বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

অন্য রথ
রুকুনা
তরুণ চক্রবর্তী

 কলিঙ্গ রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বর। ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই নগরীর প্রাচীন লিঙ্গরাজ মন্দিরে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় রুকুনা রথযাত্রা। 

পুরাণ আমাদের কত যে আশ্চর্য সব কাহিনি শোনায়! যুগ যুগ ধরে চলে আসা তেমনই এক কাহিনি বিশেষ করে স্মরণে আসে এই সময়টাতেই। জরা নামে এক শিকারির হাতে স্বেচ্ছামৃত্যুবরণ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরিণত হয়েছিলেন কাষ্ঠখণ্ডে। তারপর একদিন ভেসেও এসেছিলেন পুরীর সমুদ্রতীরে। নীলাচলের অধীশ্বর সেই কাষ্ঠখণ্ড তুলে এনে মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন। এরপর দেবলোক থেকে বিশ্বকর্মা নেমে এসেছিলেন কাষ্ঠখণ্ডটি তক্ষণ করে দেবতার রূপ দিতে। তাঁর শর্ত ছিল, মূর্তি নির্মাণকালে মন্দিরের দ্বার বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু অধৈর্য হয়ে রাজা সেই শর্ত ভঙ্গ করায়, বিশ্বকর্মা তাঁর কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে যান। 
এর একটি ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। জগতের যিনি নাথ বা প্রভু, তাঁকে দর্শন করার জন্য ভক্তদের আকুলতা তো থাকবেই। ভক্তের সেই আকুলতা এমনই প্রবল ছিল, দেবতা তাতে সাড়া না দিয়ে পারেননি। তাঁর শরীর যতখানি নির্মিত হয়েছিল, সেই অবস্থাতেই তিনি দর্শন দিয়েছিলেন। অপূর্ণ অবয়বের সেই তিন দেবদেবী— জগন্নাথ, তাঁর দাদা বলরাম আর বোন সুভদ্রার বিগ্রহ নিয়ে এক সময় শুরু হয়ে যায় রথব্রজের উৎসব। প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় পুরীতে জগন্নাথদেবের এই রথযাত্রার খ্যাতি তো আজ আন্তর্জাতিক। 
পুরীতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই কেন্দ্রীয় উৎসব বলে গণ্য করা হয়। এমন উৎসব হয় পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে। পুরীর জগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ, বলভদ্রের রথ হল তালধ্বজ আর সুভদ্রার রথটি হল দর্পদলন। রথে চড়ে এঁরা তিন ভাইবোন মিলে পাড়ি জমান মাসির বাড়ি। ঠিক ন’দিনের দিন সেখান থেকে ফিরে আসেন স্বস্থানে। সেদিনটি আমরা উদযাপন করি উল্টোরথ নামে।  জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা কেবল হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষদেরই আরাধ্য দেবতা নন, তাঁরা হয়ে গিয়েছেন গণদেবতা। বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, শাক্ত, বৈষ্ণব, মুসলমান— সবার কাছেই তাঁরা শ্রদ্ধার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত। রথের রশিতে টান দিয়ে তাই কৃতার্থ হতে চান সকলেই। ‘ভক্তেরা লুটায়ে পথে’ প্রণাম করেন আজও। 
আমাদের দেশের নানা জায়গায় সোনা, রুপো, পিতল, লোহার মতো বিভিন্ন ধাতু নির্মিত রথ যেমন আছে, তেমনই আবার কাঠ, পাথর, শোলার রথও দেখা যায়। রথের বিগ্রহ এবং রথযাত্রার সময়ের ভিন্নতাও বড় কম নয়। পারিবারিক রথযাত্রায় যেমন কুলদেবতাকে রথে বসানো হয়, সর্বজনীন রথযাত্রায় সাধারণত জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাই রথারূঢ় হন। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য নেপালে আবার কুমারী পূজা উপলক্ষে রথযাত্রা পরিণত হয়েছে ধর্মীয় উৎসবে। সেখানে রথে একজন কুমারী মেয়েকে বসিয়ে রাজার নির্দেশে রথ টানা হতো। পুরীর কাছেই কেন্দ্রাপাড়ায় পুরীর রথের চাইতেও বড় একটি রথ আছে। বলরামই সেই রথের অধিদেবতা বলে এটি বলরামের রথ নামেই পরিচিত। 
দক্ষিণ ভারতে তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরম বা মামল্লপুরমে খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে একশিলায় তৈরি হয়েছিল পঞ্চরথ মন্দির। এগুলির প্রতিটিই একটি মাত দীর্ঘ গ্রানাইট পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষে পল্লবরাজ প্রথম মহেন্দ্রবর্মণ ও তাঁর পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মণের রাজত্বকালে মন্দিরগুলি নির্মিত। এগুলির নামকরণ করা হয়েছে পঞ্চপাণ্ডব ও তাঁদের পত্নী দ্রৌপদীর নামানুসারে— ধর্মরাজ রথ, ভীম রথ, অর্জুন রথ, নকুল রথ, সহদেব রথ ও দ্রৌপদী রথ। 
ব্রহ্মপুরাণ, পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, কপিল সংহিতা এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থে মেলে রথযাত্রার নানা পরিচয়। মৎস্যপুরাণে উল্লেখ আছে, কার্তিক মাসে দেবাদিদেব মহাদেবের রথযাত্রার। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার কথা উল্লেখিত আছে আবার বরাহপুরাণে। দক্ষিণ ভারতে কার্তিক মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে বিষ্ণুর রথযাত্রার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে পৌষ মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে নটরাজের রথযাত্রা খুবই জনপ্রিয়। 
কোনওকালে সূর্যদেবের রথযাত্রা হতো নাকি মাঘ মাসে। অথচ সূর্যের অয়ন পরিবর্তনের কালেই নববর্ষার সূচনা বলে আমাদের দেশে আজও প্রচলিত আষাঢ় মাসের রথযাত্রা উৎসবকে সৌরোৎসবও বলা হয়ে থাকে। কৃষিবর্ষ সূচনার ধারণাটিই এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। রথারূঢ় বলরামকে আমরা যে হলস্কন্ধ দেখি, তার কারণ, তিনি কর্ষণের দেবতা। বৈশাখী পূর্ণিমায় এককালে মহাসমারোহে উদযাপন করা হতো বুদ্ধদেবের রথযাত্রা। বিহারের বুদ্ধগয়ায় খোদিত আছে সপ্তাশ্ববাহিত সূর্যদেবের রথ। 
পশ্চিমবঙ্গের কোথাও কোথাও জৈনদের, কোথাও বা রামসীতার রথযাত্রা আজও অনুষ্ঠিত হয়। বাঁকুড়া জেলার চাতরায় বিজয়াদশমীর দিন অনুষ্ঠিত হয় রাবণকাটা রথ। 
একদা কলিঙ্গরাজ্যের রাজধানী ইতিহাস প্রসিদ্ধ মন্দিরনগরী ভুবনেশ্বরের অন্যতম প্রাচীন লিঙ্গরাজ মন্দিরে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় রুকুনা রথযাত্রা। একাদশ শতাব্দীতে রাজা ললাট কেশরী নির্মাণ করেছিলেন এই লিঙ্গরাজ মন্দির। গ্রানাইট পাথরে তৈরি চক্রাকার লিঙ্গরাজ মন্দিরটি কলিঙ্গ স্থাপত্য অনুযায়ী বিমান, জগমোহন, শটমন্দির ও ভোগমণ্ডপ— এই চারভাগে বিভক্ত। মূলমন্দিরটির উচ্চতা ১৬৫ ফুট। মন্দির ও প্রাচীরগাত্রে ফুল, লতাপাতার সূক্ষ্ম কারুকাজ, ওড়িশি ভাস্কর্যের অপূর্ব শিল্পকলার পরিচয় বহন করছে। মন্দিরে অবস্থান গণেশ, কার্তিক ও দেবী পার্বতীর। 
লিঙ্গরাজ মন্দিরটি ভগবান বিষ্ণু ও শিবের মিলিত রূপ হরিহরের নামে উৎসর্গীকৃত। পুরীর রথযাত্রা উৎসবের আগে প্রতিবছর চৈত্র মাসের অশোকষ্টমীর দিন লিঙ্গরাজের রুকুশ রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। অশোকাষ্টমী তিথিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন দেবী শক্তি এবং মহাদেব। দেবী দুর্গার আরাধনার জন্য এই তিথিটি সবচেয়ে বেশি পুণ্যদায়ক বলে শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত লিঙ্গরাজ মন্দিরের এই অশোকাষ্টমী উদ্‌যাপন বিশেষ তাৎপর্যবাহী। এই তিথিতেই দেবীর কাছ থেকে শ্রীরামচন্দ্র পেয়েছিলেন রাবণ বধের অস্ত্র। আবার এ দিনটিতেই উদযাপিত হয়ে থাকে দেবাদিদেব মহাদেবের রথযাত্রা। ভুবনেশ্বর নামটি তো ত্রিভুবনেশ্বর মহাদেবের অধিষ্ঠানস্থল জ্ঞানেই। আবার তিনিই হলেন লিঙ্গরাজ মহাপ্রভু। শিরোভূষণ চন্দ্র থাকায় তিনি চন্দ্রশেখরও বটে। 
শিবরাত্রির মতোই রুকুনা রথযাত্রা যেমন ভুবনেশ্বরের বৃহত্তম উৎসব, সেইসঙ্গে এটি লিঙ্গরাজ মন্দিরের অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী উৎসবও বটে। শিবপুরাণ মতে, দেবাদিদেবের রথটি নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বকর্মা। হেমবর্ণ মহাজাগতিক সেই রথের নাম ছিল রুকমা (সুবর্ণাভ) রথ। এই রুকমার নাম অনুসরণ করেই লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর রথের নাম রাখা হয় রুকুনা রথ। এই রথের যাত্রা শুরুর ইতিহাস আছে পুরাণে। সেখানে বলা হয়েছে, ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্র তাঁর চোদ্দো বছরের বনবাসকালে একবার ‘একাম্র ক্ষেত্র’ পরিদর্শন করেছিলেন। আমকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় আম্র। লিঙ্গরাজ মহাপ্রভু একটি আমগাছের তলা থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে স্থানটি ‘একাম্র ক্ষেত্র’ হিসেবে খ্যাত হয়। লিঙ্গরাজ সেখানকার মৃত্তিকাভেদ করে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে তাঁকে স্বয়ম্ভু লিঙ্গ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। 
শ্রীরামচন্দ্র একাম্রক্ষেত্রে গেলে লিঙ্গরাজ মহাপ্রভু তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে সেখানে কিছুদিন অতিবাহিত করার জন্য অনুরোধ করেন। শ্রীরামচন্দ্র তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তিনি যেখানে অবস্থান করেছিলেন, সেই স্থানটি পরবর্তীকালে রামেশ্বর নামে পরিচিতি লাভ করে। একাম্র ক্ষেত্রে লিঙ্গরাজ মহাপ্রভু শ্রীরামচন্দ্রের জন্মদিনটিও উদ্‌যাপন করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠান উদ্‌যাপন পর্বে তিনি দেবী পার্বতী, গণেশ এবং কার্তিককে একটি রথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন রামেশ্বরে। রামচন্দ্রের অবস্থানের জন্যই স্থানটির নাম হয়েছিল রামেশ্বর। পরে সেখানে নির্মিত হয় রামেশ্বর মন্দির। রামেশ্বরে শ্রীরামচন্দ্রের জন্মদিন উপলক্ষে লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর রথ নিয়ে যাওয়া স্মরণেই এই রুকুনা রথযাত্রা উৎসব চলে আসছে বলে জনশ্রুতি। ‘অশোকাষ্টমী যাত্রা’ নামেও এই উৎসব পরিচিত। একে আবার ‘পাপ বিনাশকারী যাত্রা’ও বলা হয়ে থাকে। একাম্র পুরাণের স্বর্ণাদ্রি মহোদয় ও চন্দ্রিকা অধ্যায়ে উল্লেখ আছে এই উৎসবের। কপিল সংহিতায় রুকুনা, সাতটি যাত্রার অন্যতম বলে উল্লেখিত। গদাধর রাজগুরুর মতো ওড়িশা বিষয়ক নিবন্ধকাররা চতুর্দশ যাত্রার চোদ্দোটি উৎসবের বিশদ বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে মহাশিবরাত্রিও অন্তর্ভুক্ত। 
লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর রুকুনা রথ নির্মাণপদ্ধতির বিধিসম্মত কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে। প্রথমেই হয় ‘বনজাগা পূজা’। এই পূজা করার জন্য ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করে আনা হয়। বসন্ত পঞ্চমীর দিন উৎসব বিগ্রহ বা ‘চলন্তি প্রতিমা’ নিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে খুর্দা জেলার বাদাতোটা গ্রামে যাওয়া হয়। সেখানে রথের মূল কাঠামো তৈরি করার উপযোগী একটি আমগাছ বাছাই করা হয়। এরপর তার একটি ডালে কোপ মেরে চিহ্ন দেওয়া হয়। রথটি যাঁরা তৈরি করবেন তাঁদেরও গলায় মালা পরিয়ে, নববস্ত্র উপহার দিয়ে সম্মান জানানো হয়। পরদিনই নির্দিষ্ট সেই গাছের গুঁড়িটি কেটে শোভাযাত্রার মধ্যে দিয়ে নিয়ে আসা হয় লিঙ্গরাজ মন্দিরের কাছে মহাথালায়। এ অনুষ্ঠানটি ‘বনজাগা যাত্রা’ নামে পরিচিত। রথের নির্মাণ কাজ শুরুর আগে, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী সেখানে একটি পতাকা তুলে দেওয়া হয়। রথ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অন্য কাঠগুলি সংগ্রহ করে আনা হয় বন থেকে। 
পবিত্র মাঘ সপ্তমীর দিন উৎসব বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া হয় ভাস্করেশ্বর মন্দিরে। সেখান থেকে রুকুনা রথের গঠনশৈলীর বিশদ জেনে নিয়ে কারিগররা ৩৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট রথটি তৈরির কাজ শুরু করেন। এই রথ নির্মাণপর্ব চলে প্রায় দু’ মাস ধরে। ৭০ থেকে ৭৫ জন কারিগর এই কাজে নিয়োজিত থাকেন। রথের সাজসজ্জা তৈরি করেন দর্জি ও শিল্পীরা। রুকুনা রথে থাকে ১৬টি করমণ্ডল, ৪টি তোরণ, ৪টি ঘোড়া, সোনার রঙের কলস এবং দিব্য সিংহাসন। এই দিব্য সিংহাসনেই উৎসব বিগ্রহ প্রভু লিঙ্গরাজ, মা রুকুনা বা রুক্মিণী এবং দোল গোবিন্দকে বসানো হয়। রথের চূড়ায় থাকে সুবাসিত একটি পতাকা। রথ নির্মাণপর্ব শেষ হওয়ার পর লিঙ্গরাজ মন্দিরে পুরীর রাজার উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় রথ প্রতিষ্ঠা পর্ব। একে বলা হয় ‘নেত্র উৎসব’। এই সময় মারিচকুন্তের পবিত্র জল রথের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। পুরীর রথযাত্রা উৎসবে দেবী সুভদ্রার দেবদলন বা দর্পদলন রথের প্রতিষ্ঠার মতো, একই বিধি পালন করা হয় রুকুনা রথের ক্ষেত্রেও। একেও তাই দেবদলন রথ বলা হয়ে থাকে। এ রথের উত্তর দিকে একটি প্রতিষ্ঠা মণ্ডপ এবং তার ভিতরে একটি কুণ্ড তৈরি করা হয়। মণ্ডপের চারটি প্রবেশপথে জলপূর্ণ চারটি মাটির কলস (পূর্ণ কুম্ভ) স্থাপন করা হয়। সপ্তমী তিথিতে পণ্ডিত এক পূজারি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সমস্ত আচার বিধি মেনে এই কাজ সম্পন্ন করেন। 
এরপর অনুষ্ঠিত হয় হোম। হোম-যজ্ঞ সম্পন্ন হওয়ার পর নন্দী, মহাকাল, একদন্ত (গণেশ), কার্তিক, অনন্ত, একচক্ষুবিশিষ্ট রুদ্র, ত্রিমূর্তি, শ্রীকান্ত ও শিখণ্ডীর বিগ্রহ রথের শীর্ষ দেশে স্থাপন করা হয়। রথ সাজানো হয় লাল, হলুদ, সাদা ও নীল রঙের কাপড়, কাঠের তৈরি পরী ও নানা জীবজন্তুর মূর্তি, পতাকা, ছাতা এবং ফুল ও মালা দিয়ে। রথের শীর্ষদেশে রাখা হয় একটি ত্রিশূলও। লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর রথের চারটি চাকার মধ্যে ডানদিকের দুটি চাকা সূর্যদেব এবং বাঁদিকের চাকা দুটি চন্দ্রমার প্রতীক। ডান দিকের চাকার ১২টি পাখিতে দ্বাদশ আদিত্যের অধিষ্ঠান। অন্যদিকে বাঁদিকের চাকার ১৬টি পাখি চাঁদের ১৬টি কলার প্রতীক বলে মনে করা হতো। একালে তার গঠনে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। কাঠের চারটি ঘোড়াকে মনে করা হয় চতুর্বেদের প্রতিনিধি। রুকুনা রথের সারথি হলেন স্বয়ং ব্রহ্মা। যাত্রার দিন অশোকাষ্টমীতে রথের চাকাগুলি পঞ্চ উপকারে পুজো করার পর, চতুর্বেদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে চারটি ঘোড়ার পুজো করা হয়। ভারী সুন্দর এই বিশ্বাস ও কল্পনা। ঋগ্বেদের প্রতিভূ ঘোড়াটি বাতাসের সাহায্যে রথকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। রুকুনা রথকে পৃথ্বীদেবী হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। সমস্ত আচার আচরণ পালনের পর সুগন্ধী ফুল দিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করে পৃথ্বীদেবীর পুজো করা হয়। তাঁর কাছেও প্রার্থনা করা হয় রথ যেন চলে বাতাসের গতিতে। 
প্রচলিত বিশ্বাস, সামবেদের প্রতিনিধিত্বকারী ঘোড়া, ভক্তদের শ্রদ্ধাভক্তির সঙ্গে লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর প্রতি কর্তব্যকর্মের সমন্বয়সাধন করে চলে। 
যজুর্বেদের ঘোড়া অটল ভক্তির সঞ্চার করে যাবে এবং অথর্ববেদের ঘোড়া দুষ্টের দমন করে চলবে এমনই বিশ্বাস করেন ভক্তজনেরা। এরপর পূজা হয় রথের সারথি হিসেবে কল্পিত ব্রহ্মাদেব এবং মা গায়ত্রীদেবীর। রথের নিম্নভাগে থাকেন শূলধারী নন্দীকেশর বা শিবানুচর। সুসজ্জিত রথটি দেখতে হয় পুরীর জগন্নাথদেবের রথের মতোই। 
একাম্র চন্দ্রিকার মতো ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী, সুপ্রাচীন কোন অতীতে লিঙ্গরাজ মহাপ্রভু, দেবী পার্বতী, গণেশ আর কার্তিককে নিয়ে রথে চড়ে রামেশ্বরে গিয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্রকে শুভেচ্ছা জানাতে। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ঐতিহ্যের প্রভাবে চন্দ্রশেখর নামে পরিচিত লিঙ্গরাজ, রুক্মিণীদেবী এবং বাসুদেবের বিগ্রহ নিয়ে বেরোয় শোভাযাত্রা। স্থানীয় ভাষায় এই পর্বটিকে বলা হয় ‘পাহান্দি বিজে’। দিব্য সিংহাসনে বসানোর আগে দেবদেবীদের নিয়ে তিনবার রথ পরিক্রমা চলে। পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ, কাঁসর-ঘণ্টা আর ঘন ঘন শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে আকাশ, বাতাস। রথে দেবদেবীদের অধিষ্ঠানের পর রথের রশিতে টান পড়ার আগে পূজারীরা সুগন্ধি দ্রব্য ও কর্পূর মেশানো জল ছিটিয়ে দেন রথের চারপাশে। রথদণ্ড সড়কের ওপর দিয়ে রথ টেনে নিয়ে যাওয়া হয় দু’ কিলোমিটার দূরের রামেশ্বর মন্দির বা ‘মওসি মা মন্দিরে’। দেবদেবীরা সেদিন রথেই থাকেন, পরদিন রামনবমীতে তাঁদের সেই মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চন্দ্রশেখর, ভগবান রামচন্দ্রকে শুভেচ্ছা জানান। 
নবম দিনে হয় ‘বহুঢ়া যাত্রা’ বা উল্টোরথ। রুকুনা রথযাত্রার অন্যতম প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হল— উল্টোরথে এ রথকে উল্টোদিক থেকে টানা হয়। অর্থাৎ মোড় ঘুরিয়ে আনতে হয় না। স্থানীয় ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘রুকুনা রথো অনোলেউটা’। আসলে এই রথের চারদিকেই চারটি তোরণ বা প্রবেশ পথ থাকায় ফিরতি পথে আর রথ ঘোরানোর প্রয়োজন হয় না। 
তবে ‘বহুঢ়া যাত্রা’র সময় রথের রশি, ঘোড়া এবং বিগ্রহের দিব্য সিংহাসন বিপরীত দিকে সংস্থাপন করা হয়। প্রতিবছরই রুকুনা রথের রশি আনা হয় পুরীর শ্রীমন্দিরের দেবী সুভদ্রা রথ টানায় ব্যবহৃত রশিই। উৎসব শেষে সেই রশি আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। উল্টোরথের শোভাযাত্রাকে বলা হয় ‘স্বর্জাদ্রী বিজে’। 
আগে দ্বাদশী তিথিতে লিঙ্গরাজ ও অন্য দেবদেবীদের নিয়ে যাওয়া হতো তাঁদের মন্দিরে। বর্তমানে ওই দিন সন্ধ্যায়, মাঝপথে উল্টোরথ থামানো হয়। পরদিন অর্থাৎ ষষ্ঠ দিনটি ত্রয়োদশী হওয়ায় তাঁরা মন্দিরে ফেরেন না। চতুর্দশী  তিথিতেই স্বস্থানে অধিষ্ঠিত হন তাঁরা। কোনও বছর চতুর্দশী ও পূর্ণিমা তিথি একই দিনে পড়ে গেলে, রুকুনা রথ মন্দিরে ফেরে কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে। জগন্নাথ মহাপ্রভুই হন, আর লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুই হন এঁরা সবাই আমাদের কল্পিত নানা রূপধারী দেবতা। সেই রূপের কাছেই আমরা সমর্পণ করি নিজেদের। দেবতার এই রূপবৈচিত্র্যের সঙ্গে তাঁদের রথযাত্রা উৎসবের রীতি পদ্ধতিতেও এসেছে বৈচিত্র্য। দেবতাকে আমরা যেমন সাজাই আমাদের আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে, তেমনই তাঁদের ঘিরে যে উৎসব, সেখানেও কালে কালে নানা পরিবর্তন হয়ে চলেছে। তবে কোথাও বদল হয়নি কিন্তু মূল ভাবনার। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছিলেন, ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা’। এ পরিচয় মিলবে এই রুকুনা রথযাত্রা উৎসবেও। মা পার্বতীকে আমরা দেখতে পাই, তাঁকে নিবেদিত ‘দানাচোরি বিধি’ পালনের সময়, আমাদের ঘরের সাধারণ এক মানবী হিসেবেই। সে কাহিনি হল— রথে লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর সঙ্গী হতে না পারায় রথযাত্রার তৃতীয় দিনে দেবী পার্বতী পালকি চড়ে গিয়ে রথের একটি অংশ ভেঙে দিয়ে আসেন। লিঙ্গরাজ মন্দিরে ফিরে দেখেন সিংহদুয়ারের দরজা বন্ধ। এরপর দেবীর ক্ষোভ প্রশমিত করতে মহাপ্রভু তাঁর চন্দনযাত্রায় তাঁকে সঙ্গে নেবার প্রতিশ্রুতি দেন। জগন্নাথের ‘নীলাদ্রী বিজে’র সঙ্গে খুবই মিল রয়েছে এই বিধির।
ছবি : অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে
 

26th     June,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা