বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 

দেশের প্রথম নাগরিক

জোর কদমে চলছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তোড়জোড়। এ ভোটে জনগণ সরাসরি যুক্ত নয়, তাই অনেকেরই খোঁজ নেওয়ার আগ্রহ কম। কিন্তু রাইসিনা হিলসের দৌড়েও ঘটেছে নানা চমকপ্রদ ঘটনা। তারই মধ্যে থেকে বাছাই করা কয়েকটি ঘটনা ফিরে দেখলেন সৌম্য নিয়োগী।

তিনটি চিঠি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি
২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০। স্বাধীন ভারতের এক ঐতিহাসিক দিন। মূলত দু’টি কারণে। এক, ওই দিন থেকেই কার্যকর হয় সংবিধান। ভারত আত্মপ্রকাশ করে একটি সাধারণতন্ত্র হিসেবে। আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই শপথবাক্য পাঠ করেন দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ। যাকে বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ নামে চিনত আপামর দেশবাসী। দু’টি ঘটনাই কিন্তু খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না। প্রথমত, ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯ সালে গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল ভারতীয় সংবিধান। তাহলে তা কার্যকর হতে দু’মাস সময় লাগল কেন? দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি পদে রাজেন্দ্র প্রসাদের নামে আপত্তি ছিল দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর। কী কারণে? দু’টি প্রশ্নের জবাবেই লুকিয়ে নেহরু-রাজেন্দ্র প্রসাদের টানাপোড়েনের আখ্যান। সে সময়ে প্রকাশিত নানান খবর এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন গ্রন্থে সেই অধ্যায় ধরা রয়েছে।
একটু প্রেক্ষাপটটা জেনে রাখা দরকার। স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের ২১ জুন পর্যন্ত গভর্নর জেনারেল পদে ছিলেন ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তিনিই শপথবাক্য পাঠ করান প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে। মাউন্টব্যাটেন ফিরে যাওয়ার পর প্রথম এবং একমাত্র ভারতীয় গভর্নর জেনারেল হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী। রাজাজি ছিলেন নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গঠনের ভাবনার একজন বড় সমর্থক। তাই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকেই চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের বাজি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করা বিহারের বাসিন্দা রাজেন্দ্র প্রসাদ। তিনি ছিলেন প্রথম নেহেরু সরকারের খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি সংবিধান সভার অধ্যক্ষ হন। আর হিন্দু কোড বিল নিয়ে তাঁর সঙ্গে নেহরুর মতভেদ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। এই মনোভাবের কারণে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানোর কথা ভাবেননি প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এই লড়াইয়ে নেহরু হেরে গিয়েছিলেন। খানিকটা নিজের দোষেই।
আগস্ট, ১৯৪৯। সংবিধান লেখার কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সেই খবরের জেরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে দিল্লি। নেহরু ছিলেন রাজা গোপালাচারীর পক্ষে। কিন্তু কংগ্রেসের একটা বড় অংশেরই এ ব্যাপারে আপত্তি ছিল। ১৯৪২’-এ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় মাঝপথেই দল ছেড়ে দিয়েছিলেন রাজাজি। সেই অতীতই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর সামনে। উপরন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থাও ছিল ভারী কাজকর্মের পক্ষে অনুপযুক্ত। অন্যদিকে, রাজেন্দ্র প্রসাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল প্রশ্নাতীত। সেই সূত্রেই বল্লভভাই আর তাঁর ঘনিষ্ঠতা। শোনা যায়, রাজাজির প্রতি নেহরুর পক্ষপাতিত্ব এতটাই ছিল যে, সত্যের অপলাপ করতেও তিনি পিছপা হননি।
১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৯। রাজেন্দ্র প্রসাদকে একটি চিঠি লেখেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারীই এই পদে বসবেন, এ ব্যাপারে আমরা দু’জনেই সহমত।’ প্রাক্তন ইন্টেলিজেন্স অফিসার আর এন পি সিং ‘নেহরু: আ ট্রাবলড লিগ্যাসি’ বইতে এই চিঠির কথা প্রকাশ্যে এনেছেন। চিঠিটি পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। কেননা তাঁর সঙ্গে তো প্যাটেল অন্য কথা বলেছেন। তৎক্ষণাৎ তিনি পাল্টা চিঠি লিখতে বসে যান। নেহরুকে জানান, পার্টিতে আমার যা পদমর্যাদা, সেই অনুযায়ী সম্মান দেওয়া উচিত সরকারের। চিঠির একটি প্রতিলিপি তিনি পাঠান সর্দার প্যাটেলের কাছেও। আর এখানেই ফেঁসে যান নেহরু। কারণ, প্যাটেল কোনওদিনই গোপালাচারীর পক্ষে ছিলেন না। বাধ্য হয়ে ঢোঁক গিলতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। নেহরু পরের চিঠিতে রাজেন্দ্র প্রসাদকে জানান, ‘আমি যা লিখেছিলাম, তার সঙ্গে বল্লভভাইয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। বল্লভভাই এব্যাপারে কিছু জানতেন না।’ তিনি এত অস্বস্তিতে পড়েন যে, রাষ্ট্রপতি পদের দাবিদার নিয়ে অনড় মনোভাবও ত্যাগ করেন। সর্বসম্মতিক্রমে রাজেন্দ্র প্রসাদের নাম চূড়ান্ত হয়।
এবার আসা যাক সংবিধান কার্যকরের দু’মাস দেরির কারণে। আসলে ২৬ জানুয়ারি ছিল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। ১৯২৯ সালের ওই দিনেই কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পাশ হয়েছিল পূর্ণ স্বরাজের প্রস্তাব। তাই নেহরু তারিখটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছিলেন। এই তথ্য অনেকেরই জানা। কিন্তু যেটা জানা নেই তা হল, ওই তারিখটি পছন্দ ছিল না শপথবাক্য পাঠ করতে আসা রাজেন্দ্র প্রসাদের। কেননা তিনি জ্যোতিষে বিশ্বাস করতেন। ২৬ জানুয়ারি অশ্বিনী নক্ষত্রের যোগ ছিল। তাঁর পণ্ডিতদের বক্তব্য অনুযায়ী, দিনটি ছিল অশুভ। বিজ্ঞানমনস্ক নেহরু স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই বক্তব্যে আমল দেননি। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য হয়েছিলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। যদিও এটা ছিল নেহরুর কাছে সান্ত্বনা পুরস্কার মাত্র।
১৭ এপ্রিল, ১৯৫২। চার মাসব্যাপী প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত হল লোকসভা। তারপরই সংবিধান মেনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন রাজেন্দ্র প্রসাদ। সেই ভোটে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন এক বাঙালি, কৃষ্ণকুমার চট্টোপাধ্যায় সহ মোট চারজন। মোট ভোটমূল্য ছিল ছ’লক্ষ। রাজেন্দ্র প্রসাদ একাই পেয়েছিলেন পাঁচ লক্ষ মূল্যের বেশি ভোট। ১৯৫৭ সালের রাষ্ট্রপতি ভোটের সময় প্রধানমন্ত্রী নেহরু প্রার্থী হিসেবে চেয়েছিলেন সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণকে। কিন্তু রাজেন্দ্র প্রসাদ ফের নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছাপ্রকাশ করায় তা হয়নি। তাঁর পক্ষে সওয়াল করেন সাংসদ-বিধায়কদের বড় অংশ। শেষ পর্যন্ত মৌলানা আবুল কালাম আজাদের পরামর্শে রাজেন্দ্র প্রসাদকেই মেনে নেন নেহরু। ক্ষুব্ধ রাধাকৃষ্ণাণকে বুঝিয়ে ফের উপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়।

ইন্দিরা বনাম কংগ্রেস
ব্রেকফাস্ট টেবিলে তখনও প্লেটে রাখা ওমলেট শেষ হয়নি ইন্দিরা গান্ধীর। রেকর্ড প্লেয়ারে চলছে বিঠোফেন। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটা ২০ আগস্ট, ১৯৬৯। কংগ্রেস সদর দপ্তরে মুখের হাসি চওড়া হচ্ছে নিজলিঙ্গাপ্পা, মোরারজি দেশাই, কামরাজদের মতো তাবড় কংগ্রেস নেতাদের। হবে নাই বা কেন, রেডিওয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গণনা ও ফলাফল ঘোষণা হচ্ছে। প্রথম রাউন্ডে কংগ্রেস প্রার্থী নীলম সঞ্জীব রেড্ডি জিতছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নীরবতা। পিছিয়ে ম্যাডামের প্রার্থী বরাহগিরি ভেঙ্কটগিরি বা ভি ভি গিরি। ইন্দিরা কিন্তু তখনও শান্ত। বন্ধু পুপুল জয়াকারের আশ্বাস শুনে স্মিত হাসি হাসছেন। আর বলছেন, ‘ব্যাপারটা খুব সহজ নয় পুপুল। হেরে যাওয়া মানে সামনে আরও কঠিন লড়াই। কিন্তু আমি তৈরি।’ সেদিন মাঝরাতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ফোন এসেছিল ম্যাডামের প্রার্থীর জয়ের খবর জানাতে। কংগ্রেস হেরে গিয়েছে। ইন্দিরার সেই জয়েই শুরু হয় সঙ্কট। ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার সংঘাতে আড়াআড়ি ভেঙে গিয়েছিল দেশের শতাব্দীপ্রাচীন দলটি।
ভাগাভাগি অবশ্য সামনে এসেছিল ইন্দিরা নিজের দলের বিরুদ্ধেই ধর্নায় বসায়। আসলে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি অধিকাংশ রাজ্যে পুরনো কংগ্রেসিদের রাজত্ব ভাঙতে চেয়েছিলেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কামরাজকে সরিয়ে নিজলিঙ্গাপ্পাকে সভাপতি করেন। ব্যাঙ্গালোরে কংগ্রেস অধিবেশনে আনলেন ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের প্রস্তাব। কামরাজ, মোরারজি দেশাইদের সিন্ডিকেট তাতে গুরুত্ব না দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে বড় করে দেখল। ফের পাঁচ বছর আগের পরিস্থিতি তৈরি হল। সেবার রাধাকৃষ্ণণকে সরিয়ে ইন্দিরা এনেছিলেন জাকির হোসেনকে। সিন্ডিকেট উপ-রাষ্ট্রপতি করে ভি ভি গিরিকে। এবার তারা রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করলেন সঞ্জীব রেড্ডিকে। আর এতেই হল বিপদ। ইন্দিরা গান্ধী কখনওই চাননি সঞ্জীব রেড্ডি রাষ্ট্রপতি হোন। কারণ, তিনি কংগ্রেস সভাপতি থাকার সময় থেকেই দু’জনের আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক।  প্রধানমন্ত্রী পদে নেহরু-কন্যাকে প্রার্থী করার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি তুলেছিলেন সঞ্জীব। তিনি মনে করতেন, জওহরলাল নেহরুর মেয়ে হওয়ার সুবাদে অযাচিতভাবে তাঁর উপর খবরদারি করেন ইন্দিরা। পাল্টা ইন্দিরাও তাঁকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না দিয়ে স্পিকার করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর পছন্দ ছিলেন উপ-রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি। অর্থাৎ, ইন্দিরা বনাম কামরাজ, মোরারজি দেশাই, তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি নিজলিঙ্গাপ্পা। কিন্তু দলীয় চাপে প্রধানমন্ত্রী বাধ্য হয়েছিলেন সঞ্জীব রেড্ডির পক্ষে বিবৃতি জারি করতে। তবে এর ফাঁকে মোরারজিকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে তিনি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের অর্ডিন্যান্স আনেন এবং তলে তলে সমর্থন জোগান ডিএমকে-বামেদের প্রার্থী ভি ভি গিরিকে। ইলেক্টোরাল কলেজে প্রায় ৫০ হাজার ভোটমূল্যে এগিয়ে ছিল কংগ্রেস। কিন্তু ইন্দিরার কলকাঠি সঞ্জীব রেড্ডিকে হারিয়ে দেয়। আর সঙ্গে সঙ্গেই কংগ্রেসের অন্দরে ক্ষমতার লড়াই চলে আসে প্রকাশ্যে। নিজলিঙ্গাপ্পার সভাপতিত্বে ইন্দিরা গান্ধীকে দল থেকে বহিষ্কার করে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি। ইন্দিরার অনুগামীরাও পাল্টা সভা ডেকে দাবি তুললেন, ‘আমরাই আসল কংগ্রেস।’ মানলেন না মোরারজি, কামরাজরা। সংসদীয় পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হল প্রধানমন্ত্রীকে। দু’ভাগ হয়ে গেল কংগ্রেস—আদি এবং ইন্দিরা।

প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি ও মোদির রাজ্যে ক্রসভোট
রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণের একটি লালচে হয়ে যাওয়া ছবি এখনও ইন্টারনেট ঘাঁটলে চোখে পড়ে। সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়েছিল সেই সময়। ছবির মধ্যমণি রামাস্বামী ভেঙ্কটরমন। দেশের অষ্টম রাষ্ট্রপতি। তিনি শপথবাক্য পাঠ করছেন। মঞ্চে উপস্থিত লোকসভার তদানীন্তন স্পিকার, পাঞ্জাবের নেতা বলরাম জাখর। তাঁর ঠিক পাশেই বসে মাথায় ঘোমটা টানা এক মহিলা। সাধারণ চেহারা। অন্যমনস্ক দৃষ্টি। সাজেও কোনও বিশেষত্ব নেই। কে তিনি? জাতীয় রাজনীতির যাঁরা খবরাখবর রাখতেন, তাঁদের কাছেও পরিচিত মুখ নন। তবে নিজের রাজ্য, মহারাষ্ট্রে খানিক পরিচিতি রয়েছে। পদাধিকার বলে সেসময় তিনি রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান। কিন্তু ২০০৭ সালের জুন মাসের আগে তাঁর নামটি আমি-আপনি দূরে থাক, প্রকাশ কারাত, ডি রাজাদের মতো পোড়খাওয়া বাম নেতারাও শোনেননি। তিনি প্রতিভা দেবী সিং পাতিল। দেশের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি। যাঁর নির্বাচনে ক্রস ভোটিংয়ের জেরে মুখ পুড়েছিল স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির। এত কথা যে ছবিটি নিয়ে, সেটি কবে তোলা জানেন? গুগলের দৌলতে তারিখটা সহজেই বলে দেওয়া যায়, ২৫ জুলাই, ১৯৮৭।
আবার বছর কুড়ি পর। সময়টা প্রথম ইউপিএ সরকারের। ২০০৪ সালে মুখ থুবড়ে পড়েছিল অটলবিহারী বাজপেয়ির ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’ স্লোগান। ১৪৫ আসন নিয়ে লোকসভায় বৃহত্তম দল হয়ে উঠেছিল কংগ্রেস। ইউপিএর মোট সাংসদ-শক্তি গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ২১৮-তে। সেবার ঘটেছিল আর এক আশ্চর্য ঘটনাও। বামেদের জোট ৫৯টি আসন পায়। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার। ফলে সরকার গঠনে তারাই হয়ে ওঠে নির্ণায়ক শক্তি। তবে কৌশলগত কারণে বামেরা সরকারে যোগ দেয়নি। বরং বাইরে থেকেই ইউপিএ-কে সমর্থনের রাস্তা নেয়। প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলার পক্ষপাতী। আর বামেরা কমিউনিজমের কারণেই রাশিয়াপন্থী। ফলে বছর দুয়েক টানাটানির মধ্যে চললেও ২০০৭ সালের আগেই সরকার পতনের উপক্রম হয়। ইস্যুটি কার্যত ঐতিহাসিক, অন্তত বামেদের কাছে তো বটেই—ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি। এই ইস্যুতে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয় বাম-কংগ্রেসের সংঘাত। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শিয়রে এসে উপস্থিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
দেশের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতির নির্বাচনটাই যেন এক সাধারণের বিখ্যাত হয়ে ওঠার কাহিনি। ছাত্র রাজনীতি থেকে বিধায়ক, রাজ্যের মন্ত্রী থেকে রাজস্থানের গভর্নর। এই পর্যন্তই দৌড় ছিল জলগাঁওয়ের মেয়ে প্রতিভার। তবে হ্যাঁ, একটা গুণের কথা কংগ্রেসিমাত্রেই বলে থাকেন, তিনি গান্ধী পরিবারের অনুগত। লোকসভা নির্বাচনে হারের পর একে একে যখন সবাই ইন্দিরা গান্ধীকে ছেড়ে চলে গিয়েছে, তখন পাশে থাকা গুটিকয় অনুগামীদের মধ্যে প্রতিভা অন্যতম। এই গুণ অবশ্য পরে একসময় তাঁর অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন।
এই নীরবেই সেবা করে যাওয়ার গুণের জন্যই নাকি তিনি নানা সময় গান্ধী পরিবারের কাছ থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন, নিন্দুকরা একথা হামেশা বলে থাকেন। তবে ২০০৭ সালের রাষ্ট্রপতি ভোটে তাঁর প্রার্থী হওয়ার ঘটনাবহুল দিনগুলি বলে দেয়, এমনটা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ, সেবার বামেরা আগ বাড়িয়েই বলেছিল এক বাঙালির নাম, প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি তখন প্রথম ইউপিএ সরকারের অর্থমন্ত্রী। কিন্তু সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে প্রণববাবুর মতো ‘মুশকিল আসান’কে হাতছাড়া করতে রাজি হননি স্বয়ং ইউপিএ সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তিনি পাল্টা ভাসিয়ে দিলেন দু’জন অভিজ্ঞ নেতার নাম—করণ সিং এবং শিবরাজ পাতিল। কিন্তু দু’জনেরই ভাবমূর্তি ভালো নয়, এই আওয়াজ তুলে আপত্তি তুলল বামেরা। মনোমালিন্য মেটাতে বৈঠক ডাকতে বাধ্য হন সোনিয়া। বামেদের পক্ষ থেকে আসেন সিপিআইয়ের এ বি বর্ধন, ডি রাজা, সিপিএমের প্রকাশ কারাত ও সীতারাম ইয়েচুরি হাজির হন আলোচনায়। কংগ্রেসের এবার অবস্থান বদলে মধ্যপ্রদেশের দুই প্রবীণ নেতার নাম প্রস্তাব করে। মোতিলাল ভোরা এবং অর্জুন সিং। কিন্তু এক্ষেত্রে আপত্তি ওঠে দু’জনের শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে। তাঁদের কাউকে নির্বাচিত করলে দেশবাসী এবং ব্যক্তি উভয়েরই সমস্যা দেখা দিতে পারে। একের পর এক নিষ্ফলা আলোচনার মাঝেই শেষপর্যন্ত ১৪ জুনের বৈঠকে ডি রাজা বের করেন সমাধান—‘আমরা কোনও মহিলার কথা কেন ভাবছি না? এতে একটা সামাজিক বার্তাও দেওয়া যাবে।’ মনমোহন সিং যেন সেই অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন। সিপিআই নেতার কথা শেষ হওয়ামাত্রই নামটি তিনি প্রস্তাব করে ফেলেন—প্রতিভা দেবী সিং পাতিল।
কে? এ বি বর্ধন বাদে এই প্রশ্নটা ছিল সব বাম নেতার মুখেই। কিছুটা বিস্ময়ও! কারণ, এতদিন জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে এই নামটা তেমন পরিচিত ছিল না তাঁদের। একমাত্র নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকার সুবাদে এ বি বর্ধন চিনতেন প্রতিভা পাতিলকে। তিনিই বাকিদের বুঝিয়ে বলেন। ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন না থাকায় সম্মতি দিতে বাধ্য হন কারাতরা। সেদিন সন্ধ্যাতেই ঘোষণা হয়ে যায় রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর নাম। তখন প্রতিভা দেবী রাজস্থানের রাজ্যপাল। এরপরেই শুরু হয় আসল খেলা, স্ট্র্যাটেজির।
বিজেপি শিবির প্রতিভার বিরুদ্ধে শক্তিশালী এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এনডিএর প্রার্থী হন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি তথা রাজস্থানের দীর্ঘদিনের নেতা ভৈরোঁ সিং শেখাওয়াত। তিনি জনসঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও বটে। বিজেপির পক্ষ থেকে জোর প্রচার করা হয় প্রতিভার বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়। পাল্টা ভৈরোঁ সিং রাজনৈতিক ম্যানেজাররা ক্রস ভোটিংয়ের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালান। পরিকল্পনা সত্যি করে বাস্তবিকই জমিয়ে ক্রস-ভোটিং হল। আর তারপর...। ৬ লক্ষ ৩৮ হাজার ১১৬ মূল্যের ভোট পেয়ে ইতিহাস গড়লেন প্রতিভা দেবী। ভৈরোঁ সিং পেয়েছিলেন মাত্র ৩ লক্ষ ৩১ হাজার ৩০৬ মূল্যের ভোট।
কোথায় কোথায় ক্রস-ভোটিং হল? এক, মহারাষ্ট্র। এনডিএর মধ্যে থাকলেও মারাঠা কার্ড খেলে দেয় শিবসেনা। দুই, রাজস্থান। আর তিন নম্বর রাজ্য মোদির গুজরাত। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরোধী একাধিক বিধায়ক কংগ্রেস প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেন। যদিও পরে মোদি তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। দেশের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি আরও একটি নজির গড়েছিলেন প্রতিভা দেবী। তাঁর সুবাদেই প্রথম ভারতে নতুন একটি পদ তৈরি হয়। প্রোটোকল মেনেই ভারত সরকার নির্দেশিকা বের করে রাষ্ট্রপতির স্বামী দেবী সিং শেখাওয়াতকে দেশের ‘ফার্স্ট জেন্টেলম্যান’ হিসেবে নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা করে।
ছবি: বামদিকে নেহরু, রাধাকৃষ্ণাণ ও রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং ডানদিকে উপরে ইন্দিরার সঙ্গে ভি ভি গিরি এবং নীচে ভেঙ্কটরমনের শপথগ্রহণে প্রতিভা পাতিল।

19th     June,   2022
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা