বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

শতবর্ষে হৃষীকেশ

লিলি চক্রবর্তী: মুম্বইতে সেট পড়েছে। জোরকদমে চলছে শ্যুটিং। সেটের বাইরে চা খাওয়া, আড্ডা দেওয়ার জায়গায় অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে একটা দাবার বোর্ড। এটা ছিল সিগনেচার। দাদাকে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা ওই দাবার বোর্ড দেখলেই বুঝতে পারতেন ওটা হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের শ্যুটিং সেট। আমি ওঁকে দাদা বলতাম, হৃষীদা।  
হৃষীদার পরিচালনায় আমি দুটো ছবি করেছি। মুম্বইয়ে থাকলে হয়তো আরও ছবি করতাম। প্রথম করেছিলাম ‘চুপকে চুপকে’। সেটা ১৯৭৩ নাগাদ। তার বছর খানেক পর ‘আলাপ’। হৃষীদার সঙ্গে কাজের আলাদা আনন্দ ছিল। উনি সেটে থাকলে যখন লাইট হতো, বেশিরভাগ সময় বাইরে বসে দাবা খেলতেন। খেলার লোক ঠিক জোগাড় করে নিতেন। প্রতিদিন যে একই লোকের সঙ্গে খেলতেন, তাও নয় কিন্তু। শ্যুটিংয়ে প্রতিদিন দাবা খেলার সঙ্গী হিসেবে কাউকে পেয়ে যেতেন ঠিক। সেটে বাংলায় অনেক কথা বলতেন। ওঁর ইউনিট বা আর্টিস্টরা ঠিক বুঝেও যেতেন। ধর্মেন্দ্রকে বলতেন ধরম। অমিতাভকে বলতেন অমিত। ‘অমিত ইধার এসো’— এরকম বাংলা, হিন্দি মেশানো ডাক ছিল দাদার। অমিতাভ হয়তো বললেন, ‘আর একটা শট নেবেন দাদা? ওয়ান মোর?’ তখন বলতেন, ‘ফিলিম কা পয়সা তু দেগা?’ তখন তো ফিল্মের রোলে শ্যুটিং হতো। এখনকার মতো তো ক্যাসেটে হতো না। এরকম মজা করে শ্যুটিং করতাম আমরা।
‘চুপকে চুপকে’তে প্রথম কাজ করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু দাদার সঙ্গে আমার আলাপ তারও আগে হয়েছিল। কলকাতায় নয়, মুম্বইতেই। ওই ছবিটার কয়েক বছর আগে অন্য একটা ছবি করতে গিয়েছিলাম ওখানে। একটা ছবি হয়েছিল, শর্মিলা (ঠাকুর) ছিল নায়িকা। আর একজন বাঙালি ভদ্রলোক শর্মিলার বাবা হয়েছিলেন। তিনি এখন মারা গিয়েছেন। নামটা ভুলে গিয়েছি। তখন আমাকে শর্মিলার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করতে বলেছিলেন। চরিত্রটি মারাও যাবে, ছোট্ট কাজ। আমি সেটা করিনি। কারণ সে সময় মুম্বইতে গিয়ে ওরকম ছোট রোল করলে ওই ধরনের রোলই পরপর করতে হতো। ওই রকম অফারই আসত। হৃষীদা বলেছিলেন, ‘তুমি ভেবে দেখ।’ আমি যে ওই ছবিটা করিনি, তার জন্য কখনও রাগ করেননি।
আমার একটা মালায়লম ছবি সম্পাদনা করেছিলেন হৃষীদা। হিরোইন প্রধান গল্প ছিল। ছবির নাম ‘প্রিয়া’। ওটা ১৯৭০... বা তার কিছু আগেই হয়তো হবে। বোধহয় ’৬৮-ই হবে। তারপর ‘আচানক’ নিয়ে কথা হয়েছে। উনি এবং এন সি সিপ্পি প্রযোজক ছিলেন। ওই ছবিতে আমাকে নেবে কি নেবে না, এমন একটা ভাবনা তখন সবার মধ্যে। রাখি (গুলজার) বলেছিল, ‘হ্যাঁ, লিলিকে নিয়ে নাও।’ হৃষীদা বলেছিলেন, ‘আমাদের লিলি? ও খুব ভালো আর্টিস্ট।’ তারপর ‘চুপকে চুপকে’ করলাম। সেটাতে দাদা বলেছিলেন, ‘এই চরিত্রটা লিলি করবে।’ তারপরের ছবির চরিত্রটা আরও একটু ভালো। সেই ছবির নাম ‘আলাপ’। অমিতাভের সঙ্গে আমার অনেক দৃশ্য ছিল।
যখন ‘আলাপ’-এর শ্যুটিং করছি, আমার মনে আছে, প্রথম দিন হেয়ার ড্রেসারকে ডেকে বললেন, ‘লিলির ফুল মেকআপ হয়ে গেলে আমাকে দেখিয়ে নেবেন। কিছু অ্যাড করতে হলে আমি বলে দেব।’ ওখানে বড় বাড়ির বউয়ের চরিত্র ছিল। মাথায় ফুল দিয়ে, গয়না পরিয়ে আমাকে সাজিয়েছে। চুল বাঁধা হয়ে যাওয়ার পর আমার হেয়ার ড্রেসার রশিদা বললেন, ‘দাদা বোলা হ্যায় আপকো বাহার জানে কে লিয়ে, দিখানেকে লিয়ে।’ বাইরে গিয়ে দেখি সেই দাবা খেলছেন। আর অমিতাভ দূরে আমার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে। সেটের বাইরে বিরাট বড় একটা চৌকি ছিল, সেটাতে একটা পা তুলে দিয়ে অমিতাভ কার সঙ্গে যেন গল্প করছেন! হৃষীদা আমাকে দেখে রশিদাকে বলে দিলেন, মাথার ফিতেটা যেন দেখা যায়। বড় বাড়ির বউরা ফিতে দিয়ে চুল বাঁধতেন সে সময়। সেটা যেন ক্যামেরা ধরা পড়ে। এত ডিটেলে কাজ করতেন। এটা আমার খুব ভালো লাগত। আসলে ফিল্ম জগতে উনি তো প্রথমে সম্পাদনা করতেন। ফলে পরিচালক হওয়ার পর এডিটটা চিন্তা করে শটগুলো নিতেন। আমাদেরও ভালো লাগত। এক্সট্রা বেশি কিছু করতে হতো না। ওইভাবে মাপ করে শট নিতেন বলে খুব সুন্দরভাবে কাজ শেষ হতো। কারও কোনও অভিযোগ থাকত না। ছবি সম্পাদনা করতে করতে পরিচালনার কথা ভাবলেন কেন, এটা জানতে চাইলে বলতেন, ‘আমার ছবি করতে ভালো লাগত। এডিট করতে গিয়ে মনে হতো, এত সুযোগ রয়েছে! তাহলে আমিই পরিচালনা করি।’
কাজের বাইরেও হৃষীদার সঙ্গে দেখা হতো আমার। মুম্বইতে টানা শ্যুটিং চলছে তখন। অবসরে ওঁর বাড়িতে যেতাম। শুধু প্রয়োজনে নয়, গল্প করতে, আড্ডা দিতেও ওঁর বাড়িতে গিয়েছি অনেকবার...। বান্দ্রায় সমুদ্রের ধারেই থাকতেন। একটা মজার ঘটনা মনে পড়ছে...। ওঁর বাড়িতে একটা গাছ ছিল। সুপারি কিংবা তাল, এখন আর সেটা সঠিক মনে পড়ছে না। গাছটা কিছুতেই কাটতে দেননি। ওই গাছের সঙ্গে কোনও আবেগ জড়িয়ে ছিল কি না জানি না... বাড়ির বারান্দার ভিতরে গাছটা থেকেই গিয়েছিল। গাছটা নিজের মতো মাথা তুলেছিল। আর গুঁড়ির জায়গা বাদ দিয়ে বাকিটা সিমেন্ট করিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে সবথেকে মজার ছিল ওঁর চারপেয়ে পোষ্যরা। কুকুর ভালোবাসতেন। অনেক কুকুর ছিল ওঁর বাড়িতে। তাদের আবার চায়ের নেশা! সন্ধে হলেই সব ক’টা চায়ের জন্য ছটফট করত। আমরা হয়তো অনেকে দাদার বাড়িতে বসে গল্প করতে করতে চা খাচ্ছি, ওরাও তখন চা খাবে। ওদের আবার আলাদা কাপ, ডিশ ছিল। কাপ থেকে চা ডিশে ঢেলে ঢেলে দেওয়া হতো। আর ওরা চুকচুক করে খেত। নিয়মিত চা খাওয়ার অভ্যেস ছিল পোষ্যগুলির। দাদা নিজেও খুব চা খেতে ভালোবাসতেন। লোকজন খুব ভালোবাসতেন। আমাকে বলতেন, ‘মাঝে মাঝে আসবি, আমার সঙ্গে গল্প করবি। আমি একেবারে একা থাকি।’ কলকাতায় হাজরায় ওঁর বাড়ি ছিল। কিন্তু কাজের জন্য বেশিরভাগ সময় মুম্বইতেই থাকতেন। খুব গল্প করতে ভালোবাসতেন।
হৃষীদার কাজের ধরনে বাঙালিয়ানাই বেশি ছিল। সেজন্য সকলে ওঁকে পছন্দ করতেন। যার জন্য একদম অন্য ঘরানার শ্যুটিং হতো। মুম্বইতে কাজ করলেও একদম মনে হতো বাঙালি প্রোডাকশনে কাজ করছি। খাওয়াদাওয়াও বাঙালিদের মতো। যার যেমন পছন্দ। দাদা নিজেও খেতে ভালোবাসতেন। সবরকম বাঙালি খাবার পছন্দ করতেন। ওঁর সহকারীদের মধ্যে অনেকেই বাঙালি ছিলেন। তবে এটাও ঠিক, সবসময় বাংলায় কথা বলে বাকি শিল্পীদের অস্বস্তিতে ফেলতেন না। ধরুন, আমাকে যখন শট বোঝাচ্ছেন, তখন অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক হিন্দি। কারণ পাশে অমিতাভ রয়েছেন, ফরিদা জালাল রয়েছেন— সবাইকে নিয়ে কাজটা করতে হবে তো...। আলাদা করে সে সময় স্ক্রিপ্ট রিডিং হতো না। অবশ্য অমিতাভকে স্ক্রিপ্ট পাঠাতেন কি না, তা আমি জানি না। আমাকে গল্প শুনিয়ে দিতেন। চরিত্রটা বুঝিয়ে দিতেন। আমার কোনও অসুবিধে হতো না। কারণ এখানেও তখন আমি ওভাবে অনেক ছবি করেছি। মানিকদা (সত্যজিৎ রায়), তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার ওঁরা আমাদের স্ক্রিপ্ট শোনাতেন। পরে দেখেছি, ঋতুপর্ণ ঘোষ বা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় আগে থেকেই স্ক্রিপ্টটা দিয়ে দিতেন। ওদের কাজের ধরন অন্যরকম। ফলে আগে থেকে পড়া থাকত।
হৃষীদার সঙ্গে কাজ প্রসঙ্গে আরও একটা কথা খুব মনে পড়ে। উনি কখনও রেগে যেতেন না। খুব ডিসিপ্লিন মেন্টেন করতেন। কেউ হইচই করত না। সকলে হয়তো কিছুটা ভয় পেত ওঁকে। খুব যে রাশভারী ছিলেন, তা নয়। মজাও করতেন। কাছে গিয়ে কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করল, ‘দাদা, এটা করব?’ তখন বললেন, ‘না না, যেরকম আছে, সেরকমই করো’। সবাই ওঁকে খুব মানতেন। মানিকদাকে টালিগঞ্জে মানে এখানকার ইন্ডাস্ট্রির সকলে যেমন শ্রদ্ধা করতেন, তেমনই বম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে তখন হৃষীদা মানে ভগবান। 
ওঁর সব ছবিতেই কোনও না কোনও বার্তা থাকত। উনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার পেলে খুশি হতেন। আর ওর মতো শিল্পীর পুরস্কার পাওয়াই উচিত। ওর সঙ্গে কাজ করার জন্য সকলে মুখিয়ে থাকত। পারিশ্রমিক না দিলেও বোধহয় কাজ করবে, এমন ব্যাপার ছিল। শেষের দিকে আর যোগাযোগ হয়নি। আমি তো মুম্বই ফিরে যাইনি, কলকাতাতেই থেকে গেলাম। দাদাকে কখনও প্রণাম করতে দেখিনি। ঈশ্বর ভক্ত ছিলেন কি না বুঝতে পারিনি! এতদিন পরেও দাদার কথা মনে পড়লে দু’টো জিনিস খুব মনে পড়ে... ওঁর দাবা খেলা আর শ্যুটিংয়ে হোক বা আড্ডায় ঘন ঘন চা খাওয়ার অভ্যেস।
 ছবি সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে
 গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
 সহযোগিতায় : স্বাগত মুখোপাধ্যায়

3rd     July,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা