের নৈঃশব্দ্য ভেঙে খানখান! স্বপ্ন না বাস্তব বুঝতে খানিক সময় যায়। কিন্তু রহমানচাচার ডাকের পিছে ক্ষীণ ‘মিয়াঁও’ শব্দটা অবিলম্বে তন্দ্রাজাল ছিঁড়ে খুঁড়ে দেয়। একলাফে দরজা খুলে বের হয় রুমকি। চাচার হাতে তালিমারা জীর্ণ পোঁটলা। সেটা থেকে বিল্লা উঁকি মারছে। পোঁটলাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে চাচা বলল, ‘উই বাঁশবনের ধারে এ-ই বুক সমান গাড্ডায় পড়ে গিসল! পানিতে ভিজে ছাওয়ালডা একদম চুপসে গেচে রে! যা বেটি,  ঘরে নে আগুনতাতে বস কইরে রাখ। শরিলে এট্টুস জান আসুক।’
চত্বরের প্রবীণ দর্জি রহমান রুমকিকে আপন সন্তানের মতোই স্নেহ করে। তার ছেঁড়া জামায় এমন করে তাপ্পি মেরে দেয়,  কাঁকনদিদিরা দেখে ভাবে নতুন নকশা! কাপড়ের ব্যাগ সমেত বিল্লাকে কোলে তুলে অবাক চোখে রুমকি দেখল চাচার কালো ছাতাটায় অগুনতি ফুটো। গায়ের ফতুয়াও পেঁজা। আধভেজা লোকটা একবার করে কাশছে আর মোটা কালো চশমাটা এসে সরু লম্বা নাকের ডগায় ঝুলে পড়ছে। বিল্লাকে বুকে চেপে রুমকি বুঝতে পারল অযাচিত আনন্দের সঙ্গে একটা আচমকা মনখারাপ তাকে পেয়ে বসতে চাইছে। সে তাড়াতাড়ি জানতে চাইল, ‘চাচা, চা খাবে এট্টু?’
রহমানের ঘরে মেয়েমানুষ নেই। বাপ-ছেলের সংসার। চায়ের টানে নিমেষেই তার চোখে ঝিলমিল! হাঁড়ি নামিয়ে আগুনে জল চাপায় রুমকি। এনামেলের পাত্রে উঁকি মেরে দুধটুকু মেপে নেয়। কিছুটা চায়ে ঢেলে বাকি দুধ খাওয়াবে ঘরে ফেরা পোষা প্রাণীটাকে। শান্তির আশ্রয়ে ফিরে এসে ঢুলুঢুলু চোখে মার্জার শাবকটি এখন খাদ্যের অপেক্ষায়। 
‘বিল্লা.....বিল্লা..কচি ছাওয়ালডা রে! কেন গিসলি ওই বাঁশবনে?’
করুণমুখী বেড়ালশিশু রুমকির গায়ে-পায়ে মাথা ঘষে। পালিকা মা নিজের ওড়নায় মুছিয়ে তাকে আগুনতাতে বসিয়েছে। স্বভাবজাত কৌতূহলে যে ভুল সে করে ফেলেছে, আদরে-সোহাগে, অসীম বাধ্যতায় তা শুধরে নিতে এখন বদ্ধপরিকর। রংচটা চেয়ারে পা মুড়ে বসেছে রহমান। চোখের সামনে ভিন্ন প্রজাতির মা ও শিশুর আদিখ্যেতায় তার মনটা ভারী প্রফুল্ল। খানিক পরে এককাপ চায়ের সঙ্গে দুটো বিস্কুট এগিয়ে দিল রুমকি। বলল, ‘চাচা, সেলাইয়ের কাজ আছে একটা। দেখাই?’   
নুরের মতো মেয়েটার মুখে একইসঙ্গে নানা রঙের খেলা দেখে রহমান আর ‘না’ বলতে পারে না। সলমা-চুমকির কলকা তোলা শিফনের শাড়িটা হাতে ধরেই কেতাদুরস্ত চুড়িদারের নকশা ভাবতে শুরু করে দেয়। রুমকি বলে, ‘মাঘ পয়লার আগেই চাই কিন্তু! না হয় একটু বেশিই নিও!’ 
তিন
হিমহিম অন্তরঙ্গ বেলা! বৈরি হাওয়ায় চারদিকে ভুরভুর করছে গুড়-নারকেলের সুগন্ধ। রসনায় যার লাগাম, রন্ধন শিল্পেই বা তার কী ভূমিকা! গাদা কাপড় নিয়ে পুকুরধারে সাবান কাচতে বসেছিল বিধবা আমুদিনী। ডান-বাহুতে হ্যাঁচকা টানে হঠাৎই চমকে ওঠে। দেখে, একহাতে পলিথিনের প্যাকেট অন্যহাতে কাপড়ের পুঁটুলিতে একরত্তি বেড়ালছানা নিয়ে তার সই এসে দাঁড়িয়েছে। মুখেচোখে রাজ্যের তাড়া! রুমকি বলল, ‘ছুটে যা আমুদি, শিগগির জামাটা পরে আয়।’
আমুদিনীর চোখে বিস্ময়! তবুও সে বাধা দিতে পারে না। প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে কলের পুতুলের মতো ধীরপায়ে বাইরের ঘরের নড়বড়ে দরজার আড়ালে ঢুকে পড়ে।
কৈশোরের আনন্দ দিন যেন ফিরে এসেছে! দুই সইয়ের গায়ে একই রঙের জামা! আন্দাজেও বন্ধুর গায়ের প্রায় সঠিক মাপই দিয়েছে! মনেমনে নিজের তারিফ করে রুমকি। তারপর সন্তর্পণে আমুদিদের বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে বড়রাস্তায় উঠে পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে বলে, ‘রাজু আমায় ছেড়ে গেচে, জানিস! ঘরসংসারে পাগলাটার মন নাই।’
আমুদি শুধোয়, ‘হায়! কাটাবি ক্যামনে বাকি জেবনটা?’
‘নিজে কামাব, নিজেই খাব। স্বাধীন জেবন! কাজবাড়ির ওই কাঁকনদিদি তো একলাই থাকে! তারপর রিক্তা ফেলাটের চারতলার দাদাবাবু, উনিও একা!’ 
আমুদির গলার কাছে একদলা কান্না। নিজেকে তার মনে হয় জেলখানার বন্দিনী! দু-মুঠো ডাল-ভাতের জন্য দিবারাত্র পরিজনদের দাসত্ব করা! বাপ খোঁজে না, মা ছোঁয় না! ‘অপয়া’ গঞ্জনাটুকুও ঘোচে না! সে বলে, ‘কলকাতায় গেলে কি আমুও কাজ পাব রে রুমকি?’
‘ঘরের কাজ, বাচ্চা দেখাশোনা, ব্যাগ-জুতো-বাজির কারখানা; কাজের কি অভাব আচে শহরে!’              
‘তবে তোর সঙ্গে নিয়ে চল আমায়। দু’টিতে থাকব, খাব। সেই আগের মতো!’
আমুদির কাঁধে হাত রেখে রুমকি মুচকি হাসে। বলে, ‘চল না!’
অনতিদূরে নদীপাড় থেকে ভেসে আসছে মাঘমেলার গানবাজনা, কোলাহল। রুমকির কাঁখে বসে ‘মিউমিউ’ ডাকছে আদুরে বেড়ালছানা। পড়ন্ত বিকেলের লাল আভায় অনন্ত আকাশপথে মুক্তির সুখস্বপ্ন এঁকে উড়ে যাচ্ছে কটি বালিহাঁস। একুশি কন্যা দু’টি পায়ে পায়ে সোনালি আলোর পানে এগিয়ে যায়।                     
 অঙ্কন : সোমনাথ পাল

1st     October,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ