বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

উত্তম সঙ্গী
সমৃদ্ধ দত্ত

স্টুডিওর এডিটিং রুম থেকে নামছিলেন তপন সিংহ। হঠাৎ দেখলেন, সামনে উত্তমকুমার। উঠে আসছেন। তাঁর সঙ্গেই দেখা হতেই তপন সিংহ বললেন, তোমার ‘স্ত্রী’ ছবিটা দেখলাম।
‘কেমন লেগেছে তোমার?’ প্রশ্ন করলেন উত্তমকুমার।
তপন—তোমার অভিনয় অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে।
উত্তম—তুমিও একথা বলছ?
বিস্মিত তপন সিংহর প্রশ্ন, ‘কেন রে?’
উত্তম—‘তুমি দেখলে না আমি যে আগাগোড়া ছবিদাকে কপি করে গেলাম? জমিদারের রোল করছি, ছবিদা ছাড়া তো আর উপায় নেই!’
অনেক পরে উত্তমকুমারের স্মৃতিচারণে তপন সিংহ লিখেছিলেন, ‘এটা কোন অভিনেতা স্বীকার করে? সব গুণ ওর মধ্যে খুব বেশি পরিমাণেই ছিল।’
উত্তমকুমারের স্টার হয়ে হয়ে ওঠার পথ কি খুব কুসুমাস্তীর্ণ ছিল? একেবারেই নয়! কারণ, তিনিই বাংলা ছবির জগতে প্রথম জনপ্রিয় অভিনেতা, এমনটা নয়। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বা প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়ার স্টারভ্যালু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের শুরুর বছরগুলিতে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল। ‘শেষ উত্তর’ সিনেমার শুটিং শেষ। এমন সময়ে সঙ্গীত পরিচালক কমল দাশগুপ্ত একটি সিকোয়েন্স দেখিয়ে প্রমথেশ বড়ুয়াকে বললেন, ‘এই জায়গাটা ঠিক জমছে না। একটা গান দরকার ছিল।’ বড়ুয়া সাহেব নিজেও বুঝলেন, কথাটা ঠিক। কিন্তু ছবির টাইটেল কার্ড পর্যন্ত তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন একটা নতুন গান শ্যুটিং করে আবার তা ছবিতে আনা মানে খরচ বিপুল বেড়ে যাবে। কিন্তু প্রযোজকরা জানেন, বড়ুয়া সাহেবই শেষ কথা। অগত্যা পরিকল্পনা বদল। তাঁরা বললেন, আপনি খরচের কথা ভাববেন না। অবশ্যই যেটা ভালো মনে হয়, সেটাই করুন। খরচ আমরা দেব। প্রণব রায় একটি গান লিখলেন। কমল দাশগুপ্তের সুর। প্রণব রায়ের নাম টাইটেল কার্ডে দেওয়া গেল না। তবে রেকর্ডে দেওয়া হয়েছিল। চারের দশকের সেই গানটি বাংলা ছায়াছবির গানের মধ্যে অক্ষয় হয়ে রইল। গানটি ছিল কানন দেবীর ‘আমি বনফুল গো’!
সুতরাং একটা কথা পরিষ্কার। স্টার আগেও ছিল। প্রমথেশ বড়ুয়া, কানন দেবী তাঁদের অন্যতম। তাহলে উত্তমকুমার কী এমন করলেন যে তিনি সকলকে ছাপিয়ে আজও এক নম্বর ‘ম্যাটিনি আইডল’ হয়ে রইলেন? দু’টি কারণে। উত্তমকুমার প্রথম পর্দায় যাত্রা আর নাটকের প্যাটার্নে অভিনয়কে বদলে দিলেন। দুর্গাদাস, অহীন্দ্র চৌধুরী, শৈলেন বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, এমনকী ছবি বিশ্বাসের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে অবশিষ্ট ছিল একটা নাটকীয় সংলাপ প্রক্ষেপণের প্রবণতা। সেই প্রবণতা প্রথম ভাঙলেন উত্তমকুমার। নাটকীয় সংলাপ প্রক্ষেপণকে ঘরোয়া আর আটপৌরে একটি স্বাভাবিকতায় নিয়ে এলেন। আর দ্বিতীয়ত, তিনি এমন সব সহ অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সামনে অন্তত ক্যামেরার সামনে অকুতোভয় হয়ে নিজের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে পারলেন, যা অবিশ্বাস্য এক মনের জোরের প্রমাণ। ছবি বিশ্বাস পর্দায় যেমন, স্বাভাবিক সময়েও ছিলেন এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্যক্তিত্ব। তাঁর সংলাপ বলা, ঘুরে তাকানো, রাগ, হাসি, বিস্ময়, মায় দুঃখ পর্যন্ত প্রতিটি স্তর একটি করে নিজস্ব অ্যাক্টিং স্টাইলের স্বাক্ষর বহন করে। যা কার্যত সেই সময়েই মিথ হয়ে গিয়েছিল। এহেন ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করা একটি নতুন তরুণের পক্ষে ছিল অসম্ভব কঠিন একটা কাজ। আর ওই স্টাইল অনুকরণ করলেও হবে না। নতুন স্টাইল আনতে হবে। সম্ভবত এটাই ছিল উত্তমকুমারের মনের বাসনা। কারণ ওই স্টাইল ছিল এককভাবে ছবি বিশ্বাসের। সুতরাং ওই পর্বতে আর জায়গা নেই। কেরিয়ারের অন্যতম দুরূহ কাজটি শুরু করলেন উত্তমকুমার। ‘পথে হল দেরি’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’ বা ‘শুন বরনারী’র মতো একঝাঁক ছবিতে এই দু’জনের দ্বৈরথ দেখে বাংলার দর্শক চমৎকৃত হয়েছে। 
ঠিক এই মনস্তত্ত্ব কি সত্যজিৎ রায় অনুধাবন করেছিলেন ‘নায়ক’ ছবির চিত্রনাট্য রচনার সময়? পাড়ার মেন্টর শঙ্করদার অনুরোধ অথবা আপত্তি উপেক্ষা করেই সিনেমায় যোগ দেয় অরিন্দম। প্রথম দিনের শ্যুটিং ছিল ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবির বাবা ও পুত্রের কথোপকথন। দাপুটে অভিনেতা মুকুন্দ লাহিড়ির সঙ্গে প্রথম দিনেই পুত্ররূপী অরিন্দমের মতান্তর হয়েছিল স্রেফ এই সংলাপ উচ্চারণ আর কণ্ঠ প্রক্ষেপণের পার্থক্য নিয়ে। অরিন্দম তাঁর বন্ধুকে বলেছিলেন যে, এই প্যাটার্ন বদলে দিতে চান তিনি। 
দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাবা অথবা বান্ধবীর বাবা চরিত্রে ছবি বিশ্বাস ছিলেন অতুলনীয়। প্রখর ব্যক্তিত্ব দিয়ে সামনে থাকা যে কোনও নায়ককে স্ক্রিন প্রেজেন্সের দিক থেকে কিছুটা স্তিমিত করে দেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল তাঁর। কিন্তু উত্তমকুমার এবং ছবি বিশ্বাসকে একের পর এক ছবিতে একই ফ্রেমে দেখার পর আমরা আবিষ্কার করি, কী সাংঘাতিক মুন্সিয়ানার সঙ্গে এতটুকু অতি নাটকীয়তা বা অতি-অভিনয় না করেও, মাথা ঠান্ডা রেখে বর্ষীয়ান অভিনেতার সঙ্গে কার্যত ডুয়েল লড়েছেন মহানায়ক। তাও এক-আধদিন নয়, একটানা বহু বছর।
ছায়াদেবী নামক মানুষটি আসলে রহস্যময়। চেনা বন্ধু বা চেনা শত্রুর সঙ্গে যে কোনও সময় সম্পর্ক রক্ষা করা যায় প্র঩য়োজনমতো বুদ্ধি ও আবেগ মিশিয়ে। কিন্তু ছায়াদেবী নামক অলীক চরিত্রটি তো আর চেনা নয়। তিনি হলেন বাংলা ছায়াছবির জগতের অন্যতম আনপ্রেডিক্টেবল এক চরিত্রশিল্পী। তিনি ঠিক কীভাবে, কখন, কোন মুহূর্তে নিজের গোপন ট্রাম্প কার্ড দিয়ে সহ অভিনেতা আর অভিনেত্রীদের হারিয়ে দেবেন নিমেষের মধ্যে, সেটা কেউ আগাম বুঝবে না। ছেলে আর বাবার ইগোর লড়াইয়ে যুগ যুগ ধরে বাংলা সিনেমার মায়েরা দুঃখই পেয়ে এসেছেন। তারপর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হবেন, এ ছিল জানা কথা। ছায়াদেবীকে খলচরিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে দেখে আমাদের মনে হয়েছে, তাঁর মুখনিঃসৃত প্রতিটি বাক্য যেন শেল হয়ে বুকে বেঁধে। এতটা অমানবিক বাক্য উচ্চারণ করা কীভাবে সম্ভব! অভিনয় দেখে তাঁর উপরে ক্রুদ্ধ হয়েছেন বাংলা ছবির দর্শকরা। আমরা চিরকাল জেনেছি, অভিনয়ের প্রধান অস্ত্র হল সংলাপ। একটি সংলাপ কতভাবে কার্যকরী উপায়ে নানাবিধ আবেগ মিশিয়ে বলা হলে দর্শক চমৎকৃত হয়, সেটা যে শিল্পীরা জানেন, তাঁরাই সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী। কিন্তু সেই ছায়াদেবীর সংলাপহীন নীরব অভিনয় আমাদের স্তব্ধ হয়ে দিয়েছে। বারংবার। কীভাবে? ধরা যাক ‘দেয়া নেয়া’ ছবির একটি দৃশ্যের কথা। গান গাওয়া বনাম বাবার অফিসে নিয়ম করে যাওয়ার মতান্তর নিয়ে কমল মিত্র বনাম উত্তমকুমারের তুমুল হাই-ভোল্টেজ নাটকীয় দৃশ্য। এই গোটা দৃশ্যে ছায়াদেবী শুধু অভিব্যক্তি দিয়ে গেলেন। কমল মিত্রের বলা যে কথাটি তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া একেবারেই অসম্ভব, সেটি শুনে শুধু বললেন—‘এ তুমি কী বললে!’ কথা নয়, যেন হাহাকারধ্বনি। ওই কয়েক মিনিট ধরে পর্দায় বাবা, ছেলের সঙ্গে একটি সংলাপও ছিল না ছায়াদেবীর। কিন্তু অন্যদের বলা প্রতিটি সংলাপের সঙ্গে বদলে বদলে যাচ্ছিল তাঁর মুখের অভিব্যক্তি। 
বলা যেতে পারে ‘থানা থেকে আসছি’ ছবিতে মিসেস সেন এবং তিনকড়িবাবুর কথোপকথনের মুহূর্ত। মিসেস সেনরূপী ছায়াদেবীর আভিজাত্যপূর্ণ দম্ভের নিখুঁত চরিত্রায়নের সামনে পুলিস অফিসার তিনকড়িবাবু (উত্তমকুমার) নির্লিপ্ত হয়ে যেভাবে মর্মভেদী দৃষ্টিনিক্ষেপ করছিলেন, মনে হচ্ছিল, তাঁদের মধ্যে একটি গোপন কবিগান চলছে। ছায়াদেবী কিন্তু যে সে অভিনেত্রী নন! তাঁর হোমওয়ার্ক বলতে ছিল, নিয়ম করে ইংরেজি সিনেমা দেখা। প্রিয় সিনেমা—‘মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি’, ‘উইটনেস ফর দ্য প্রসিকিউশন’। তাঁর প্রিয় অভিনেতা চার্লস লটন। সুতরাং সহজাত অভিনয় প্রতিভার পাশাপাশি একটি নিখুঁত অনুশীলনও চলত। উত্তমকুমার জানতেন কখনও দেহাতি, কখনও স্নেহময়ী মা, কখনও রিনা ব্রাউনের গর্ভধারিণী, স্বীকৃতিহীন মায়ের চরিত্র যিনি করেছেন, তিনি যে কোনও সময় অভিনয়ের দাবাখেলায় হারিয়ে দেবেন উল্টোদিকের চরিত্রাভিনেতাকে। ছায়াদেবীর মতো অভিনেত্রীর সঙ্গে নিজস্বতা বজায় রেখে  স্বমহিমায় কাজ করা উত্তমকুমারের কাছে ছিল অবশ্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। সফলও হন। এ এক অনন্য কৃতিত্ব।
দু’জন মানুষকে শ্যুটিংয়ের সময় উত্তমকুমার ভয় পেতেন। নির্দ্বিধায় স্বীকারও করেছেন সেকথা। কারণ এই দু’জনের কাছে ক্যামেরা-ট্যামেরা কোনও ব্যাপারই নয়। তাঁদের পর্দায় দেখলে বিশ্বাসই হয় না যে, তাঁদের সামনে শ্যুটিংয়ের সময় একঝাঁক লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু সেসবে পাত্তাই দিতেন না তাঁরা। মনেই হতো না যে তাঁরা অভিনয় করছেন। এহেন তরুণকুমার এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় নামক দু’টি পাশুপত আর ব্রহ্মাস্ত্রের সামনে উত্তমকুমারকে দিনের পর দিন অভিনয়ে সফল হতে হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রে স্বাভাবিক অভিনয়ের কোনও সিলেবাস থাকলে, এই দু’জন সেই টেক্সট বুকের লেখক।
মনে আছে রিনা ব্রাউনের সেই শর্ত, ‘ওয়ান কন্ডিশন...অভিনয়ের সময় ও যেন আমাকে টাচ না করে’ অথবা কৃষ্ণেন্দুর পাল্টা প্রশ্ন, ‘যাহ্‌, না ছুঁয়ে পার্ট করব কী করে?’ ঠিক ততটাই মনে আছে তরুণকুমারের তাৎক্ষণিক রিফ্লেক্স, ‘পার্ট করব কী করে! না ছুঁয়ে বুঝি পার্ট করা যায় না? তুই না ছুঁয়েই পার্ট করবি...আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম।’
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় কত বড় অভিনেত্রী ছিলেন? তিনি মঞ্চে পর্যন্ত অভিনয়ে উত্তমকুমারকে ম্লান করে দিয়েছিলেন। ‘শ্যামলী’ নাটক ৫০০ রজনী ধরে অভিনীত হয়েছিল। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এবং উত্তমকুমার ছিলেন প্রধান দুই চরিত্রে। কিন্তু উত্তমকুমারকে যেন ছাপিয়ে গিয়েছিলেন সাবিত্রী। সেই নাটক এমনই জনপ্রিয় হয় যে, শুধু রাতের দর্শকরা যাতে বাড়ি ফিরতে পারে, সেজন্য দু’টি দোতলা বাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। বাস দু’টি অডিটরিয়ামের সামনে অপেক্ষা করত শো ভাঙার জন্য।
উত্তমকুমার আজীবন ধরে অসংখ্য পরীক্ষা দিয়েছেন। তার মধ্যে একটিও অন্যটির তুলনায় কম কঠিন ছিল না। ‘শেষ অঙ্ক’ ছবিতে উত্তমকুমারের বিবাহ করার ঩দিনেই হঠাৎ তাঁর বাড়িতে হাজির হন এক নারী। যিনি এসেই দাবি করেন, সুধাংশুরূপী উত্তমকুমারের স্ত্রী তিনি। কিন্তু সেটা কীভাবে হবে? স্ত্রীর তো মৃত্যু হয়েছে! তাহলে এই মহিলা আবার কোথা থেকে এলেন? আর ইনি তো তাঁর স্ত্রী নন। তাহলে এই দাবির কারণ কী? সেই নারী আবার এক উকিল নিয়ে এসেছেন। সেই সময় ঘরে কারা কারা উপস্থিত? সে যেন একটি বিশেষ দিনে, একটি বিশেষ তিথিতে তাবৎ নক্ষত্র সমাবেশ ঘটেছে। ঘরে হাজির পাহাড়ী সান্যাল, উকিলরূপী কমল মিত্র, স্ত্রীর দাবি করা কল্পনারূপী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। আর একটু আগেই ছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। সকলের কাছে উত্তমকুমার ওই মুহূর্তে সন্দেহের পাত্র। আর তাঁর সামনে মহাতারকাদের মহা-সমাবেশ। এ যেন এক চক্রব্যূহ! অভিমন্যু পারতেন এই ব্যূহ ছেড়ে বেরোতে? সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় আশ্চর্য এক অভিনয় করলেন আগাগোড়া। তিনি সত্যি নাকি মিথ্যা? দর্শক তখনও জানেন না। উত্তমকুমার সত্যি বলছেন? নাকি মিথ্যা? দর্শক তাও জানেন না। এহেন এক কঠিন চিত্রনাট্যের সিকোয়েন্সে এই দুই মহাতারকা অনায়াসে নিজেদের সেরা অভিনয় বের করে নিয়ে এলেন। সেই মুগ্ধতা আজও কাটেনি দর্শকদের! ‘নিশিপদ্ম’ সিনেমায় হঠাৎ বহুকাল পর পুষ্পকে আবিষ্কার করেন আনন্দ। কলকাতার এক মেসে। পুষ্পের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিল পতিতালয়ে। তারপর দু’জন পরস্পরকে ভালবাসেন। কালের নিয়মে দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদও ঘটে। এরপর হারিয়ে যান পরস্পরের থেকে। অবশেষে এত বছর পর মেসে যখন দেখা হল, সেই পুষ্প পরিচারিকার কাজ করছে। আনন্দরূপী উত্তমকুমার স্তব্ধ। সেই মেসবাড়ির বারান্দায় দেখা হওয়ার দৃশ্যটি ছিল উত্তমকুমারের কাছে কঠিন এক পরীক্ষা। কারণ তিনি জানতেন, এরকম সময়ে সাবিত্রী ঠিক কী অসম্ভব এক অভিব্যক্তি আনবেন! সুতরাং তাঁকে সাযুজ্য রাখতে হবে। ‘মৌচাক’ ছবিতে উত্তমকুমারকে বস্তুত সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ দেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। কমেডি লড়াইয়ে কে বেশি গোল দেবেন? 
ছোট থেকে যদি কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার অনুশীলন হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তী কালে এইসব পরীক্ষা অনেকটা সহজ হয়ে যায়। জীবন থেকে ক্রীড়া, পারফরম্যান্স থেকে পড়াশোনা—সব ক্ষেত্রেই এই ফর্মুলা প্র঩যোজ্য। আর এই ফর্মুলা অনুযায়ী উত্তমকুমারের তাবৎ পরীক্ষায় পাশ করা ছিল ভবিতব্য! কেন? কারণ জানতে ফিরতে হবে উত্তমকুমারের অভিনয় জীবনের শুরুর সময়ে। কেরিয়ারের শুরুতে পরপর সাতটি ছবি ফ্লপের পর যে ছবির মাধ্যমে পরিচিত হন, তার নাম ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। সেই সিনেমায় তিনি মহাজাগতিক দুই শিক্ষাগুরুকে একেবারে সামনে থেকে দেখেন। বুঝতে শেখেন, কীভাবে অভিনয় করতে হয়। তাঁদের সামনে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অভিনয় করার মধ্যে দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়, সেই যাত্রা যে তাঁকে স্বর্ণখচিত রথেই পৌঁছে দেবে, তা তো নিশ্চিত। ওই দু‌ই ক্ষণজন্মা শিল্পীর নাম—তুলসী চক্রবর্তী এবং মলিনা দেবী। 
ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, ছায়া দেবী, মলিনা দেবী, পদ্মা দেবী, ভারতী দেবী, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, অহীন্দ্র চৌধুরী,  জীবেন বোসেরা তো বটেই, তরুণকুমার, অনুপকুমারদের মতো অসাধারণ অভিনেতাদের অভিনয়-দক্ষতার মিসাইল সামলাতে হয়েছে উত্তমকুমারকে। আজীবন। আর আর সর্বোপরি তাঁর নায়িকারা। উত্তমকুমারের অভিনয় শিক্ষার হয়তো কোনও নির্দিষ্ট গুরু ছিলেন না! কিন্তু বাংলা ছবির কালোত্তীর্ণ শিল্পীদের সঙ্গে নিরন্তর অভিনয়ের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলেছে বরাবর। আর এর মধ্যে দিয়ে তিনি যে ক্রমেই উত্তরণের পথে হেঁটেছেন, সেও কি একপ্রকার নিরলস দীক্ষাপ্রাপ্তি নয়?
গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
 সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস

23rd     July,   2023
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা